
আমাদের দেশটা খুব দরিদ্র একটা দেশ। দরিদ্র দেশে যারা বিলাসিতা করে তাদের আমি খুব অপছন্দ করি। শুধু অপছন্দ না ঘৃণাও করি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই দেখি- বাড়ির দাড়োয়ান, ড্রাইভার বা কাজের লোক একটা বা দু'টো বিদেশী কুকুর নিয়ে রাস্তায় বের হয়। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, কুকুরকে নিয়ে বের হয়েছেন কেন? তারা উত্তর দিল- কুকুর পটি করবে, তাই।
আমি বললাম- বাসায় পটি করে না?
বাসায়ও করে। প্রতিদিন কুকুর গুলোকে নিয়ে বের হই, এটাই নিয়ম।
কিছু মানুষের কত টাকা! তারা লাখ টাকা দিয়ে কুকুর কিনেন। কুকুরের পেছনে মাসে লাখ টাকা খরচ করেন। আর কোটি কোটি মানুষ তিনবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারে না। আমি মনে মনে ভাবি- যারা দরিদ্র দেশে এই রকম বিলাসিতা করে তাদের লজ্জা করে না? কুকুরের পেছনে এত টাকা খরচ না করে, এই টাকা গুলো দরিদ্র মানূষের কল্যানে খরচ করা যায় না? কুকুর আগে না মানুষ? মানুষ তো আশরাফুল মাখলুকাত।
আমাদের দেশে ধনীদের কুকুর প্রীতি মূলত পশ্চিমা সভ্যতা থেকে আমদানি হয়েছে। ধনীর অনেক ছেলে-মেয়েকে প্রায়ই দেখি কুকুর নিয়ে সকালে জগিং করতে বের হয়। কেউ কেউ শপিং এ বের হয়। গাড়িতে কোথাও যাওয়ার সময় কুকুরকে সাথে করে নিয়ে যায়। কুকুরকে কোলে বসিয়ে আদর করে। তখন রাস্তার জ্যামে থেকে থাকা গাড়িতে যদি কোনো ভিক্ষুক ভিক্ষা চায়, তখন তাকে ধমক দেয়া হয়। কুকুরের জন্য কত আয়োজন। আর মানুষের জন্য। ধনীদের একজন কুকুরের পেছনে দুইজন লোক খাটে।

কুকুর পোষারও কিন্তু অনেক নিয়ম কানুন আছে। কুকুর পোষার জন্য কুকুর মালিকদের আগে তাদের প্রতিবেশীদের অনুমতি নেওয়া দরকার। দরিদ্র দেশে কুকুর পোষার দরকারটা কি(?) আমি ভেবে পাই না। এই ঢাকা শহরে লক্ষ লক্ষ লোক দুপুরে ভাতের বদলে রুটি-কলা বা বিস্কুট খেয়ে লাঞ্চ করে। কত মানুষ না খেয়ে থাকে। অভুক্ত মানুষ গুলো হোটেলের পাশে ঘুরঘুর করে। আর ধনী ব্যাক্তিরা কুকুরের জন্য সাভারের আমিন বাজার থেকে কচি গরুর মাংস কিনে আনেন নিয়মিত। কুকুরের নিয়মিত চেকাপের জন্য যান পশু হাসপাতালে। মানুষ খাদ্যের অভাবে না খেয়ে থাকে, চিকিৎসার অভাবে মরে। আমি নিজের কানে এক ভিক্ষুককে বলতে শুনেছি- এক আকাশ কষ্ট নিয়ে ভিক্ষুক কাঁদতে কাঁদতে বলছে- হে আল্লাহ আমাকে মানুষ না বানিয়ে বিদেশী কুকুর বানালেও ভালো করতে। আরাম আয়াশে থাকতাম পারতাম। তিনবেলা পেটপুরে খাবার পেতাম।
একবার তো আমি এক ধনী লোকের বাসায় বিদেশী কুকুরের বিস্কুট খেয়ে ফেলেছিলাম। গুলশানের মার্কেট গুলোতে কুকুরের জন্য বিশেষ বিদেশী খাবার পাওয়া যায়। কুকুরের আছে নানান রকম নাম- স্পেজ, ডোনারমেন, লেভরা ডগ, গোল্ডেন রিট্রিউভার, ডালমাসিয়ান, পার্ক, শেফার্ড ইত্যাদি। প্রজাতিভেদে এসব কুকুরের মূল্য ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত। কুকুরের ব্যবহারের জন্য খাঁচা, শিকল, বেল্টও নানান রকম। দামও খুব চড়া। কাটাবন গেলে চোখে পড়ে পাজারো গাড়ি থেকে নেমে বিদেশি কুকুর কিনছে অনেক ক্রেতারা। বিদেশি কুকুর গুলো ভাগ্য আছে- বলতে হবে। দামী গাড়িতে চড়ে বেড়ায়, ভালো ভালো খাবার খায়, খুব আদর যত্ন পায়। কুকুরের মালিকগন তাদের কুকুরের নাম রাখেন- টম, প্রিন্স, জ্যাক ইত্যাদি।
আমাদের র্যাবের ডগ স্কোয়াডে বর্তমানে মোট কুকুরের সংখ্যা ৬১টি। এগুলো জার্মানির শেফার্ড ও ইংল্যান্ডের লিউপার্ড প্রজাতির। ইংল্যান্ডের চিলপোর্ট কোম্পানী কুকুরগুলো সরবরাহ করেছে। কোটি টাকার উপরে তাদের দাম। প্রধানমন্ত্রী কোথাও গেলে তার আগের দিন এই কুকুরগুলো সেখানে গিয়ে গন্ধ শুঁকে। মানুষ যে কাজ নিখুঁত ভাবে পারে না, সেখানে এই কুকুর গুলো গন্ধ শুঁকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই কুকুর গুলোর খাবারের রুটিন আছে- সপ্তাহে তিনদিন ৮শ’ গ্রাম করে গরুর মাংস ও এক কেজি করে মুরগির মাংস, ২৫০ গ্রাম ভাত ও পর্যাপ্ত সবজি খেতে দেয়া হয়।

কুকুর নিয়ে ঢাকায় একবার এক মেলা হয়। সারা বাংলাদেশ থেকে কুকুর মালিকগন তাদের পোষা বিদেশী কুকুর গুলোকে নিয়ে সেই মেলায় আসেন। তা এক দেখার মতো দৃশ! মানুষের বাচ্চাকেও মনে হয় এত আদর করা হয় না। কত ঢং, কত রঙ!! তাদের লজ্জা করছিলনা। লজ্জা করছিল আমার। ইচ্ছা করছিল সব গুলোকে কানে ধরে সারা প্রেসক্লাব ঘুরাই। তারা কি দেখে না, কত লোক না খেয়ে থাকে, ফুটপাতে রাত যাপন করে, টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারে না। দরিদ্র পিতা মাতা ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার খরচ চালাতে পারে না। মানুষের কত কষ্ট আর তারা আছে কুত্তা নিয়ে। ছিঃ ।
আগে দেখতাম- গুলশান, ধানমন্ডি বা বনানী'র অনেক বাড়িতে মেইন গেটে লেখা থাকতো কুকুর হইতে সাবধান। এখনও অনেক বাড়িতে লেখা থাকে 'কুকুর হইতে সাবধান'। মানে কি? তারা কি ভয়ানক কুকুর? মানূষকে কামড়ে কামড়ে মেরে ফেলে? তাহলে তারা এমন কুকুর পোষে কেন? আমি কয়েকবার এরকম কুকুরওয়ালা বাড়িতে গিয়ে মহা বিপদে পড়েছি। একবার তো এক কুকুর প্রায় আমার পাছায় কামড়ই দিয়ে দিল। কিন্তু কুকুরটা পুরোপুরি সক্ষম হতে পারেনি। তবে প্যান্টের পেছনের পকেট কামড়ে ছিড়ে ফেলেছিল। আমি যখন ছোট, তখন আমার মনে আছে- কোথা থেকে যেন আমাদের এলাকায় একটা কুকুর এসেছিলছোট লাল রঙের বাচ্চা কুকুর। কুকুরটাকে বেশ কিছু দিন আমি নিয়মিত খাবার দেই। রাস্তায় কুকুরটা আমাকে দেখলেই দৌড়ে আসতো। কুকুরটা একটু বড় হওয়ার পর, কে বা কারা যেন কুকুরটার উপর গরম পানি ফেলে দেয়। ফোসকা পড়ে ঘা হয়ে যায়। তার কিছুদিন পর কুকুরটা মরে যায়। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

এদিকে দেশীয় কুকুরের উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী। শুধু ঢাকা না বড় বড় জেলা শহরেরও একই অবস্থা। দিনদিন নগরীতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। যখন পথচারী কুকুরের কামড় খায় তখন সিটি কর্পোরেশন থেকে বলা হয়- কুকুরে কামড়ানো লোকজনের জন্য ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা হয়েছে। প্রতি বছর শুধুমাত্র রাজশাহীতেই কুকুরের কামড়ের শিকার হয় অন্তত ৫শ’ গবাদি পশু। মানূষও কম যায় না- তারা কুকুরের গায়ে গরম পানি ফেলে দেয়, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে কুকুরের পা ভেঙ্গে ফেলে। বিদেশি কুকুর যে পরিমান যত্নআত্তি পায়, দেশি কুকুর তার একশো ভাগের এক ভাগও যত্ন পায় না। তারা পথে ঘাটে খাবারের আশায় ঘুর ঘুর করে। নগরবাসী তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। তবে কেউ কেউ ফিরে তাকায়। যেমন- আমার আগের অফিস ছিল ইস্কাটনে। প্রতিদিন বিকালে দেখতাম হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট কলেজের সামনে সুন্দর একটা মেয়ে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে অনেক গুলো বিস্কুট কিনে একটা কুকুরকে খেতে দেয়। অসংখ্য দিন আমি দেখেছি। দৃশটা আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যেত। কুকুরটা মেয়েটাকে দেখলেই দৌড়ে আসতো। মেয়েটাকে বিস্কুট খেত দিত। কুকুরটা আরাম করে বসে বিস্কুট খেত।
যতদিন আমরা বিদেশী কুকুরের পিছনে ছুটতে থাকবো ততদিন দেশের কোন উন্নতি হবে না। try to understand- কুকুরের চেয়ে মানুষ উত্তম। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব ভুলে গেলে চলবে না। তাই আসুন আগে মানুষকে ভালোবাসি। মানূষের জন্য কিছু করি। মিথাশ্রয়ী মহাকাব্য মহাভারত অনুসারে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের স্বর্গ যাত্রাকালে তার সঙ্গী ছিলো কুকুর।

সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




