
যদি সুন্দরভাবে বাঁচতে চান- তাহলে এই দেশ থেকে পালাতে হবে। অন্য কোনো উপায় নেই। এই দেশে আপনি পরিবার পরিজন নিয়ে কিছুতেই সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবেন না। প্রতিটা সেক্টরে সমস্যা বিরাজমান। এই দেশে শুধু তারাই ভালো থাকবে যাদের প্রচুর টাকা আছে, ক্ষমতা আছে। বাকি সবাই মিসকিন। এই দেশে যাদের প্রচুর টাকা আছে তারা কেউই সৎ নয়। অবৈধ্য ভাবেই তারা কোটি কোটি টাকা করেছে। এবং তারা রাজার হালে জীবন যাপন করছে। তাদের প্রত্যেকের তিন চারটা করে গাড়ি, নামে বেনামে অনেক জায়গা জমি, ফ্ল্যাট এবং ব্যাংকে কারি কারি টাকা আছে। কারো কারো এতই টাকা যে ব্যাংকে শেয়ারও আছে। ১/১১ তে যারা দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়েছিল- তারা আজ সকলেই বাইরে। এবং খুব দাপটের সাথেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
অনেকেই সারাদিন আমার মতো কঠিন পরিশ্রম করে- পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না। মাস শেষ হওয়ার আগেই লোন নিতে হয়। ছেলের স্কুলের বারো শ' টাকা বেতন দিতে পারে। আবার কেউ কেউ ২৩ হাজার টাকা বেতন দিতেও গায়ে লাগে না। যারা দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে- বেশ কয়েকজন ধরা খেলেও, কয়দিন পর বের হয়ে আসে। সৎ মানুষদের কাজ করতে হয় দুর্নীতিবাজদের প্রতিষ্ঠানে। এদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে- শুধু লোক দেখানো। যাকে বলে আইওয়াশ। প্রতিষ্ঠান গুলোতে তেমন আয়-ইনকাম হয় না। তবু মাসে নব্বই লাখ বা কোটি টাকা খরচ করা হয়। ধনী লোকেরা এই টাকা খরচ নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ লোক নির্বোধ। ধর্ম তাদের নির্বোধ হতে সহায়তা করে। ধর্মকে বেঁচেই দূর্নীতি, চুরি আর মিথ্যাচারের রাজনীতি করা যতোটা সহজ, অন্য কোনো ভাবে ততোটা সহজ নয়। আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কোটির উপরে। যাদের ক্ষমতাবান মামা চাচা আছে তারা বেকার থাকে না। চাকরির যোগ্যতা না থাকলেও তারা বড় বড় পদে চাকরি পায়। চাকরি করে। অনেকের যোগ্যতা আছে কিন্তু ক্ষমতাবান মামা চাচা নেই বলে চাকরি পায় না। দশ বছর আগের একটা ঘটনা বলি- আমি চাকরির জন্য এক মন্ত্রীর কাছে গেলাম। তিন মাস গিয়েও তার সাথে দেখা করতে পারলাম না। সেই মন্ত্রী আমার নিজের চোখে দেখা- আমাদের এলাকার বেশ কয়েকজনকে রাজউক এ চাকরি দিয়ে দিলেন। যাদের চাকরি দিলেন তারা একজনও নিজের নাম ঠিকভাবে লিখতে পারে না। আজও তারা রাজউকে চাকরি করে যাচ্ছেন। এরপর আরও কয়েকজনকে ক্ষমতার জোরে গনপূর্ত মন্ত্রনালয়ে চাকরি দিলেন। তারা আজও চাকরি করে যাচ্ছে। ভাবা যায় সরকারি চাকরি!
এই দেশে কোথাও শান্তি নাই। আপনি মগবাজার থেকে উত্তরা যাবেন শান্তিতে যেতে পারবেন না। বাসের জন্য লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। যা-ও দুই একটা বাস আসবে ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে হবে। বাসে উঠেও সিট পাবেন না, বানরের মতো ঝুলে থাকতে হবে। লম্বা জ্যামের কারনে আপনাকে এক ঘন্টার পথ চার বা পাচ ঘন্টায় যেতে হবে। বাজারে গেলে আপনি যা'ই কিনেন না কেন আপনাকে ঠকানো হবে। হয়তো নকল পণ্য দিবে, ওজনে কম দিবে। ফুটপাত দিয়েও শান্তিতে হাঁটতে পারবেন না। ফুটপাতে দোকান বসিয়ে আছে। আর যে ফুটপাতে দোকান নেই সেই ফুটপাতে হোন্ডা চলে। কাউকে কিছু বলতেও পারবেন না। বললে গাঁড়ে গর্দানে খেতে হবে। আর যদি ছাত্রলীগের পাল্লায় পড়েন তাহলে আপনার খবর আছে। ছাত্রলীগ বড় ভয়ঙ্কর জিনিস। এই দেশের সব কিছু শুধু তাদের। ইছা করলে তারা মুহূর্তের মধ্যে একটা এলাকা দখল করে ফেলতে পারে।
সরকারি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করাতে পারবেন না। পিয়ন থেকে শুরু করে প্রতিটা লোককে টাকা খাওয়াতে হবে। ছাত্রলীগের পোলাপানের মতো পুলিশও ভয়ঙ্কর। একবার তাদের খপ্পড়ে পড়লে বুঝবেন কত ধানে কত চাল। দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে তাই হয়তো ছিনতাইকারীর সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গেছে। এই দেশের ঘরে-বাইরে, অফিস আদালতে, পার্কে লেকে মার্কেটে কোথাও শান্তি নেই। কাজেই আপনাকে সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে এই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। যার টাকা এবং ক্ষমতা নাই এই দেশ তার জন্য না। টাকা নেই, ক্ষমতা নেই তাই আপনাকে মাথা নিচু করে চলতে হবে, সত্য কথা বলতে পারবেন না। কেউ শালা বললে তাকে দুলাভাই বলে সালাম দিতে হবে। একজন দুষ্টলোককে তোয়াজ করে চলতে হবে। ক্ষমতাবানদের তেল দিয়ে চলতে হবে। কথায় কথায় জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করতে হবে। অন্যথায় আপনার কপালে দুর্গতি আছে। এই দুর্গতি থেকে কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে মিথ্যা মামলা দিয়ে আপনাকে জেলে পুরে দিবে। জানেন কত লোক তাদের আক্রোশের শিকার হয়ে জেলে আছেন?
আমার এই দেশে এক মুহূর্ত থাকতে ইচ্ছা করে না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার মতো টাকা আমার নেই। তাই পদে পদে অপমান হচ্ছি, লাঞ্ছিত হচ্ছি। জীবনটা একটু একটু করে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। অর্ধেক জীবন তো পার হয়ে গেল, বাকি জীবনটাও কি এইভাবেই যাবে? প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর মনে হয়- আমি জেলখানায় আছি। সাজা ভোগ করছি। আসলে চারপাশ দেখে শুনে মনে হচ্ছে- বেশির ভাগ মানূষের মন ও মানসিকতা নোংরা। যে লোকটি দাড়ি রেখেছে, নামাজ পড়তে-পড়তে কপালে স্থায়ী কালো দাগ বসিয়ে ফেলেছে- অই ব্যাটা আরও বেশি ভন্ড। চারিদিকে শুধু ভন্ড লোক। একটাও ভালো মানুষ দেখি না।
গতকালের একটা ঘটনা বলি- রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি, মালিবাগ পদ্মা সিনেমা হলের সামনে। আমার পেছনে একটা হোন্ডা। হোন্ডাওয়ালা আমাকে একটা বাজে বকা দিয়ে বলল- সামনে থেকে সইরা দাঁড়া। আমার সামনে একটা গাড়ি। গাড়ি সরলে তারপর আমাকে সরতে হবে। হোন্ডা ওয়ালার বাজে বকাটা বারবার কানে বাজছে। আমি হোণ্ডাওয়ালাকে খুব নরম গলায় বললাম- ভাই সামনে একটা গাড়ি, গাড়ি সরলেই আমি সরে যাবো। শুধু শুধু আমাকে বকা দিলেন কেন? গাড়িটা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন না! হোন্ডাওয়ালা রেগে হোন্ডা থেকে নেমেই আমাকে একটা থাপ্পড় দিল। তারপর মোবাইলে বের করে কাকে যেন ফোন দিল। মুহূর্তের মধ্যে আরও দুইজন হোন্ডা নিয়ে চলে এলো। সবাই মিলে আমাকে টানা হেঁচড়া করলো। এদিকে আমার অবস্থা শেষ। পরে ওদের আচার আচরনে বুঝলাম ওরা ছাত্রলীগ করে। অসংখ্য লোক দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখলে। কেউ সামনে এগিয়ে এলো না। মন খারাপ করে বাসায় ফিরলাম। পুরো ঘটনাটা বারবার ভাবলাম। নিজের দোষ খুজে পেলাম না।
আজ সকালের একটা ঘটনা বলি। সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়েছি। আমি অফিসে যাবো। সুরভি আমার সাথে। সুরভির জ্বর সাতদিন ধরে। সুরভিকে হাসপাতালের সামনে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাবো। হঠাত একটা প্রাইভেট কার আমাদের রিকশায় ধাক্কা লাগিয়ে দিল। ভাগ্য ভালো রিকশা উলটিয়ে যায়নি। আমি ড্রাইভারকে বললাম- ভাই গাড়ি চালালে চারদিকে চোখ রেখে সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়। এই কথা শুনে ড্রাইভার রেগে আমাকে বলল- এখন যদি আমি গাড়ি থেকে নামি তাহলে তোর কপালে শনি আছে। ড্রাইভারের বয়স বেশি না। চ্যাংরা পোলা। আমি যদি একটা থাপ্পড় দেই উঠে দাঁড়াতে পারবে না। অল্প বয়সী ড্রাইভারের ব্যবহারে আমি প্রচন্ড অবাক! সুরভি সাথে আছে, নিজেকে বুঝালাম শান্ত থাকো। খুব শান্ত। রেগে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া। তারপরও আমি চুপ করে ভাবলাম আমার অন্যায়টা কোথায়? আমার দোষটা কোথায়? আমি তো খুব নরম গলায় শান্ত ভাবেই বলেছি- ''ভাই গাড়ি চালালে চারদিকে চোখ রেখে সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়।''
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৯:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




