
শাহেদ আমার বন্ধু। আজ শাহেদের কাহিনিই বলব। সে নিজেই আমাকে অনুরোধ করেছে, আমাকে নিয়ে লিখ। শাহেদ দেখতে বেশ স্মার্ট। হাসি খুশি প্রানবন্ত। শাহেদের সাথে আমার পরিচয় প্রায় ছোটবেলা থেকেই। ধনী পরিবারের বাবা মার একমাত্র সন্তান। শাহেদের সাথে আমার একটা খুব মিল- আমরা কখনও রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেইনি। পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েদের দিকে কুৎসিতভাবে তাকাইনি। যখন আমাদের সমবয়সীরা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিত তখন আমরা বই নিয়ে পড়তে বসতাম। আমাদের এলাকায় আমরা দুইজনই ছিলাম বেশ ভদ্র, সবচেয়ে বড় কথা লেখা পড়াতে খুব ভালো ছিলাম। ছুটির দিনে আমরা সানরাইজ ক্লাবে ক্রিকেট খেলতাম, ফুটবল খেলতাম। শাহেদ ক্রিকেটে ভালো। আমি ফুটবলে। অন্য পাড়ার ছেলেদের সাথে টুনামেন্ট খেলে আমরা অনেক মেডেল আর কাপ জিতেছি।
দুইজন দুই ইউনিভার্সিটিতে ভরতি হলাম। ততদিনে শাহেদরা এখানকার বাড়ি ভাড়া দিয়ে উত্তরা বাড়ি করে চলে যায়। আগের মতো খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ হয় না। এভাবে কেটে গেল ছয়টি বছর। শাহেদ কোথায় আছে জানি না। তার কথা প্রায় ভুলেই গেলাম। আমি সুতা বোতাম এর ব্যবসা শুরু করে লস খেলাম। বিয়ে করলাম। একটা মেয়ে আছে আমার। এখন চাকরি করছি একটা শিপিং মিলে। অফিসের কাজে কক্সবাজার গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে শাহেদের সাথে আমার দেখা। শাহেদ জোর করে ধরে একটা ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে গেল। সে কক্সবাজার এসেছে বেড়াতে। এখনও বিয়ে করেনি। কলেজে পড়ার সময় আমি প্রায়ই বলতাম, বন্ধু তুমি সিনেমার নায়ক হও। গানের গলাও বেশ ভালো। রবীন্দ্রনাথের 'বঁধু কোন আলো লাগলো চোখে' এই গানটা অসাধারন গায়। আমি যখনই বলতাম বন্ধু গানটা দুই লাইন গেয়ে শোনাও। সাথে সাথে গাইতো।
হোটেল কক্স হ্যাভেন এর ছাদে বিশাল বার। শাহেদ এক বোতল ভদকা নিয়ে বসলো। একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছে। অ্যালকোহল মানেই আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া, এমনটাই মনে করেন অধিকাংশ মানুষ। আমি এমনটা ভাবি না। কিন্তু এসব আমাকে টানে না। শাহেদ আমাকে খুব একটা জোর করলো না, এজন্য মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। শাহেদ এখন নাটক-সিনেমা লিখে, গান লিখে। তার লেখা গান দিয়েই সিনেমা হিট হয়। প্রায়ই খবরের কাগজে তার ছবি দেখা যায়। শাহেদ হঠাৎ বলল, আমি ঈশ্বর বিশ্বাস করি না। যারা ধর্ম পালন করে তাদেরকে আমার নির্বোধ বলে মনে হয়। আচ্ছা, তুই কি ভিক্টর হুগো'র 'The man who laugh' বইটা পড়েছিস? আমার ইচ্ছা করে সমস্ত প্রার্থনালয় গুলোকে লাইব্রেরী বানিয়ে ফেলি। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে ধার্মিক দরকার নেই। দরকার মেধাবী মানুষ। শাহেদ আমার দিকে উত্তেজিতভাবে তাকিয়ে বলল, বন্ধু তুই আমাকে বল ঈশ্বর বলে কি সত্যি কেউ আছে?
আমি শাহেদকে ভালো করে লক্ষ্য করলাম, সে পুরোপুরি মাতাল হয়েছে কিনা। মাতালের কথার কোনো দাম নেই। তবে সে মাতাল হয়নি সহজ স্বাভাবিক আছে। আমি কথা ঘুরানোর জন্য বললাম, কক্সবাজার এলি কেন? শাহেদ বলল, সমুদের পাড়ে বসে মদ খাবো আর ইচ্ছে মতো চাঁদ দেখবো।
শাহেদ বোতল প্রায় শেষ করে ফেলেছে। তার চোখ লাল হয়ে গেছে। সে বলল, দোস্ত আমি একটা অন্যায় করেছি। একদিন এক মেয়ে আমার কাছে সিনেমায় অভিনয় করার জন্য এসেছিল। মেয়েটি দেখতে বেশ। একদম সহজ সরল সুন্দর। মুখটায় এক আকাশ মায়া!
জিজ্ঞেস করলাম তোমার নাম কি?
সে বলল, মাধবী।
আমি বললাম, এই সিনেমার জগৎটা খুব ভালো নয়। অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়।
মাধবী মোনালিসার ছবির সোফায় বসে আছে, স্থির। হঠাৎ আমার কি হলো কে জানে, আমি ছুটে গিয়ে মেয়েটির ঠোটে চুমু খেলাম। হালকা চুমু নয়, গাঢ় চুমু। প্রথমে মাধবী সারা দেয়নি তাই বেশ জোর করতে হয়েছিল। চুমু শেষ করার পর আমার মনে হলো কাজটি আমি ঠিক করিনি। আমার অন্যায় হয়েছে। তুই তো জানিস, কলেজে পড়ার সময় থেকেই অনেক সুন্দরী মেয়ে আমার সাথে ঢলাঢলি করতে চেয়েছিল আমি সেসব সুযোগ নেইনি। হঠাৎ আমার কি হলো আমি বুঝতে পারলাম না। আমি কোনোদিন কোনো মেয়ের উপর জোর করিনি। কবিতা যেমন জোর করে লেখা যায় না, তেমনি জোর করে চুমু খেয়েও স্বাদ পাওয়া যায় না।
মেয়েটির চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। মনে হলো মাধবীর ঠোটটি অনেকখানি ফুলে গেছে।
মাধবী আহত গলায় বলল, এটা আপনি কি করলেন?
আমি বললাম, মাধবী তুমি চিৎকার চেচামেচি করে লোক জরো করে, আমাকে মার খাওয়াতে পারো।
মাধবী বলল, না। আপনার বিপদ হোক তা আমি চাই না।
এই কথা শুনে আমার ইচ্ছা করলো মেয়েটি শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরি।
বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই মেয়েটি চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। দরজার কাছে গিয়ে একবার আমার দিকে ফিরে তাকালো। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। আহ্ সেই চাহনি আমি আমৃত্যু ভুলতে পারবো না।
শাহেদ পুরো বোতল শেষ করে আরেক বোতল অর্ডার করলো। সে এখনও মাতাল হয়নি। শাহেদ আমাকে করুন গলায় বলল দোস্ত, মেয়েটাকে খুজে দিতে পারছি। আমি এই মেয়েটাকে বিয়ে করতে চাই। আমি মেয়েটার সাথে অবিচার করেছি। মেয়েটাকে বিয়ে করলেই আমার পাপ মোচন হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
