
আমাকে একটা ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কতদিন হলো জানি না। তবে মুখ ভরতি দাড়িতে হাত বুলিয়ে বুঝতে পারি কমপক্ষে তিন সপ্তাহ ধরে বন্দি আমি। এই ঘরে একটা খাট ছাড়া আর কিছু নেই। ঘর অন্ধকার। ওয়াশরুমও অন্ধকার। ঘরে একটা লাইট আছে। কিন্তু এই লাইটের সুইচ বাহিরে। শুধু খাবার দেওয়ার সময় বাতি অন করা হয়। কে খাবার দেয় তাও জানি না। খাবার খাওয়া শেষে হলেই বাতি বন্ধ করে দেয়। তবে খাবারের মান ভালো। রেস্টুরেন্টের খাবার। রেস্টুরেন্টের নাম বিসমিল্লাহ কিন্তু পেকেটে আর কোনো নাম ঠিকানা লেখা নেই। কাজেই আমাকে কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে আমি জানি না। ঘরে কোনো জানালা নেই। কত দিন হয়ে গেল আকাশ দেখতে পাই না। যে আমাকে এই ঘরে বন্দি করেছে, সে আমাকে হত্যা করতে চায় না। হত্যা করতে চাইলে এতদিনে করে ফেলতো। তাহলে সে কি চায়? তাছাড়া আমার অপরাধটাই বা কি?
ঘটনা শুরু এইভাবে- দুপুর দুইটায় আমি পান্থপথ মোড়ে সিগনালে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটি নতুন নোয়া গাড়ি আমার সামনে থামলো। গাড়ির ভিতর থেকে একটি মেয়ে আমার দিকে হাসি মুখে তাকালো। মেয়েটিকে আমি চিনতে পারলাম না। মেয়েটি বলল, আমাকে মনে হয় তুমি চিনতে পারনি। না চেনারই কথা, সতের বছর পর তোমাকে আজ পেলাম। আমি লাবনী। আমরা একসাথে ধানমন্ডি মডেল স্কুলে পড়েছি। এবার লাবনীকে আমি চিনতে পারলাম। একসময় লাবনীর সাথে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। আমাদের দুইজনকে অনেকেই হিংসা করতো। আমাদের সম্পর্কটা কি প্রেম ভালোবাসার ছিল? আমার জীবনে আমি সবচেয়ে বেশি চুমু খেয়েছি লাবনীকে। আহ সেই সব দিনের কথা মনে পড়লে বুকের মধ্যে যেন কেমন করে ওঠে।
আমি লাবনীর গাড়িতে উঠে বসলাম। বাইরে প্রচন্ড গরম ছিল। গাড়ির ভেতরে ঠান্ডা। লাবনী বলল, মনে হয় তুমি দুপুরে খাওনি। আমিও খাইনি। চলো দু'জন আজ একসাথে দুপুরে খাই। আমি বললাম, লাবনী তুমি বিয়ে করোনি? লাবনী হেসে বলল, না। আমি বললাম, কেন? লাবনী মিষ্টি হেসে বলল, তোমাকে যে পাইনি! আজ রাস্তায় জ্যাম কম। হু হু করে গাড়ি চলছে। আমার ভুলে যাওয়া অতীত দিনের কথা একটু একটু মনে পড়তে শুরু করেছে। ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে যেতাম মিরপুর বেড়িবাঁধ। সুযোগ পেলেই লাবনীকে চুমু দিতে চেষ্টা করতাম। এখানে সেখানে হাত দিতাম। লাবনী কিছু বলতো না। মনে হয় সে খুব উপভোগ করছে। কত দুষ্ট ছিলাম আমি! অবশ্য কারো শরীর পুরোটা আবিস্কার করার পর তাকে আর ভালো লাগতো না। এই কারনেই লাবনীর সাথে আমার অনেক দূরত্ব হয়ে যায়। তারপর আজ এত বছর পর দেখা! সেই আগের মতোন সহজ সরল সুন্দর আছে। মুখটা এত মায়া-মায়া যে তাকালেই বুকের মধ্যে আনচান করে ঊঠে।
প্লাটিনাম রুফটপ রেস্তোরায় আমরা মুখোমুখি বসলাম। লাবনী একগাদা খাবার অর্ডার করলো। দুইজনে মিলে খুব মজা করে খেলাম। খাওয়া শেষে বিলটা আমিই দিলাম। লাবনী দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো মেয়ে খাবারের বিল দিলে ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে না। অনেক আগে থেকেই এই নিয়ম আমার। যত মেয়ের সাথেই ডেটিং এ গিয়েছি সব খরচ আমি দিয়েছি। এটা আমার অলিখিত নিয়ম। আমি স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে। লাবনী জিজ্ঞেস করলো, শাহেদ তুমি বিয়ে করনি কেন? আমি বললাম, তোমাকে পাইনি বলে। এই কথা শুনে লাবনী কিছুটা রেগে গিয়ে বলল, তুমি আমাকে কখনই বিয়ে করতে চাওনি। শুধু আমাকে ভোগ করার চেষ্টা করেছো। তোমার স্বভাব ছিল উড়ে উড়ে মধু খাওয়ার। আরও অনেকের সাথেই তুমি এই কাজ করতে। আমি মাথা নিচু করে রইলাম। বললাম, আসলেই আমার এই স্বভাব ছিল। তখন বয়সটা অল্প ছিল। আবেগ ছিল বেশি। তাই একজনকে আমার বেশি দিন ভালো লাগতো না। তবে বিশ্বাস করো আমি আমার ভুল বুঝতে পেরে তোমাকে অনেক খুঁজেছি। তোমাকে পাইনি বলে আর বিয়ে'ই করিনি। তোমার কাছে আমি আসলেই অপরাধী। লাবনী রেগে গিয়ে বলল, আমি তোমার কোনো কথাই বিশ্বাস করি না।
আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম। লাবনী বলল কোথায় যাবে বলো, আমি তোমাকে নামিয়ে দেই। আমি বললাম, যেখান থেকে গাড়িতে উঠিয়েছো সেখানেই নামিয়ে দিলে ভালো হয়। গাড়ি চলছে। আমার কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। ইচ্ছা করছে গাড়ির ভিতরেই লাবনীকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ি। অনেক বছর আগে একবার লাবনীকে নিয়ে শালবনে গিয়েছিলাম। লাবনীকে জুসের সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে অজ্ঞান করে লাবনীকে ভোগ করেছিলাম। অবশ্য লাবনী জ্ঞান ফেরার পরে তা বুঝতে পারেনি। লাবনীর কথা ভাবতে ভাবতে আমি গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়লাম। গভীর ঘুম। গাড়িতে ঘুমানোর কারন হচ্ছে, লাবনী আমার অরেঞ্জ জুসে কিছু মিশিয়ে দিয়েছে। তা খেয়েই আমি প্রায় অচেতন হয়ে পড়লাম। হাত পা অসাড় হয়ে পড়লো। কেমন একটা তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব। লাবনী এই কাজ কেন করলো তা আমি বুঝতে পারলাম না। তারপর থেকেই আমি বন্দি।
আমার ঘরের বাতি জ্বালানো হলো এবং দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে লাবনী। সে আজ আকাশি রঙের শাড়ি পরেছে। তার চোখে মুখে এক আকাশ রাগ। আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে খাটের এক কোনায় বসে আছি। যে কোনো পরিস্থির জন্য আমি প্রস্তুত। লাবনী কোনো রকম ভনিতা না করে বলল, বাকিটা জীবন তোমাকে এই ঘরে বন্দি থাকতে হবে শাহেদ। তুমি যে অপরাধ করেছো তার কোনো ক্ষমা নেই। নো মারসি। তুমি আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে আমাকে দিনের পর দিন ভোগ করেছো। আমি বললাম, দিনের পর দিন তোমাকে ভোগ করিনি। একবার তোমাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে যা করার করেছি। আসলে তুমি এত সুন্দর। আমার অন্য কোনো উপায় ছিল না। এত সুন্দর কেউ উপভোগ না করে পারে? লাবনী রেগে গিয়ে বলল, তাহলে বিয়ে কেন করলে না? শাহেদ সহজ গলায় বলল, একজনের সাথে সারা জীবন থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। লাবনী বলল, আমি তোমাকে হাজার বার বলেছি আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও কি আমাকে ভালোবাসতে না? শাহেদ বলল, হুম তোমাকে ভালো লাগতো কিন্তু শুধু বিশেষ বিশেষ সময়ে। লাবনী বলল, প্রতি সপ্তাহে তুমি আমাকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতে, বারবার নানান উছিলায় চুমু খেতে। বুকে হাত দিতে। আমাকে যদি না'ই ভালোবাসতে, না'ই বিয়ে করতে চাইতে তাহলে এমনটা করতে কেন? শাহেদ বলল, ওটা বয়সের দোষ। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
লাবনী কাঁদছে। হঠাৎ শাহেদের কি হলো কে জানে। সে তার অতীত দিনের ভুল গুলো পরিস্কার দিনের আলোর মতো বুঝতে পারলো। সে লাবনীকে বলল, প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই আমি। আমি ভুল করেছি। তুমি আমাকে মেরেই ফেলো। আমার মন মানসিকতা নোংরা। আমি সত্যিই তোমার সাথে অন্যায় করেছি। লাবনী বলল, এই রকম অন্যায় শুধু তুমি আমার সাথে করোনি অনেকের সাথেই করছো। শাহেদ অনেকক্ষন চুপ করে মাথা নিচু করে থাকলো। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে শাহেদ বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি লাবনী। চলো আমরা নতুন করে আবার সব কিছু শুরু করি। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। খুব বড় অন্যায় করেছি আমি। বাকি যে ক'টা দিন বাঁচবো তোমার হাত ধরে বেঁচে থাকতে চাই। আমাকে সুযোগ দাও। আমি আমার পাপ মোচন করতে চাই। জগতের কোনো ধুলো ময়লা তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আমি তোমাকে আগলে রাখবো আমার বুকের মাঝে। দেরী হোক যায়নি সময়।
কখন দু'জন কাঁদতে কাঁদতে একজন আরেকজনকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে তা তারা জানে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


