
আজ একটি বিশেষ দিন।
সমস্ত শহরের মানূষের চোখে মুখে এক ধরনের উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। চমৎকার ওয়েদার। কাঁচের মতো স্বচ্ছ রোদ উঠেছে। রোদে তাপ কম। ঠান্ডা বাতাস বইছে। পুষ্প আজ শাড়ি পড়েছে। মাথায় তেল দিয়ে লম্বা দুইটা বেনী করেছে। পায়ে আলতা দিয়েছে। সে একটু পরপর ওমর আলীকে তাড়া দিচ্ছে। বাবা চলো, বাবা চলো। শুরু হয়ে যাবে। এদিকে সরলা বিবির আকাশ পাতাল জ্বর এসেছে। টারজান তার মাথায় পানি দিচ্ছে অনবরত। ওমর আলি কি করবেন বুঝতে পারছেন না। মেয়েটা রেডি হয়ে বসে আছে। তিনি মেয়েকে বলেছেন, 'রেসকোর্স ময়দানে নিয়ে যাবেন, সেখানে শেখ মুজিব আসবেন।' বাঙালিরা চৌদ্দপুরুষ ধরে ভাত খেতে অভ্যস্ত। তারা কী করে খাবে ভুট্টা? শেখ মুজিব কি জিনিশ তারা এখনও বুঝনি!
সবাইকে অবাক করে দিয়ে বেলা বারোটায় সরলা বিবির জ্বর চলে গেল। তিনি রান্না করতে বসলেন। এবং ওমর আলীকে বললেন, আমিও তোমাদের সাথে যাবো। তারা সবাই দুপুরের খাওয়া খেয়ে রেসকোর্স ময়দানের উদ্যেশে রওনা দিলো। টারজানের হাতে একটা বাঁশ। সে বাঁশ কেন নিয়েছে কে জানে!
'ময়ূরী-৩' নামের লঞ্চটা আজ দুপুর দুইটায় সরদ ঘাট থেকে চাঁদপুর যাবে। এই লঞ্চের দায়িত্বে আছে মেহের হোসেন। তিনি লঞ্চের দায়িত্ব সারেং কে বুঝিয়ে দিয়ে সদরঘাট থেকে হেটেই রওনা দিয়েছেন রেসকোর্স ময়দানের দিকে। আজ শেখ মুজিব ভাষন দিবেন। মেহের হোসেনের চোখে মুখে উত্তেজনা এবং অস্থিরতা। গুলিস্তান সিনেমা হলের পাশে এক চায়ের দোকান থেকে মেহের হোসেন পর পর দুই কাপ চা খেলেন। চায়ের দোকানদার জিজ্ঞেস করলো, শেখ মুজিবের ভাষন শুনতে যান? মেহের হোসেন মাথা নাড়লেন। দোকানদার বলল, আমিও যাবো। মেহের হোসেন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে পুষ্পের কথা ভাবছে। এই মেয়েটার কথা ভাবতে তার খুব ভালো লাগে। তার খুব ইচ্ছা পুষ্পকে নিয়ে একটা বাংলা সিনেমা দেখাবেন। পুষ্প মেয়েটাকে তার খুব ভালো লাগে। কি সুন্দর টানা টানা চোখ। চোখে মুখে সরলতার ছাপ স্পষ্ট।
রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে পুষ্প প্রচন্ড অবাক। এত মানুষ সে আগে কখনও দেখেনি। প্রায় দশ লক্ষ মানূষের আগমন হয়েছে। সবাই কিছু শুনতে চায়, তাদের বেকুলতা চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। বেলা তখন তিনটা। শেখ মুজিব সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট পরিহিত। তিনি যখন মঞ্চে উঠলেন ময়দানের সমস্ত লোক একসাথে করতালি ও স্লোগান দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানালো। মঞ্চ থেকে শেখ মুজিব যখন জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন তখন পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লাখ লাখ বাঙালির ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। হৃদয়ে তাঁর বাঙালির হাজার বছরের মুক্তির আন্দোলন, সংগ্রাম ও স্বপ্ন। মাথার ওপর আকাশে ঘুরছিল পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান। পুষ্প তার বাবাকে বলল, বাবা আমাকে কাঁধে নাও, আমি শেখ মুজিবকে দেখব। ওমর আলী মেয়েকে কাঁধে নিলেন।
শেখ মুজিব একটানা ১৮ মিনিট বক্তব্য দিলেন। 'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ..। ভাষণে দৃপ্ত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা ভাতে মারবো। আমরা পানিতে মারবো… আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। … রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ।’ ' শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠের এই ভাষণ সমস্ত বাঙালি উজ্জীবিত করেছিল।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৪:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



