somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

পদ্মা নদীর মাঝি

১২ ই মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কিছু কিছু উপন্যাস আছে আমি প্রতি বছর একবার করে পড়ি। যেমন রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা' এবং মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি'। আজ আমি 'পদ্মা নদীর মাঝি' নিয়ে আলোচনা করবো। আমি জানি এই উপন্যাসটি আপনারা সবাই পড়েছেন। এটি মানিক বন্দোপাধ্যায়ের চতুর্থ উপন্যাস। প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তার রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি। তিনি রচনা করেন বিয়াল্লিশটি উপন্যাস ও দুই শতাধিক ছোটোগল্প।

১৯৩৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় পদ্মা নদীর মাঝি। উপন্যাসের পটভূমি বাংলাদেশের বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চল। পদ্মা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। এর ভাঙন প্রবণতা ও প্রলয়ংকরী স্বভাবের কারণে একে বলা হয় 'কীর্তিনাশা' বা রাক্ষুসী পদ্মা। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কুবের। একেবারে নিম্নবিত্ত ও নিম্নতম পর্যায়ের মানুষ কুবের। সহজ সরল হওয়ায় তাকে অনেকেই ঠকায়।কুবের এ উপন্যাসের নায়কও। সে তার স্ত্রী মালার বোন কপিলার প্রতি আদিম আকর্ষণ অনুভব করে। আশ্চর্য এবং অদ্ভুত শৈল্পিক সৌকর্য ও পরিমিতি দিয়ে লেখক অতি যত্নসহকারে চরিত্রগুলো গড়ে তুলেছেন। প্রকাশকালে এ উপন্যাসটি মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ২০৮ এবং এর মূল্য ছিল মাত্র দেড় টাকা। গবেষকদের মতে, বাংলা সাহিত্যে এটিই জেলেদের নিয়ে প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে Boatman of the Padma নামে।

কুবের জেলে ও মাঝি। পদ্মায় ইলিশ ধরে বর্ষার মৌসুমে। তার স্ত্রী মালা। হাঁটতে পারে না। প্রতিবন্ধী স্ত্রীর ছোট বোন কপিলা। কপিলার সঙ্গে মনোদৈহিক সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রেমের টানে কপিলার স্বামী শ্যামাদাসের বাড়ি গিয়েছিল কপিলাকে দেখতে। সেখানে গিয়ে কুবের জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রেমিকাকে দেখতে গিয়ে অসুস্থ হলেও তার মন-প্রাণ পড়ে থাকে পদ্মার জন্য।

উপন্যাসের নায়িকা কপিলা। ব্যক্তিগত পরিচয়ে সে মালার বোন, সাংসারিক পরিচয়ে সে এক জনের স্ত্রী। মালার মত সে পঙ্গু নয়। কপিলা চতুর, চপল ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন এক যুবতী। কুবের যখন চুরির দায় এড়াতে হোসেন মিয়ার ময়নাদ্বীপে যেতে মনস্ত করে, তখন কপিলা তার অতীত জীবনের সবকিছু ফেলে সেই যাত্রায় কুবেরে চিরসাথী হয়। কপিলার অসাধারন একটা ডায়লগ- ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’

উপন্যাসের প্রথম পর্বেই প্রবেশ করে হোসেন মিঞা ও তার ময়নাদ্বীপ। পদ্মা নদীর মাঝিদের জীবন উপন্যাসে যতটা বাস্তব ও স্পষ্ট, হোসেন মিঞা ও তার ময়নাদ্বীপ ঠিক সেই পরিমাণেই রহস্য, হেঁয়ালী ও কল্পনা, বলা যায় ইউটোপিয়া। হোসেন মিঞা রহস্যময় পুরুষ। পথের কাঙ্গাল থেকে সে বিত্তশালীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার আভিজাত্যের প্রকাশ নেই। কুবের কেন ময়নাদ্বীপে যেতে বাধ্য হয়? আমিনুদ্দিন যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সকলকে হারিয়ে, কুবের ময়নাদ্বীপে যায় তার স্বশ্রেণী- রাসুর চক্রান্তের কারণে। কেতুপুরবাসী যখন বঞ্চনা-শোষণ-নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে একেবারে নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়ে, তখন হোসেন মিয়াই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র অবলম্বন, আশ্রয়দাতা।

উপন্যাসের রহস্যময় অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রধান চরিত্র হোসেন মিয়া। নোয়াখালীর এই লোকটি বহুদর্শী ও বহু অভিজ্ঞ এক ব্যক্তি। বিভিন্ন এলাকার দরিদ্র মানুষদের নিয়ে নানা উপকারের মধ্য দিয়ে সে সেই এলাকা থেকে লোকজন নিয়ে ময়নাদ্বীপে লোকবসতি গড়ে তুলেছিল। এই ময়না দ্বীপকে ঘিরেই হোসেন মিয়ার সব স্বপ্ন। সেখানে সে এমন একটা জনসমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দলমত ও ধর্মমত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ একটা মানিবীয় মূল্যবোধসসম্পন্ন সমাজ গড়ে তুলবে। মনুষ্যত্ব ও মানবতাই হবে সে সমাজের প্রধান ভিত্তি। ময়নাদ্বীপে কোনো মসজিদ-মন্দির নেই। যাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, তাদের এক উন্নত স্বপ্ন দেখানো হয়। কেউ যাওয়ার পর পালিয়ে এলেও তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন হোসেন মিয়া।

সুবোধ ঘোষের ‘অযান্ত্রিক’ গল্পে একটি পুরনো মোটরগাড়ি জগদ্দলের সঙ্গে গল্পের নায়কের প্রেম আমরা দেখেছি। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ গল্পে মহেশের সঙ্গে গফুরের প্রেম দেখেছি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নারী ও নাগিনী’ গল্পে খোঁড়া শেখের সঙ্গে সাপের সম্পর্ক দেখেছি, দেখেছি পরশুরামের লম্বকর্ণ গল্পে একটি ছাগলের সঙ্গে গল্পের নায়কের মিতালি। আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে আমরা দেখি পদ্মার সঙ্গে কুবেরের প্রেম।

এক নজরে- উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র- কুবের। নায়িকা কপিলা (কুবেরের শ্যালিকা)। কপিলার স্বামীর নাম শ্যামাদাস।
কুবেরের স্ত্রীর নাম- মালা। হোসেন মিয়ার বাড়ি - নোয়াখালীতে। গণেশ - কুবেরের মাছ ধরার সঙ্গী।
কুবেরের বাড়ি - কেতুপুর গ্রামে।
জেলেদের বেশি উপার্জন হয় ইলিশের মৌসুমে। বিপুল পদ্মা কৃপণ হইয়া যায় ইলিশের মরুশুম ফুরাইলে।
কুবের মাছ ধরতেছে ১২ বছর বয়স হতে। জেলেদের অধিকাংশের উপজীবিকা পদ্মা এবং পদ্মার খালগুলি। কুবের মাছ ধরে ধনঞ্জয়ের জাল ও নৌকায়। প্রতিরাত্রে ধনঞ্জয় ভাগ পায় অর্ধেক। কুবেরের মেয়ের নাম- গোপী। এক ঝড়ের রাতে গোপী পায়ে আঘাত পায়। গোপীর পায়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে হোটেলে একসঙ্গে কুবের-কপিলার রাত্রি যাপন লেখকের পরিকল্পিত পথেরই বিনির্মাণ। লাখা ও চণ্ডী কুবেরের ছেলে। মালার বাপের বাড়ি চরডাঙ্গা গ্রামে। বৈকুণ্ঠ - মালার বাপ।

পদ্মা নদীর মাঝিকেই চলচ্চিত্রায়িত করেছেন পশ্চিম বাংলার গৌতম ঘোষ। এপাড় বাংলা আর ওপাড় বাংলার মিলনে এক অনবদ্য সৃষ্টি।
'পদ্মা নদীর মাঝি' সিনেমা দেখতে চাইলে

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:০৩
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭১-এ মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বা রাজাকার হত্যার বিচার করতে হবে! :(

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৮

চতুর্দিকে রক্ষীবাহিনী তথা ফজলু কমান্ডারদের দুর্দান্ত প্রতাপ। ভয়ংকর সত্যটি হলো—যিনি ১০০ মাইল দূর থেকে পাকিস্তানি মিলিটারির আওয়াজ শুনতেন—সেই তিনি লুইচ্যা হামিদের সংগে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ভোল পাল্টিয়ে বিএনপিতে যোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ই-পাসপোর্ট নিয়ে কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

আমার সর্বশেষ পাসপোর্টটি করেছিলাম ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। ততদিনে বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ই-পাসপোর্টের অন্যতম একটি বাড়তি সুবিধে ছিল এই যে চাইলে সেটা একসাথে দশ বছরের জন্য ইস্যু... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে"-.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪০




"বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে"- বাংলা সাহিত্যের এই বহুল পরিচিত পঙ্‌ক্তির মর্মার্থ আমরা সবাই জানি। তবে মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, বিশেষ করে শিশুদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত স্নেহ ও আন্তরিকতারও... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিথ্যে বলতে পারি না

লিখেছেন স্প্যানকড, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


ছবি নেট


মিথ্যে বলতে পারি না,
আজও আমি স্পষ্ট দেখি
ঘরের মেঝেতে এক টুকরো রোদ
জানি না কী করে যেতে হয় ভুলে
পুরনো সব রোগ
সেই ভালো হতো যদি মিশে যেতাম স্রোতে।

মিথ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×