
আমার নাম শাহেদ। শাহেদ জামাল।
লেখাপড়া শেষ করেছি। চাকরি পাই না। তিনটা টিউশনি করে হাত খরচ চালাই। মাকেও কিছু দেই। মাথার চুল পাকতে শুরু করেছে। বিয়ের বয়স ধাইধাই করে চলে যাচ্ছে। প্রেমিকা আছে একজন, নাম তার নীলা। নীলা জানিয়ে দিয়েছে এবছরের মধ্যে চাকরি না পেলে, সে আর তার পরিবারকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাবে। সাত বছরের প্রেমের সম্পর্ক আমাদের। একটা চাকরির কারনে বিয়ে পর্যন্ত গড়াবে না! এই কষ্ট কোথায় রাখি? লেখাপড়া শেষ করে এই পর্যন্ত প্রায় আটত্রিশটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। প্রচুর টাকা নেই বলে সরকারি চাকরির আশা বাদ দিয়েছি। গত পরশু ট্রাভেল এজেন্সীতে একটা চাকরির ইন্টারভিউতে আমাকে এমডি খুব ভাব নিয়ে প্রশ্ন করেছিল- মিষ্টি আলু ইংরেজি কি? ইচ্ছা করছি ওর ইয়ে দিয়ে মিষ্টি আলু ডুকিয়ে দেই।
আমি বোরহান চৌধুরীর বড় ছেলে। আমার নাম শাহেদ। শাহেদ জামাল।
মনটা আজ খুব খারাপ। একটা টিউশনি চলে গেল। এই টিউশনিটাই সবচেয়ে ভালো ছিল। তিন হাজার টাকা দিত। সপ্তাহে মাত্র তিনদিন পড়াতে হতো। পড়া শেষে ছাত্রীর মা কিছু না কিছু খেতে দিত। আজ দিয়েছিল নুডুলস, শেষে চা। ভদ্র মহিলার রান্না অতি চমৎকার। চায়ে প্রথম চুমুক দিতেই ভদ্র মহিলা বললেন, আগামীকাল থেকে আর আসতে হবে না আপনাকে। এই কথা শুনেই ইচ্ছা করলো চায়ের কাপটা আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলি। চা-টা খুবই বিস্বাদ লাগছে। ভদ্রমহিলা একটা খাম আমার হাতে দিয়ে বললেন, এখানে দুই হাজার টাকা বেশি আছে। এই টাকা দিয়ে আপনি একটা শার্ট কিনবেন আমার পক্ষ থেকে। মহিলার কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে আসছে। আমি চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করলাম না।
আমি সুরাইয়া বেগমের ছেলে। আমার নাম শাহেদ। শাহেদ জামাল।
আমার বাবা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেরানি ছিলেন। সাহস কম ছিল বলে ঘুষ খেতে পারেননি। একবার ভেবে দেখুন সরকারি অফিসের কেরানি কিন্তু আমাদের গাড়ি নেই, বাড়ি নেই, জমি নেই। থাকি ডেমরা ভাড়া বাড়িতে। সেগুন বাগিচা মুক্তিযোদ্ধা যাদু ঘরের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। পকেটের খামে পাঁচ হাজার টাকা আছে। হাঁটতে হাঁটতে বেলী রোডের শাড়ির দোকান গুলোর সামনে চলে এলাম। শাড়ি দেখলেই আমার শাড়ি কিনতে ইচ্ছা করে। কি মনে করে, দু'টা শাড়ি কিনে ফেললাম। একটা আমার মা'র জন্য, একটা নীলার জন্য। আজ নীলাদের বাসায় আমার দাওয়াত। নীলার বড় ভাইয়ের মেয়ের জন্মদিন। রাত নয়টায় নীলাদের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। নীলার হাতে শাড়ি দিলাম। নীলা শাড়ি পেয়ে প্রচন্ড অবাক! বলল, আজ তো আমার জন্মদিন না। তবে শাড়ি কেন? নীলার হাসিমুখ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।
আমি এক হতভাগ্য যুবক। আমার নাম শাহেদ। শাহেদ জামাল।
সময় দুপুর ১২ টা বেজে পাঁচ মিনিট। আচ্ছা, ঢাকা শহরে তেতুল গাছ কোথায় আছে? ঘুম থেকে উঠার পর খুব বড় একটা তেতুল গাছ দেখতে ইচ্ছা করছে। রমনা পার্কে কি আছে? সমস্ত রমনা পার্ক চষে বেড়ালাম কিন্তু তেঁতুল গাছ খুঁজে পেলাম না! পুরো রমনা পার্ক আমার তন্নতন্ন করে তেঁতুল গাছ খুঁজতে সময় লাগলো দুই ঘন্টা। এখন সময় দুপুর দুইটা। মধ্যদুপুর সময়টা বড় অদ্ভুত! এসময় মানুষের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায় না। শাহেদ ভালো করে তাকিয়ে দেখল তার ছায়া নেই। শাহেদ পুকুর পারের সামনে অশ্বথ গাছের নিচে এক বেঞ্চে বসে আছে। তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। নীলা বলেছে সে নিজের হাতে রান্না করে খাবার নিয়ে আসবে। নীলা এখনও আসছে না কেন? এই রমনা পার্কেই নীলার সাথে পরিচয় হয়েছিল শাহেদের।
বাবা আমার নাম রেখেছিলেন শাহেদ। আর মা, জামাল। আমার নাম হলো- শাহেদ জামাল।
ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়েছি। গতকাল রাতে বাবাকে বারডেম হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে। এদিকে বাড়ি ভাড়া চার মাসের বাকি পড়েছে। মুদি দোকানেও বিস্তর জমেছে। প্রতিমাসে মার জন্য তেইশ শ' নব্বই টাকার ওষুধ কিনতে হয়। ছোট ভাইয়ের পরীক্ষার ফিস জমা দেওয়ার আজই শেষ দিন। বিপদ যখন আসে সব দিক থেকেই আসে। কিছুক্ষন আগে জানতে পারলাম আজ সন্ধ্যায় নীলাকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ। মেয়ে পছন্দ হলে আংটি পড়িয়ে যাবেন তারা। আমি হাসপাতালে বাবার পাশে বসে আছি। বাবা প্রায় অচেতন অবস্থায় আছে। ঠিক এই সময় নীলা রুমে প্রবেশ করলো। নীলার চোখে পানি। আমরা বেলকনিতে দাঁড়ালাম। নীলা অনেক কথাই বলে যাচ্ছে। কোনো কথাই আমার কানে যাচ্ছে। সব কিছু কেমন ঝাপসা লাগছে। নীলা চলে যাবার পর আগে আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে গেল, তাতে অনেক টাকা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ৮:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




