
সব মানুষের একান্ত কিছু সময় লাগে। দিনের শেষে নিজের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়। বিবেক আর আবেগকে শাসন করতে হয়। নিজের ভুল গুলো খুঁজে বের করে সংশোধন করতে হয়। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মিলাতে হয়। একটু একটু করে ভবিষ্যতের চিন্তা করতে হয়। মানব জীবন বড় মূল্যবান। তাই অনেক হিসেব নিকেশ করে নিজের জীবন সাজাতে হয়। সর্বদা জাগ্রত থাকতে হয়। দিনের বেলা নানান কাজে মানুষ নানান রকম ব্যস্ততার মধ্যে থাকে। তাই অবসর সময়টাকে অবহেলা না করে, সময়কে যারা কাজে লাগাতে পারে তারাই জীবনে সাফল্য পায়। যে মানুষের কাজ সুন্দর, তার সব সুন্দর। কাজ দিয়েই মানুষের মন জয় করে নিতে হয়। মৃত্যুর আগে প্রতিটা মানুষের উচিত তার মহৎ কাজের মাধ্যমে নিজের ছাপ রেখে যাওয়া।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নীলা তার ছয় তালার বেলকনিতে এসে বসে। বেলকনিটা খুব ছোট। তবে তার ভাগ্য ভালো বেলকনিতে বসলে বাইরের অনেকখানি দেখা যায়। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ বেলকনিতে দাড়ালে কিছুই দেখা যায় না। দেখা যায়- পাশের বাড়ি টয়লেট, রান্না ঘর অথবা শুধুই দেয়াল। রাত এগারোটা। বেলকনির বাতি বন্ধ। নীলা মগ ভরতি চা নিয়ে বসে আছে। ইচ্ছা থাকলেও বাতি জ্বালিয়ে রাখা যায় না। বাতি বন্ধ থাকলে আশে পাশের কেউ তাকে দেখতে পারে না। সে সবাইকে দেখে। গত পাঁচ বছর ধরে সে আশে পাশের সব ফ্লাটের খবর জানে। কে রাত জেগে পড়ছে, কেউ সিগারেট খাচ্ছে, কাউকে দেখা যায় রান্না করে চা বানাচ্ছে, কেউ মোবাইলে কথা বলছে, কেউ টিভি দেখছে বা কম্পিউটার চালাচ্ছে।
নীলা গত পাঁচ বছর ধরে দেখছে- এক হুজুর সারারাত জেগে মাথা নেড়ে নেড়ে বই পড়ে। থুতনিতে দাড়ি, পায়জামার উপর গেঞ্জি পরা। প্রতিদিন রাতে এক রুটিন। হুজুর এত কি পড়ে? হুজুরের বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে। দিনের বেলা কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু রাতের বেলা একই রুটিন- হুজুর মাথা নেড়ে পড়েই যাচ্ছে। এই হুজুর জঙ্গি নাতো? তাদের রুমে আরও বেশ কয়েকজন হুজুরকে দেখা যায়। কিন্তু সারারাত জেগে একজনই মাথা দুলিয়ে পড়ে। নীলার খুব জানতে ইচ্ছা করে হুজুর এত কি পড়ে? মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে একবার গিয়ে দেখে আসতে। হুজুর আবার তার বেলকনিতে পর্দা জুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু বাতাসে পর্দা সরে গিয়ে যে ঘরের ভেতর সব দেখা যায়, সেদিকে হুজুরের হুশ নাই।
এক বুড়ো সারারাত জেগে বসে থাকে। টিভি দেখে দেখে আর একটু পরপর সিগারেট খায়। তার বুড়ি বউ বিছানার উলটো শুয়ে থাকে। বুড়িকে এক ঘন্টা পরপর ওয়াশরুমে যেতে দেখা যায়। বুড়োর মনে হয় ঘরের ভেতর সিগারেট খাওয়া নিষেধ। ঘরে সোফায় বসে টিভি দেখছে কিন্তু সিগারেট খাচ্ছে বেলকনিতে এসে। বুড়োর মাথার চুল সাদা। বুড়ো বুড়ি মনে হয় তার ছেলে আর ছেলের বউ এর সাথে এ ফ্ল্যাটে থাকে। কারন বিকেলে দেখা যায় বুড়োবুড়ি তাদের নাতনীকে নিয়ে ছাদে গল্প করছে। অথবা নাতনীকে সাইকেল চালানো শিখাচ্ছে। এই বুড়ো বুড়ির জন্য নীলার অনেক মায়া লাগে। নীলার খুব শখ তাদের একদিন বাসায় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসবে। নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে। এই ইচ্ছা কি তার পূরন হবে?
নীলার বেলকনির বাম পাশে নতুন একটা ফ্ল্যাট উঠেছে। মনে হয় তাদের গ্যাস সংযোগ নেই। অবশ্য নতুন সংযোগ সরকার বন্ধ রেখেছে। সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে রান্না করতে হয়। তাদের কাজের মেয়েটা রান্না ঘরে পাতলা চাঁদর বিছিয়ে ঘুমায়। ডান পাশের ফ্ল্যাটে দেখা যায় একটা মেয়ে মধ্যরাতে বেলকনিতে রাখা গাছ গুলোতে পানি দেয়। তখন তার কানে হেডফোন লাগানো থাকে। মনে হয় গান শুনে। গাছে পানিতে দিতে হয় বিকেলবেলা, রাতে নয়- মেয়েটা কি জানে না? নীলার বেলকনির বাম দিকের শেষ মাথার ফ্ল্যাটে নতুন এক দম্পতি উঠেছে। তারা প্রতি শুক্রবার রাতে মিলিত হয়। তারা কখনও বাতি নিভায় না, জানালা লাগায় না। আজিব!
রাত তিনটা। নীলার ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাতে যাবে। হঠাৎ চোখ পড়লো গলির মুখে ল্যাম্প পোষ্ট। বছরের বেশির ভাগ সময়ই ল্যাম্প পোষ্ট নষ্ট থাকে। আজ ল্যাম্প পোষ্টটি জ্বলছে। সুন্দর আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে কে যেনে ল্যাম্প পোষ্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছে! শাহেদ নাতো? সে নীলাকে অবাক করে দেওয়ার জন্য প্রায়ই ঐ ল্যাম্প পোষ্টের নিচে এসে দাঁড়িয়ে ফোন দেয়। একটা ছেলে বিষন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথা ভর্তি চুল। নীলার ইচ্ছা করে ছুটে যেতে ঐ ল্যাম্প পোষ্টের ধারে। নীলা একটু পর বুঝতে পারলো, সে ভুল দেখেছে। ল্যাম্পের পোষ্টের নিচে কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ৯:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




