
অফিসে আমার পাশে এক মেয়ে বসে। বেশ সুন্দরী। সুন্দরীর নাম রোজী। এই অফিসে আমিও নতুন, রোজীও নতুন। রোজী আমার সহকারী। আমার কাজ HR এডমিন। জীবনের প্রথম চাকরি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করেই চাকরি টা পেয়ে যাই। আমার বন্ধু রমিজ এসে বলল, দোস্ত চাকরি করবি? আমি বললাম, হুম করবো। জয়েন করে ফেললাম এই এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানীতে। এই কোম্পানী বিদেশ থেকে নানান রকম মেশিনারীজ যন্ত্রপাতি আনে। অফিস গুলশানে। সেই রকম একটা অফিস। পুরো অফিস সেন্টাল এসি। সব চকচকে ঝকঝকে। চা-কফি বিস্কুট কেক সমুচা ইচ্ছা করলে সারাদিনই খাওয়া যায়। কোনো বাধা নিষেধ নেই। জীবনের প্রথম চাকরি খুব উপভোগ করলাম। এডমিনে রকাজ কি কি তা-ও ঠিকমত জানি না। বেতন বেশ ভালো। আমি প্রায় দশ বছর আগের কথা বলছি। মিথ্যা বলব না, রোজীর জন্যই চাকরিটা বেশি উপভোগ করতে পেরেছি।
আমার বড় ভাই এর সাথে কথা বলে সব জেনে নিলাম এডমিনের কাজ কি কি? এবং কিভাবে করতে হয়। আমার সহকারী রোজী বলল, স্যার আপনি চুপ করে বসে থাকেন। চিন্তার কিছু নাই। যা করার আমি করবো। সমস্যা হলো মেয়েটা সারাদিন কোনো কাজ করে না। অফিসের ফোনে ঘন্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যায়। ডায়েরীতে ছবি আঁকে। ছবি বেশ ভালো আঁকে। আমারও বেশ কিছু ছবি এঁকেছে। রোজী একটু পরপর খায়। বাসা থেকে দুনিয়ার খাবার নিয়ে আসে। পাঁচ সাত টা বক্স ভরে নানান রকম খারার, এবং অফিসে অনেক গুলো ডিব্বার মধ্যে নানান রকম খাবার রাখতো। বিস্কুট, চানাচূর। একবার রোজীকে বলেছিলাম, ডাইজেস্টিক বিস্কুট টা আমার খুব পছন্দ। এরপর থেকে সে ডাইজেস্টিক বিস্কুট রাখা শুরু করলো। সারাদিন বসে বসে সেসব খাবার খায়। প্রথম প্রথম আমাকে খাবার সাধতো না। কয়েক সপ্তাহ পর সে আমাকে ছাড়া কোনো খাবার খেত না। আমরা দু'জন এক রুমে পাশাপাশি বসতাম।
রোজী একটার পর একটা বক্স বের করতো। তাতে নানান রকম খাবার। এই মূরগীর রোষ্ট খাচ্ছে, ডিম সিদ্ধ খাচ্ছো, বিশাল এক ভাজা রুই মাছের পিছ খাচ্ছে, আবার কখনও সাদা পোলাউ, বড় চিংড়ি মাছ ফ্রাই। রোজী আর আমি আমরা দু'জন মিলে সারাদিন খেতেই থাকলাম। খাবার গুলো খুব সুস্বাদু। দারুন রান্না। রোজী যে পরিমান খাবার অফিসে আনতো সে খাবার অনায়াসে চারজন খেতে পারতো। কিন্তু রোজী আর কাউকে দিত না। আমরা দু'জন খেয়ে যেটুকু খাবার বাচতো- পিয়ন খেয়ে ফেলতো। পিয়ন আমীনূল প্রতিদিন বাটি গুলো ধুয়ে দিত। এমনও হয়েছে রোজী অফিসে আসেনি কিন্তু আমার জন্য খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে। আমাদের অফিসে ক্যান্টিনে খাবারের ব্যবস্থা ছিল কিন্তু আমরা কখনও অফিসের ক্যান্টিনে খাইনি।
খাওয়ার কথা বাদ দিয়ে এখন অফিসের কাজের কথায় আসি। HR- এর কাজ খুব প্যারার কাজ। সত্য কথা বলতে কি আমার কোনো বেগ পেতে হয়নি। রোজী সব সুন্দরভাবে ম্যানেজ করে নিয়েছে। দেখতে দেখতে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানীতে আমাদের ছয় মাস কেটে গেল। এই ছয় মাসে রোজী সম্পর্কে জানলাম, তার বিয়ে হয়েছে। এক বছর হয়ে গেছে। কিন্তু তার স্বামী তাকে নেয় না। রোজী থাকে তার বাবা মায়ের সাথে। তাদের যৌথ পরিবার। রোজীরা তিন ভাই। তিন ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে এবং তাদের বাচ্চা কাচ্চা আছে। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন রোজী। খুব আদরের। সবাই রোজীকে খুব ভালোবাসে। রোজীর স্বামী রোজীকে কেন নেয় না তা আমি জানতে পারিনি। রোজীর সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ গভীর হয়।
একদিন অফিস ছুটির দিনে রোজী আমাকে ফোন দিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর আসতে বলে। আমি গেলাম ৩২ নম্বর। রোজী আমাকে নিয়ে অনেক কেনাকাটা করলো। আমাকে একটা হাত ঘড়ি কিনে দিল অনেক দাম দিয়ে। পাউফিউম কিনে দিল দুইটা। সে-ও নিজের জন্য অনেক কেনাকাটা করলো। আমরা ধানমন্ডির 'ক্যান্ডেল লাইট' রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম। সেদিনকার খাবারের মেন্যু কি ছিল আজও আমার মনে আছে। থাই স্যুপ, অনথন। ফ্রাইড রাইস, চিকেন ফ্রাই, বিফ সিজিলিং, ফিশ ফ্রাই। সাথে ফানটা মেরিন্ডা কিছু একটা ছিল। খাবার বিল মনে হয় আমিই দিয়েছিলাম। অনেক খাবার বেঁচে গিয়েছিল। সেগুলো পেকেট করে নিয়ে রাস্তার এক ভিক্ষুককে দিয়েছিলাম। বলতে লজ্জা নেই সেদিন আমি প্রথম রোজীর হাত ধরি।
কোনো ভনিতা না করে রোজী আমাকে বলেছিল, স্যার আমাকে বিয়ে করবেন? আমি বিনা দ্বিধায় বলেছিলাম, হুম করবো। সেদিন রোজীকে আমি তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। আমি আমার মা বাবাকে রোজীর কথা বললাম। আমার মা বাপ দুইজনই রোজীর কথা শুনে ভয়াবহ রেগে গেলেন। আমার বাপ বললেন, তুমি আমার সন্তান হয়ে তোমার রুচি এত খারাপ হলো কিভাবে? একটা বিবাহিতা মেয়েকে বিয়ে করতে চাও? এই শিক্ষা তুমি কোথায় পেলে? মা বললেন, ছিঃ। তুই আমার ছেলে হয়ে- তোর এত অধপতন? রোজীকে আমার আর বিয়ে করা হয়নি। বর্তমানে রোজী কানাডা থাকে। সেখানে সে একটা বাঙ্গালী ছেলেকে বিয়ে করেছিল, কিন্তু সেই বিয়ে ছয় মাস টিকেছিল। এখন রোজী একা।
বিঃ দ্রঃ আমার বন্ধু রোজী এই সামু ব্লগে আছে। কি নামে আছে সেটা বলব না। সে মাঝে মাঝে লিখে। আমি তাকে অনেক অনুরোধ করে সামুতে নিয়ে এসেছিলাম। তবে, রোজী নামটা ছদ্মনাম। আসল নাম বলাটা ঠিক হবে না। তবে বুদ্ধিমান ব্লগাররা আশা করি 'রোজী কে' বুঝতে পেরেছেন? অবশ্য এই লেখা পোষ্ট করার আগে রোজির অনুমতি নিয়ে নিয়েছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



