
(প্রচন্ড ভয়ের একটি ভূরের গল্প। বানানো গল্প নয়, বাস্তব সত্য গল্প। যারা ভীতু দয়া করে তারা এই গল্পটি এড়িয়ে যাবেন। কারো কোনো সমস্যা হলে, পোষ্টদাতা দায়ী নহে)।
রাত দুইটা। শীতকাল।
ঝাঁকিয়ে শীত পড়েছে। ঠান্ডা বাতাস তীরের মতো এসে যেন হাড়ে গিয়ে লাগে। এত কুয়াশা যে চারদিকে কিছুই দেখা যায় না। আমি বসে আছি আখাউড়া রেলস্টেশনে। সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দ্যেশে রওনা দিয়েছি। ট্রেন আখাউড়া স্টেশনে থেমেছে। আমি ট্রেন থেকে নেমেছি চা খাওয়ার জন্য। হঠাত পিসাবের বেগ পেলে। স্টেশনের ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। ভয়াবহ নোংরা। আমি রেলস্টেশন থেকে একটু দূরে গিয়ে পিসাব করে এসে দেখি আমার ট্রেন চলে গেছে। পরের ট্রেন কখন আসবে কে জানে! স্টেশন মাস্টারকে খুঁজে পেলাম না। চায়ের দোকানের লোকটা বললো- 'এক ঘণ্টা পুর আবুর ট্রেইন আইসবে।' (এক ঘন্টা পর আবার ট্রেন আসবে) চায়ের দোকানদারের কথা আমি বিশ্বাস করলাম না। বাংলাদেশের ট্রেনের উপর আমার কোনো আস্থা নেই। নেই। নেই।
পরপর দুই কাপ চা খেয়ে আমি একটা ভাঙ্গা বেঞ্চে বসে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়।
আমার গায়ে একটা কাশ্মীরি শাল। এই শাল নীলা দিয়েছিল। এত শীত যে শালে শীত মানছে না। চারপাশ অন্ধকার'ই বলা যায়। স্টেশনের লাইট গুলো দুর্বল। তাছাড়া বড্ড কুয়াশা। খুব বিরক্ত লাগছে। কতক্ষন বসে থাকতে হবে কে জানে! অথচ আমার ঢাকা যাওয়া খুব দরকার। মা হঠাত অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মা আমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন। বারবার জানতে চাচ্ছেন আমি কোথায়? আর কত দেরী হবে? শেষমেষ ডাক্তার মাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। এদিকে আমি মা'র কাছে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে আছি। আমার কাছে সবার আগে মা। আমার যখন জ্বর হয়, মা আমার পাশে সারারাত জেগে বসে থাকেন। একটু পরপর কপালে হাত দিয়ে দেখেন জ্বর কমলো কিনা।
ট্রেন না আসা পর্যন্ত কি করবো বুঝতে পারছি না। খুব টেনশন হচ্ছে।
টেনশন কমানোর জন্য অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করলাম। কয়েক বছর আগে কথা, নীলা'র সাথে আমার খুব ঝগড়া হয়। আমি রাগ করে নীলার সাথে দেখা করা, ফোনে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম। নীলাও রাগ করে আমাকে না জানিয়ে চলে গেল চিটাগাং। তার ছোট মামার বিয়েতে। নীলাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি। যাই হোক, কিছুই ভালো লাগছে না। নীলার জন্য অস্থিরতা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে। চিটাগাং চলে যাবো কিনা বুঝতে পারছি না। ঠিক এই সময়, আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বন্ধুরা বলল, চল কোলকাতা থেকে ঘুরে আসি।
চলে গেলাম বন্ধুদের সাথে কোলকাতা। বন্ধুরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, পার্ক স্ট্রীট, জলদাপাড়া বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, বিরলা টেম্পল, মার্বেল প্যালেস ম্যানশন, হাওড়া ব্রীজ- সব কিছুই ঘুরে ঘুরে দেখালো। কিন্তু আমার কিছুই ভালো লাগলো না। বন্ধুরা হতাশ হলো। শেষে জোসেফ নামে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু নিয়ে গেল খিদিরপুরের নিষিদ্ধপল্লীতে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি ঘটনা কি। এক রুমে বসলাম। নীলার বয়সী একটি মেয়ে এলো। খুব মিষ্টি মুখ। চোখে কাজল দিয়েছে। কপালে টিপ। দুই হাত ভরতি কাচের চুরি। খুব সুন্দর একটা আকাশি রঙের শাড়ি পরা। মেয়েটিকে দেখার পর নিজের অজান্তেই মনে মনে বলে ফেললাম, কিছু কিছু মানুষ আসলেই অনেক সুন্দর!
আমি খাটে বসে আছি। খাটে বসা ছাড়া আর অন্য কোনো জায়গা নেই এই ঘরে। মেয়েটি আমার পাশে বসেছে। মেয়েটির গা থেকে মিষ্টি সুবাস আসছে। সে আমার সাথে খুব রঙ ঢং করছে। মেয়েটিকে আমার বেশ ভালো লেগেছে। খুব সহজ সরল। বিশেষ করে হাসিটি খুব মনোমুগ্ধকর। সত্যি কথা বলতে কি, প্রথমে আমি বুঝতেই পারিনি আমি কোথায় এসেছি! জোসেফ আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে। যখন মেয়েটি বলল, বিয়ার খাবে না ভদকা? তখন আমি বুঝতে পেরেছি জোসেফ আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে আর এই মেয়েটি কে! আমি প্রচন্ড অবাক হয়ে বললাম, আমি কিছুই খাবো না। আমি চলে যাবো। মেয়েটি একটু হেসে বলল, মদের জন্য দাম দিতে হবে না। এটা আমার তরফ থেকে ফ্রি। আমি বললা, স্যরি। আমি এখন চলে যাবো। মেয়েটি আমার কথা শুনে প্রচন্ড অবাক হলো যেন। মেয়েটি খাট থেকে উঠে দাড়ালো, ঠিক তখন মেয়েটির শাড়ির আচল খসে পড়লো। টকটকে লাল ব্লাউজ পরা। মিথ্যা বলব না, চমৎকার ভরাট দু'টি বক্ষ। অবচেতন মনে অন্যায় ইচ্ছা জন্ম নিচ্ছিল। আমার মাথা কাজ করছিল না। আমি মেয়েটিকে বলে বসলাম, আমি নীলাকে ভালোবাসি। মেয়েটি বলল, এখন আমাকে ভালোবাসো। বিনিময়ে আমি তোমাকে অনেক আদর দিব।
আখাউড়া স্টেশনে এত মশা। মশা আমাকে কামড়ে শেষ করে দিচ্ছে।
একে তো প্রচন্ড শীত। প্রচুর মশা। মা অসুস্থ। ট্রেন আসছে না। মায়ের মুখ মনে পড়ছে আর কান্না পাচ্ছে। না জানি মা কেমন আছেন? সিলেট গিয়েছিলাম অফিসের কাজে। মা'র খবর পেয়ে কাজ শেষ না করেই আমাকে ফিরতে হচ্ছে। চাকরি চলে গেলে চলে যাক। সবার আগে মা। আমি স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিক খুব সুনসান। স্টেশন থাকবে মানুষের পদচারনায় মূখর। আর এটা কেমন নিরিবিলি। দু'চারজন কাঁথা মুড়ি দিয়ে প্লাটফর্মে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। একটা মাত্র চায়ের দোকান খোলা ছিল, সে-ও দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কারন ছাড়াই হঠাত আমার খুব ভয় করছিল। খুব ভয়। এই ভয়ের জন্ম কোথায় আমি জানি না। আমি অনুভব করলাম, কে যেন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, 'পালিয়ে যাও, পালিয়ে যাও। তোমার খুব বিপদ।' পালিয়ে যাও।' আমার আশেপাশে কেউ নেই। অথচ আমি স্পষ্ট শুনলাম। তার নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পেলাম যেন।
(দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব আগামীকাল)
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



