
১। শাহেদ ইন্টারভিউ দিতে এসেছে।
সামনে পাঁচ জন বসে আছে। এর মধ্যে একজন লাল গেঞ্জির সাথে লাল রঙের হাফ প্যান্ট পরা। তার সামনে কোক ও চিপস রাখা। সে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে এক চুমুক কোক খাচ্ছে আর একটা করে চিপস। তাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে সে কোক আর চিপস খেয়ে খুব আরাম পাচ্ছে। আরেকজনের সামনে আম। আম সুন্দর করে কাটা। সাথে কাটা চামুচ। আম খেতে খেতে আমওয়ালা প্রথম প্রশ্ন করলো, ট্রান্সলেট করুন- 'আম খুব মিষ্টি'। শাহেদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এটা কি রকম প্রশ্ন! তারপরও সে ট্রান্সলেট করলো। হাফ প্যান্ট পরা লোকটা জিজ্ঞেস করলো, ট্রান্সলেট করুন- 'তার কথায় আমার হাসি পায়'। শাহেদ এটাও স্পষ্ট উচ্চারনে বলে দিল। এক টাক মাথা খুব জ্ঞানী ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ১ টাকায় ১টি চকলেট পাওয়া যায়। আবার প্রতি ৩ টি খালি চকলেটের প্যাকেটের জন্য ১ টি চকলেট পাওয়া যায়। আপনার কাছে ১৫ টাকা থাকলে আপনি সর্বচ্চো কয়টি চকলেট পাবেন??
শাহেদ চল্লিশ সেকেন্ড সময় নিয়ে উত্তর দিলো ২২ টি।
সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরও এই বায়িং হাউজে শাহেদের চাকরি হয়নি।
২। শাহেদ একটা টিভি চ্যানেলে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে।
HR এডমিন পদে। তিনজন ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কত টাকা বেতন চান?
শাহেদ বলল, ৫৫ হাজার।
দ্বিতীয় জন প্রশ্ন করলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা কি?
শাহেদ বলল, দুর্নীতিই হচ্ছে আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা। তারপর সুশিক্ষার অভাব। রাজনীতি।
প্রশ্ন কর্তা বললেন, বুঝিয়ে বলুন।
শাহেদ বলল- গণমানুষের মনো-নৈতিক সমস্যা।
আমি মনে করি না, রাজনীতিই আমাদের মূল সমস্যা। আমি মনে করি না, দারিদ্র্যই আমাদের মূল সমস্যা। আমি মনে করি না, শিক্ষার হার সন্তোষজনক হারে বৃদ্ধি না পাওয়াটা আমাদের মূল সমস্যা। আমি মনে করি, ন্যূনতম মানেও মানবিক হতে না পারা বা অন্য ভাষায় শুদ্ধ জীবনবাদী না হওয়াটাই আমাদের মূল সমস্যা। আপনি যদি এই কথার সাথে একমত হোন, তাহলে আসুন নির্লিপ্ততার জড়তা ভেংগে প্রতিদিন অন্তত একজনকে, যে কোনো একজন মানুষকে, একথা বুঝানো চেষ্টা করি, আমাদের যাবতীয় অগ্রগতির চাবিকাঠি আমাদের কাছেই আছে। সেটি হলো মানুষ হিসাবে পরিচয়, আমাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা। মানবিক বলতে যা বুঝায়।
তৃতীয় জন প্রশ্ন করলেন, হিউম্যান রাইটস ইংরেজীতে বানান করুন। এই প্রশ্নটি শুনে চরম অপমানিত বোধ করলাম। ইচ্ছা করলো ভদ্রলোকের কলার ধরে একটা থাপ্পড় দেই। এখানেও শাহেদের চাকরি হয়নি।
৩। এটা একটা দৈনিক পত্রিকার অফিস। পত্রিকাটা মানের দিক থেকে মোটামোটি।
ইন্টারভিউ নিচ্ছেন স্বয়ং সম্পাদক মহোদয়। তিনি বেশ হাসিখুশি ভাব ধরেছেন। নিজেকে খুব রসিক হিসেবে প্রমান করতে চাইছেন। তবে তিনি খুব ব্যস্ত। এই মোবাইলে ফোন আসছে। হেসে হেসে কথা বলছেন। আবার টিএন্ডটি ফোনে কাকে যেন ফোন করে ধমক দিচ্ছেন। কাগজ কলম নিয়ে কিছু লিখছেন। পিয়নকে ডেকে চা দিতে বলছেন। আরেক পিয়নকে ডেকে বললেন, রশিদ সাহেবকে ডাক দাও। পিয়ন ছুটে গেল রশিদ সাহেবের খোজে। সম্পাদক মহোদয় খুব অস্থির। সে নানান কাজে এতই ব্যস্ত যে আমার দিকে তাকানোর সময়ই পাচ্ছেন না। আমি এক ঘন্টা ধরে চুপ করে বসে আছি। আমার তাকে বলতে ইচ্ছা করলো, আপনি খুব ব্যস্ত। আমি না হয় আরেকদিন আসি। অবশ্য এর আগে তার কাছে আমি আরও তিনবার এসেছি। সে খুব ব্যস্ত থাকায় আমাকে সময় দিতে পারেন নি।
আমি একটু নড়াচড়া দিলাম। তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শোনো শাহেদ রঞ্জু তোমার কথা আমাকে বলেছে। আসলে এই মুহূর্তে আমি তোমার সাথে কথা বলতে পারছি না। পরে একদিন সময় করে এসো। তাছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের কোনো লোক লাগবে না। তুমি যোগাযোগ রেখে। সবচেয়ে ভালো হয় তুমি তিন মাস পরে একবার আমার সাথে দেখা করো।
আমি সম্পাদক মহোদয়কে সালাম দিয়ে হাসি মুখে বের হয়ে এলাম।
৪। এটা একটা ওষুধের কোম্পানী।
সাদা শার্ট আর হালকা নীল রঙের টাই পরে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। যদি এই চাকরিটা আমার হয়ে যায়, তাহলে সারাদিন বিভিন্ন ফার্মেসীতে আমাকে ওষুধ বিক্রি করতে হবে। এবং রাত দশটার পর বিল কালেকশন করে অফিসে জমা দিতে হবে। শুধু এই কাজ না আরও আছে- সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা রোগীদের কি ওষুধ দেয় তা জানতে হবে। যেমন পিজি হাসপাতালে সকাল আট টায় উপস্থিত হতে হবে। রোগী যখন ডাক্তার দেখিয়ে বের হবে তখন তার কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে নিতে হবে।
আমার বন্ধু বলেছে, কোনো চিন্তা করিস না। এই চাকরি হয়েই যাবে। আমি সিইও স্যারকে বলে রেখেছি।
ইন্টারভিউতে মোট তেরটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো আমাকে। সব গুলোই ফালতু প্রশ্ন। তবে আমি সব গুলো প্রশ্ন'র সুন্দর উত্তর দিয়েছি। ইন্টারভিউ নিয়েছেন একজন। তিনি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার।
ম্যানেজার সাহেব হাসি মুখে বললেন, যান আপনি চাকরি পেয়ে গেছেন। আজ বাসায় যাওয়ার সময় মিষ্টি নিয়ে যাবেন। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় কথা- বেতন বেশ ভালো এবং বেতনটা সঠিক সময়ে পাওয়া যায়।
আমি খুব খুশি হলাম। আনন্দে নাচতে ইচ্ছা করছে। ম্যানেজার ব্যাটাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে। এত আনন্দ হচ্ছে যে, ইচ্ছা করছে চিৎকার করে সারা ঢাকা শহরের মানুষকে জানাই- আমার চাকরি হয়েছে! আমার চাকরি হয়েছে!! কিন্তু আমার আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ম্যানেজার সাহেব বললেন, এই চাকরির জন্য তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হবে। অথচ আমার পকেটে আছে মাত্র পঁচিশ টাকা। বাসায় ফিরে যাওয়ার বাস ভাড়া। মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখে পানি এসে পড়লো।
আমি বললাম, স্যার আমার কাছে টাকা নেই।
ম্যানেজার সাহেব বললেন- আমার হাতে অন্য ক্যান্ডিডেট আছে।
আমি বললাম, স্যার আমি চাকরি পেয়ে প্রতি মাসে মাসে আপনাকে দশ হাজার করে দিয়ে দিব।
কিন্তু ম্যানেজার আমার কথাই শুনলেন না।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৮:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




