somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

একটি খুনের ঘটনা

০২ রা মার্চ, ২০১৯ সকাল ৭:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শফিক একা। এই দুনিয়াতে তার কেউ নেই।
এক হিন্দু লোক (নরত্তম চক্রবর্তী) তাকে অনার্স পর্যন্ত পড়িয়েছে। নরত্তম চক্রবর্তী মারা যাবার পর শফিকের আর লেখাপড়া হয়নি। শফিকের ভাগ্য ভালো, সে একটা বাইয়িং হাউজে একটা চাকরি পেয়ে যায়। পিয়ন টাইপ চাকরি। মাস শেষে যে টাকা বেতন পায়, তাতে তার মোটামোটি চলে যায়। সে নিজেই রান্না করে খায়। পুরান ঢাকার একটা বাড়িতে ছাদে এক রুম ভাড়া নিয়ে থাকে। ছুটির দিনে ছাদে দাঁড়িয়ে সে আশে পাশে সব কিছু খুব মন দিয়ে দেখে। নিচে সারাদিন রিকশা, ভ্যান, গাড়ি চলতেই থাকে। বিকট আওয়াজ সারাদিন। শব্দ দ্রুত উপরের দিকে উঠে। তার ঘরের জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির দোতালার বেলকনিটা স্পষ্ট দেখা যায়। বাসায় আনন্দ বলতে তার এই টুকুই। সেখানে মিশু নামে একটা মেয়ে থাকে। মেয়েটাকে শফিকের বেশ ভালো লাগে। শফিক ঠিক করেছে মিশুকে বিয়ে করবে। প্রতিদিনই তাদের রাস্তায় দেখা হয়। চোখাচোখি হতে হতে তাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব হয়েছে। শফিক ঠিক করে রেখেছে আজ যদি মিশুর সাথে দেখা হয় তাহলে সে জোর করে তাকে কফি খাওয়াতে নিয়ে যাবে।

শফিকের বয়স ত্রিশ।
আঠাশ বছর বয়সে শফিক বুঝতে পারে তার চোখে সমস্যা। দিন দিন সে চোখে কম দেখছে। তার রাস্তায় চলাচল করতে ভীষন সমস্যা হয়। তার একটা বাইক আছে- আজকাল বাইক চালাতে তার খুব সমস্যা হয়। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতেও তার ভয় হয়। সে চোখের ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার তার চোখ ভালো করে পরীক্ষা করে এবং বলে তার চোখে বিরাট সমস্যা। অপারেশন করতে হবে। অপারেশন করতে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা লাগবে। এবং যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করিয়ে নিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়- দুই সপ্তাহের মধ্যে অপারেশন করাতে পারলে। শফিকের মাথায় হাত। সে দরিদ্র মানুষ। ৩ লাখ ৬৫ হাজার সে পাবে কোথায়? সে চাকরি করে এক বছরে দুই লাখ পায় না। শফিক মন খারাপ করে বাসায় ফিরলো। চোখের চিন্তায় সে খুব অস্থির। তার কত কত স্বপ্ন এখনও সত্যি হওয়া বাকি আছে। শফিক এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে মিশুর ঘরের দিকে। নানান উছিলায় মিশু বেলকনিতে আসে। আর কিছু দিন পর হয়তো মিশুকে সে দেখতে পাবে না। পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাবে। ইসলামপুরে শফিক এক কাপড়ের দোকানে প্রায়ই যায়। এই কাপড়ের দোকানের মালিক নিজাম উদ্দিন তাকে খুব স্নেহ করেন।

একদিন বিকেলে অফিস শেষে।
বাসায় ফেরার পথে কি মনে করে শফিক মিশুর বাসায় যায়। দরজায় দাঁড়িয়ে নক করে কিন্তু দরজা খুলে না মিশু। অথচ শফিক খুব বুঝতে পারে ঘরে কেউ আছে। শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। লাইট জ্বলছে। শফিক দরজা নক করেই যাচ্ছে। অনেকক্ষন পর এক ভদ্রলোক ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন। ভদ্রলোকের মুখ বেশ অশান্ত। শফিক বলে এই ঘরে মিশু থাকে। আমি মিশুর কাছে এসেছি। আপনি কে? ভদ্রলোক কোনো কথা না বলে শফিককে ঘরে আসতে বলে। শফিক ঘরে ঢুকে দেখতে পায় মিশুকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। পুরো ঘরে রক্ত আর রক্ত। ভদ্রলোক বলেন, আমি মিশুকে খুন করিনি। বিশ্বাস করুন আমি মিশুকে খুন করিনি। মিশু আমার অফিসে চাকরি করে। আমি এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঘরে ঢুকে দেখি মিশু মরে পরে আছে। ভদ্রলোক তার মোবাইল নম্বর শফিক দেয় এবং শফিকের নম্বর নেয়। তারপর তারা দু'জন ঘর থেকে বের হয়ে যায়। শফিক প্রচন্ড ভীতু মানুষ। মিশুর লাশ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে, সে বড় ধরনের ধাক্কা খায়। সে মিশুকে ভালোবাসে। বিয়েও করতে চেয়েছিল। সীমাহীন কষ্ট হয় শফিকের। সে মনে মনে ভেবে রেখেছিল মিশুকে বিয়ে করবে। একদিন তাদের আনন্দময় সংসার হবে।

তিনদিন পর পুলিশ আসে। এবং মিশুর লাশ নিয়ে যায়।
পুলিশ তাদের তদন্ত চালাতে থাকে। এদিকে এক সপ্তাহ পার হয়ে যায়। শফিকের চোখের অবস্থা ভালো না। ডাক্তার বলে দিয়েছেন যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে। একদিন ওই ভদ্রলোক শফিককে ফোন করেন। শফিক তার সাথে দেখা করে। ভদ্রলোক আবারও বলেন, আমি মিশুকে খুন করিনি। কিন্তু তার কোনো প্রমান আমি দিতে পারবো না। মিশুর ঘরে আমার হাতের ছাপ পাওয়া যাবে। মিশুকে আমি টাকার বিনিময় ভোগ করি। সে আমার সাথে অফিস ট্যুরের নাম দিয়ে ঢাকার বাইরে যেত নিয়মিত। আমার সাথে রাত কাটাতো টাকার বিনিমিয়ে। যদিও আমার বউ, বাচ্চা আছে। সেদিন আপনি আমাকে মিশুর ঘরে দেখে ফেলেছেন। বলা যায় আপনিই প্রধান সাক্ষী। পুলিশ খুব তদন্ত চালাচ্ছে। হয়তো আপনার বাসায় যাবে পুলিশ। আশে পাশে অনেক বাসায়ই যাচ্ছে। ভদ্রলোক কোনো ভনিতা না করে শফিককে বলল, তুমি কত টাকা চাও? শফিক কোনো চিন্তা ভাবনা না করেই বলল, আমি ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা চাই। ভদ্রলোক সাথে সাথে একটা চেক লিখে দিয়ে দিল শফিকের হাতে।

শফিক ব্যাংক থেকে টাকা ক্যাশ করে হাসপাতালে গেল।
হাসপাতালের লোক বলল, সব মিলিয়ে টাকা লাগবে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার। সফিক বলল, ডাক্তার আমাকে বলেছেন, ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। হাসপাতালের লোক বলল, এক্সট্রা কিছু খরচ আছে। বেড ভাড়া, ওষুধ ইত্যাদি। শফিক ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হাসপাতালে জমা দিল। আর বলল, বাকি টাকা কিছুদিনের মধ্যে জমা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো। সে অফিসে গিয়ে তার বসলকে বলল, আমার কিছু টাকা লাগবে। আমার চোখে সমস্যা, অপারেশন করাতে হবে। অফিস থেকে তাকে টাকা দিল না। বরং কটু কথা শুনিয়ে দিল। এদিকে তার চোখের অবস্থা আরও বেশি খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন। সে ওই ভদ্রলোকের কাছে আবার গেল, বলল- স্যার আমাকে আরও কিছু টাকা দেন। নইলে আমি পুলিশের কাছে আপনার নাম বলে দিব। ভদ্রলোক অখুশি হলেও শফিককে চোখের অপারেশনের বাকি টাকাও দিয়ে দিল। শফিক হাসপাতালে বাকি টাকা জমা দিল। দুইদিন পর তার অপারেশন হবে। সে অফিস থেকে ছুটি নিল এবং বাসায় ফেরার পথে তার চোখের ডাক্তারের সাথে দেখা। শফিককে দেখে ডাক্তারের খুব মায়া লাগলো। ডাক্তার বলল, শফিক সাহেব আপনার চোখ কোনো দিনও ভালো হবে না। শফিক বলল, তাহলে আপনি যে বললেন, অপারেশন করলে চোখ ভালো হয়ে যাবে। ডাক্তার বললেন, এরকম কথা আমাদের রোগীদের বলতে হয়। হাসপাতালে টাকা জমা দিয়েছেন, সেখান থেকে আমি আমার কমিশন পেয়ে গেছি।

শফিক হাসপাতালে গেল, তার টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য।
সে ঠিক করেছে হাসপাতাল থেকে টাকা ফেরত নিয়ে সে ওই ভদ্রলোককে ফিরিয়ে দিবে। কিন্তু হাসপাতাল তাকে টাকা ফিরত দিল না। বলল, টাকা ফেরত দেবার নিয়ম নাই। এবং শফিক যদি খুব হই চই বা বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে তাকে মেরে হাড্ডি ভেঙ্গে দেওয়া হবে। এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে দিয়ে দিব। ইত্যাদি ভয় ভীতি দেখিয়ে তারা শফিক কে হাসপাতাল থেকে বের করে দিল। শফিক কাদতে কাদতে বাসায় ফিরলো। সে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে আর চোখে দেখতে পাবে না! এত কষ্টের টাকাও ফেরত পাওয়া গেল না। ভীষন কষ্ট হচ্ছে তার। সে তার চোখের চিকিৎসা করার জন্য অনেক চিন্তা আর পরিকল্পনা করে মিশুকে খুন করে, ভদ্রলোকের কাছ থেকে অপারেশনের টাকা যোগাড় করলো। মুহুর্তের মধ্যে তার সমস্ত পরিকল্পনা মিথ্যা হয়ে গেল। ভুল হয়ে গেল। সে কি এখন পুলিশের কাছে যাবে? সব স্বীকার করবে? না বুড়িগঙ্গা সেতু থেকে নিচে পড়ে আত্মহত্যা করবে? অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভালো। কিছু কিছু মানুষ তার এক জীবনে কিচ্ছু পায় না।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০১৯ সকাল ৭:৪০
১৪টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুভ সকাল। আসসালামু আলাইকুম।

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩৪



ভোর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে!
অবশ্য বর্ষাকাল চলছে, বৃষ্টি তো হবেই। ছাতা ছাড়াই বাসা থেকে বের হলাম। ছাতা নেই। ভেঙে গেছে। এক বছর হয়ে গেলো। কিনবো কিনবো করে আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি

লিখেছেন ইসিয়াক, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০৬




বিরহকাতর মেঘদল
অবশেষে সকল অভিমান ভুলে
ঝরছে একটানা বাদলধারায়।

অবসন্ন মৃত্তিকা
বহু প্রতীক্ষিত আলিঙ্গনে
আহ্লাদে আকুলায়।

শীতল অবগাহনে চক্ষে নামে আনন্দাশ্রু
স্বাগতম স্বাগতম হে ধারাপাত!
ঝরো অবিরাম।
বৃষ্টির জলধারা বয়ে চলুক নিরন্তর !

পূর্ণ আবেগে
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
মেতে উঠি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা, পরিকল্পনা কোথায়?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:১৯



শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময় পার হয়ে গেলে আবার নতুন ডেট দিচ্ছেন। তিনি কি আসলেই ফিরবেন? নাকি নিজের দলকেই কনফিউজ করে রাখছেন? অথবা শুধু জাশির ঘুম হারাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রামের বন্যায় আক্রান্তদের জন্য আমরা কি কিছু করতে পারি?

লিখেছেন সৈয়দ তাজুল ইসলাম, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ ভোর ৪:০৭


সম্মানিত ব্লগার,
বাংলাদেশের সবরকমের দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের ব্লগারদের বিশেষ অবদান রয়েছে। দুর্যোগে আক্রান্তদের সহযোগিতায় আমাদের সামু ব্লগারেরা সবসময়ই এগিয়ে এসেছেন। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আমি অনুরোধ করছি না। আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×