
আমি রমিজ উদ্দিন।
অনেক কষ্টে লেখাপড়া শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই খেয়ে না খেয়ে বড় হয়েছি আমরা চার ভাই বোন। বাপ শালা আরেকটা বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। বছরের পর বছর আমাদের কোনো খোজ খবর নেয় না। আমার মা সীমাহীন কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। আমাদের সাথে থাকতো আমার নানা নানী। মোট সাত জনের সংসার। অনেক খরচ। আমাদের লেখাপড়া প্লাস আমাদের সাতজন মানুষের খাবার সংগ্রহ করতে আমার মায়ের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। মা অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রচুর খেটেছেন। মায়ের কষ্ট দেখেছি আর গোপনে কেঁদেছি আমি। এখন আমার মা আরামে আছেন। তাকে রানী করে রেখেছি। মাকে কাজ করতে দেই না। তিন জন কাজের লোক রেখেছি বাসায়।
কেরানীগঞ্জের দুই রুমের একটা ছোট্র বাসায় আমরা ভাড়া থাকতাম।
আমার এক বোন পালিয়ে বিয়ে করে ফেলল এক ড্রাইভারকে। অন্যদিকে ছোট ভাইটা একটা গার্মেন্টসের মেয়েকে বিয়ে করে ফেলল। বিয়ের পর তারা আমাদের সংসারে এসে উঠলো। খাওয়ার লোক গেলো আরও বেড়ে। ভয়াবহ অবস্থা। কি যে কষ্ট গিয়েছে আমাদের! সংসারে আমিই বড় ছেলে। আমার উপরেই আমার মায়ের অনেক ভরসা। আমি পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকরী পেয়ে গেলাম। বেতন খুব অল্প। মাত্র ষোল হাজার টাকা। যদিও বর্তমানে আমি আশি হাজার টাকার উপরে বেতন পাই। উপরি কামাইও অনেক আমার। আমি আমার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমার পরিবারের সকল সদস্যকে উন্নত জীবন দিয়েছি। এখন পরিবারের প্রতিটা সদস্য বেশ আছে। কোনো কিছুর অভাব নেই।
একসময় সকালে আমি ছাতু দিয়ে নাস্তা করতাম।
ছাতু মানে চাল ভেজে পাঠায় বেটে ফাঁকি করা হতো। সেটা অল্প চিনি আর পানি মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খেতাম। এটাই ছিল আমার সকালের নাস্তা। অথচ আজ আমি প্রতিদিন সকালে তিন চার পদের জুস, মাখন, রুটি, অনেক রকমের ফল ইত্যাদি দিয়ে নাস্তা করি পরিবারের সবাইকে নিয়ে। আজকাল তো কমোডে খবরের কাগজ নিয়ে না বসলে আমার পটি হয় না। আগে পটি করতে হলেও লাইনে দাড়াতে হতো। কেরানীগঞ্জ থেকে এখন আমরা থাকি ধানমন্ডির বিশাল বড় এক ফ্লাটে। আমার মা বোন, ভাই আর নানা নানী বেশ ভালো আছে। গতমাসে নানীকে ইন্ডিয়া নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনলাম। আমি পরিশ্রম করে আর আমার বুদ্ধি দিয়ে সবাইকে ভালো রেখেছি। অফিসে আমার চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বেশ কিছু কর্মচারীকে আমি সিস্টেম করে চাকরী থেকে তাড়িয়েছি। আসলে যারা আমার চলার পথের কাঁটা তাদের আমি রাখি না। হে হে।
গ্রামের বাড়িতে এক খন্ড জায়গা ছিল আমাদের।
পাঁচতালা ফাউন্ডেশন দিয়ে তিনতলা বাড়ি করেছি মনের মতোন করে। পানির মতোন টাকা খরচ করেছি। এই টাকা আমি আমার বুদ্ধি দিয়ে ইনকাম করেছি। মাত্র ষোল হাজার টাকা বেতনে চাকরীতে ঢুকে এখন পাই আশি হাজার টাকা। উপরি ইনকামও মন্দ নয়। বেশি টাকা ইনকাম করার জন্য আমাকে সীমাহীন পরিশ্রম করতে হয়েছে। রাতে বাসায় ফিরতে হয়েছে এগারো-বারোটায়। কেউ আমাকে টাকা এমনি এমনি দেয়নি। এই তো তিন মাস আগে পুরো পরিবারের সবাইকে নিয়ে থাইল্যান্ড থেকে ঘুরে এলাম। এবার ঈদের ছুটিতে মালোশিয়া যাবার ইচ্ছা আছে। পরিবারকে স্বচ্ছল করতে গিয়ে আমাকে অসৎ হতে হয়েছে। আমার খুব বুদ্ধি। কেউ আমার চালাকি এবং উদ্দ্যেশ বুঝতে পারেনি আজ পর্যন্ত। আমি তিলে তিলে আমার স্বপ্ন পুরা করতে পেরেছি। অথচ পুরো অফিস জানে আমি একজন সৎ লোক। সৎ হলে বাড়ি করতে পারতাম না। ব্যাংকে কারি কারি টাকা জমাতে পারতাম না। পরিবারকে খুশি রাখতে পারতাম না।
একসময় আমাকে লোকাল বাসে করে চলাচল করতে হতো।
এখন আমি উবার ছাড়া চলাচল করতে পারি না। অবশ্য এখন গাড়ি কেনার ক্ষমতাও আমার আছে। কিন্তু গাড়ি কিনলে অফিসের অনেকের চোখ লেগে যাবে। এমনিতেই অনেকে গোপনে নানান রকম ফিসফাস করে। কিছু কিছু তো আমার কানে আসে। যে আমার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাকে সরিয়ে দেই। আসলেই অল্প সময়ে এবং অল্প বয়সে আমি অনেক টাকা করে ফেলেছি। মাঝে মাঝে আমি মদ খাই। মদ খেয়ে সাহিত্য করতে বসি। বাংলা সাহিত্যে আমি জায়গা চাই। প্রয়োজনে টাকার বিনিময়ে সাহিত্য দখল করবো। টাকা থাকলে যা খুশি তাই করা যায়। এই আমি'ই টাকার জোরে কত বদলে গেলাম। অতীতের কথা ভাবলে খুব কষ্ট হয়। তাই অতীতের ঘরে তালা মেরেছি। এখন আমিই আমার বাপকে পর্যন্ত নিয়মিত টাকা বিকাশ করে পাঠাই। আমি চাকরী করি এক শিল্পপতির আন্ডারে। শালার সীমাহীন টাকা। সিস্টেম করে আমি তার কাছ থেকে অনেক টাকা বাগিয়ে নিই। শালা বুঝে না। শালাও সিস্টেম করে সীমাহীন টাকা করেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০১৯ রাত ৯:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



