somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভাবছি ব্যবসা করবো। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

বিরাট বিপদ

০৮ ই জুলাই, ২০১৯ দুপুর ২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্রথমেই বলে নিচ্ছি, দুর্বল চিত্রের কেউ এই লেখাটা পড়বেন না।
বাগেরহাট যাচ্ছি। সুন্দরবনের পাশে একটি গ্রাম। গ্রামের নাম রসুলপুর। ঢাকা থেকে সকাল ১০ টায় বাসে উঠলাম। রাস্তায় তিন বার বাস নষ্ট হলো। বিকেলে পৌঁছানোর কথা ছিল রায়েন্দা। আমি রায়েন্দা পৌছালাম রাত ৩ টায়। পনের বছর আগের কথা। তখন রাস্তাঘাট খুব উন্নত ছিল না। প্রচন্ড শীত। বাস থেকে নেমে আমি কাঁপছি। চারপাশে ঘুটঘুট অন্ধকার। আমার সাথে যে ক'জন বাস থেকে নেমেছিল তারা কে কোথায় চলে গেল। ঈদের ছুটিতে বন্ধুর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। তখন মোবাইল ছিল না।

বাজারের মতো একটা জায়গায় বাস নামিয়ে দিয়েছে। চার পাঁচটা কুকুর একটা ভাঙ্গা চায়ের দোকানের সামনে জট পাকিয়ে আছে। আমি ভীতু টাইপ ছেলে না। আমার আছে লজিক। কত কঠিন কঠিন ভূতের বই পড়ে আর মুভি দেখে ভয় পাইনি। যাই হোক, আমার বন্ধু বাবলু বলেছিল- তুই বাস থেকে নেমে দেখবি আমি তোর জন্য বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছি। হয়তো বাবলু বাইক নিয়ে বিকেলে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে চলে গেছে। বাবলু ছেলে হিসেবে খুব ভালো। যথেষ্ট আন্তরিক। বন্ধু বাবলু বলেছিল- রায়েন্দা থেকে ভ্যানে করে রসুলপুর গ্রামে যেতে আধা ঘন্টা লাগে। এত রাতে একটা ভ্যানও নেই। আমি সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করলাম।

মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। ভয়াবহ অন্ধকার। প্রচন্ড কুয়াশা। নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি ঝরছে। বাতাসে গাছের পাতার শনশন শব্দ। বাবলু বলেছিল- মাটির রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই আমাদের গ্রাম। বাবলুর বাবা গ্রামের ডাক্তার। খুব নাম ডাক আছে। সুন্দরবন থেকে নানাবিদ জিনিসপত্রন সংগ্রহ করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে তারা বনের পশু দ্বারা আক্রান্ত হলে বাবলুর বাবার ফার্মেসীতে আসে চিকিৎসা নিতে। কেউ মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে গেছে, কেউ বাঘের থাবা খেয়েছে, কেউ সাপের কামড় খেয়েছে। গ্রামের লোকদের ভয়-ডর খুব কম থাকে।

এই প্রচন্ড শীতেও আমি ঘেমে গেছি। অনেকক্ষন ধরে হাঁটছি। পথ আর শেষ হয় না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। খুব ক্ষুধাও পেয়েছে। বিকেলের পর আর কিছুই খাইনি। ক্ষুধার সময় আমার মাথা কাজ করে না। ইচ্ছে করছে আশে পাশের কোনো বাড়িতে গিয়ে বলি- আমি অমুক, অমুক জায়গা থেকে আসছি, অমুক জাগায় যাবো। আমার খুব ক্ষুধা লাগছে আমাকে খাবার দিন। যদি কিছু না থাকে- তাহলে গুড় মুড়ি দেন। আর চাপকল থেকে ঠান্ডা এক মগ পানি। সমস্যা হলো আশে পাশে কোনো বাড়ি ঘর দেখতে পাচ্ছি না। মনে হয় জংলের মধ্য দিয়ে হাঁটছি। ঠিক এমন সময় একটা ভ্যান গাড়ি দেখতে পেলাম। ভ্যানগাড়ির নিচে একটা হারিকেন মিটমিট করে জ্বলছে। আমি দৌড়ে ভ্যানগাড়ির সামনে গেলাম। এবং অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম।

ভ্যানগাড়িতে সতের আঠারো বছরের একটা রুপসী মেয়ে বসে আছে। কিন্তু সে কাঁদছে। খুব কাঁদছে। একটা লোক শুয়ে আছে। তার সমস্ত শরীর ডাকা। আর বুড়ো মতো একলোক ভ্যান চালাচ্ছে। আমি ভ্যান চালককে বললাম- রসুলপুর গ্রামে যাব। ডা. শাহজাহান তালুকদারের বাড়িতে। মনে হয় আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। দয়া করে কি আমাকে সেখানে নিয়ে যাবেন? প্লীজ। বুড়ো ভ্যান চালক- মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল শেফালি বুবুকে জিজ্ঞেস করেন। আমি শেফালি'র দিকে তাকাতেই, তিনি ভ্যানে উঠে বসতে ইশারা করলেন। এতটুকু করুনা করার জন্য আমার ইচ্ছা করলো মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরি।

অন্ধকার রাস্তা আর প্রচন্ড বাতাস ভেঙ্গে ধীরে ধীরে ভ্যান চলছে। বেশ ভালো লাগছে। মানুষের মনে এখনও মায়া মমতা আছে। এই মধ্য রাত্রে সাহায্য চাইতেই পেয়ে গেলাম। শেফালি এখনও কেঁদে চলেছে। আমার পাশে একটি লোক শুয়ে আছে। তার চোখ মুখ ঢাকা। এই মেয়েটি এই লোকটির কি হয়? আমি বেশিক্ষন চুপ করে থাকতে পারি না। শেফালিকে জিজ্ঞেস করলাম বোন আপনি কাদছেন কেন? কি হয়েছে? শেফালি কান্না থামিয়ে বলল- যে লোকটি শুয়ে আশে, সে আমার স্বামী। সাপের কামড়ে সে আজ সন্ধ্যায় মারা গেছে। তাকে নিয়ে উত্তর পাড়ার শ্মশানে যাচ্ছি। হঠাত করে আমি প্রচন্ড ভয় পেলাম। আমার হাত পা কাঁপছে। আমি এতক্ষন একটা লাশের পাশে বসে আছি! ইচ্ছা করছে- একটা লাফ দিয়ে বাবাগো মাগো বলে ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে দৌড় দেই।

আমি গল্পের একদম শেষ প্রান্তে চলে এসেছি।
এরপর যা ঘটল, আমি তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ধুম করে লাশটি দাঁড়িয়ে গেল! তার হাতে ইয়া লম্বা একটা রাম দা। এই রাম দা দিয়ে সাত ফিট দূর থেকেও আমার গলা কেটে নিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। শেফালি বুবু'র হাতে একটা চাইনিজ কুড়াল। মিথ্যা বলব না, চাইনিজ কুড়াল হাতে মেয়েটিকে খুব সুন্দর লাগছিল। বুড়ো ভ্যান চালক আমার পেছন দিয়ে এসে আমাকে জাপটে ধরল। বুড়োর এত শক্তি আমি বুঝতেই পারিনি। তাকে দেখে তো মনে হচ্ছিল তার ভ্যান চালাতেই খুব কষ্ট হচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে আমার সব কিছু নিয়ে নিল। গলার চেন, হাতের আঙটি। ম্যানিব্যাগ। দুই ব্যাগ ভরতি জামা কাপড়। শেফালি বুবু বলল- ওর শার্ট প্যান্ট খুলে, ওকে ন্যাংটা করে ধানক্ষেতে ফেলে রাখলে কেমন হয়? ভ্যান চালক আর রাম দা হাতে লোকটি শেফালির কথায় শায় দিল। আমি মেয়েটির নিষ্ঠুরতায় প্রচন্ড মর্মাহত হলাম। দুঃখ,কষ্ট আর অপমানে আমি জ্ঞান হারালাম।

ভোরবেলা গ্রামের কিছু মুরব্বী মসজিদে ফযরের নামাজ পড়তে গিয়ে আমাকে ধানক্ষেত থেকে উলঙ্গ অবস্থায় উদ্দার করে। এরপর আমি টানা সাত দিন জ্বরে ভুগলাম। অনেক থানা পুলিশ হলো। সমস্ত গ্রামের মানুষ আমাকে দেখতে এলো। স্থানীয় সংবাদ কর্মী আমার উপর এই বিরাট প্রতিবেদন লিখল।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১৯ দুপুর ২:৫৯
১৭টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তাহলে ন্যায় ও সত্যের জায়গাটি কোথায় বাংলাদেশে?

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ রাত ১:৪৩

তাহলে ন্যায় ও সত্যের জায়গাটি কোথায় বাংলাদেশে?
আইডি হ্যাক করে সাজানো মিথ্যা অভিযোগের একটি আয়োজন!
জালিয়াতি চিহ্নিত হল, উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে। এ নিয়ে একটা জিডিও হলো।

সবকিছু জেনেশুনে প্রশাসনকে বলা হলো, যেহেতু এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যাঙের বিয়ে [শিশুতোষ ছড়া]

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ ভোর ৫:৫৬


কোলা ব্যাঙের বিয়ে হবে
চলছে আয়োজন ।
শত শত ব্যাঙ ব্যাঙাচি
পেলো নিমন্ত্রণ ।।

ব্যাঙ বাবাজী খুব তো রাজী ,
বসলো বিয়ের পিড়িতে
ব্যাঙের ভাইটি হোঁচট খেলো,
নামতে গিয়ে সিড়িতে ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় অগ্রসর তরুণ প্রজন্মকে 'খোলাচিঠি'

লিখেছেন , ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ৮:৫৮


প্রিয় অগ্রসর তরুণ প্রজন্ম,

তোমরা যারা ডিজিটাল যুগের অগ্রসর সমাজের প্রতিনিধি তাদের উদ্দেশ্যে দু'লাইন লিখছি। যুগের সাথে খাপ খাইয়ে ওঠতে অনেক কিছু আস্তাকুঁড়ে ফেলতে হয়। সেটা কেবলই যুগের দাবি, চেতনার চালবাজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পত্রিকা পড়ে জেনেছি

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:২৮



খবরের কাগজে দেখলাম, বড় বড় করে লেখা ‘অভিযান চলবে, দলের লোকও রেহাই পাবে না। ভালো কথা, এরকমই হওয়া উচিত। অবশ্য শুধু বললে হবে না। ধরুন। এদের ধরুন। ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ভারত ভ্রমণের পর অপ-প্রচারণার ঝড়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:১০



বাংলাদেশের প্রতিবেশী হচ্ছে ২টি মাত্র দেশ; এই ২টি দেশকে বাংগালীরা ভালো চোখে দেখছেন না, এবং এর পেছনে হাজার কারণ আছে। এই প্রতিবেশী ২ দেশ বাংলাদেশকে কিভাবে দেখে? ভারতর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×