
সময়ঃ সকাল আট টা পাঁচ মিনিট।
বারঃ রবিবার। ২৩ মহরম ১৪৪১ হিজরি। ৮ আশ্বিন ১৪২৬ বাংলা।
স্থানঃ কমলাপুর রেলস্টেশন।
ট্রেন ছাড়ার কথা নয়টায়। শাহেদ জামাল দিনাজপুর যাবে। এখনও হাতে পঞ্চান্ন মিনিট সময় আছে। পঞ্চান্ন মিনিট অনেক সময়। এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই করা যায়। সকালের নাস্তাটা করে ফেলা যায়। কয়েকটা জরুরী ফোন করে নেওয়া যায়। ট্রেনে খাওয়ার জন্য কিছু কিনে নেওয়া যায়। শাহেদ জামালের কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। সে চুপ করে বসে আছে। এত সকালেও চারপাশের মানুষ জন খুব ব্যস্ত। শাহেদের কোনো ব্যস্ততা নেই বলেই, তার অন্যের ব্যস্ততা দেখতে ভালো লাগে। গতকাল রাতে নীলার সাথে বেশ ঝগড়া হয় শাহেদের। নীলা বেশ কিছু কঠিন কথা শাহেদকে বলেছে। রাগের সময় নীলার নাক ফুলে যায়, চোখ লাল হয়ে যায়। তখন তাকে বিছছিরি লাগে। নীলা যে এত কঠিন করে কথা বলতে পারে, তা শাহেদ কোনোদিন চিন্তাও করে নি। প্রেমের সময় নীলা কত সুন্দর করেই না কথা বলতো! ভীষন মিষ্টি লাগতো শুনতে। নীলা বদলে গেছে। আসলে মেয়েরা বিয়ের পর বদলে যায়।
ট্রেন চলছে। এক ঘন্টা দেরী করে ট্রেন ছাড়লো।
অবশ্য দুই ঘন্টা দেরী করে ট্রেন ছাড়লেও শাহেদ জামালের কিছু যায় আসে না। সে কোনো জরুরী কাজে যাচ্ছে না। স্ত্রীর সাথে রাগ করে কমলাপুর রেলস্টেশন চলে এসেছে। কাউন্টারে গিয়ে দিনাজপুরের টিকিট পেয়েছে। দিনাজপুরের টিকিট কেটেছে। রাজশাহীর টিকিট পেলে, রাজশাহীর টিকিট কিনতো। দিনাজপুর বা রাজশাহীতে শাহেদের কোনো পরিচিত কেউ নেই। ট্রেনে যেখানে গিয়ে থামবে শাহেদ নেমে যাবে। এবার শাহেদ নীলাকে একটা শিক্ষা দিবে। খারাপ ব্যবহার করার মজা পাবে। শাহেদ কতটা কঠিন হতে পারে এবার নীলা তা টের পাবে। ট্রেনে উঠেই শাহেদ জামাল তার মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে। নীলার ঘুম ভাঙ্গবে সকাল দশটায়। সে ঘুম থেকে উঠে দেখবে- শাহেদ নেই। টেবিলে একটা চিঠি পড়ে আছে। চিঠিতে লেখা- ''তুমি একটা প্রচন্ড বেয়াদপ মেয়ে। প্রচন্ড নির্বোধ। আর আমি খুব বেশি ভদ্র এবং সহজ সরল ভালো মানুষ। কিন্তু তুমি আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছো। তোমার মতো মেয়ের সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি বিদায় নিলাম। কাল রাত্রে কেন তোমাকে একটা লাথথি দেইনি, তাই এখন আমার আফসোস হচ্ছে।
ট্রেন মাত্র এয়ারপোর্ট পার হলো। বেশ কিছু যাত্রী উঠলো।
সামনের স্টেশনে ট্রেন থামবে সেখানে কিছু যাত্রী উঠবে, কিছু যাত্রী নামবে। এরকম চলতেই থাকবে। স্টেশনে ট্রেন থামলে ভালোই লাগে। ট্রেন থেকে নেমে চা-টা খাওয়া যায়। অবশ্য শাহেদ জামালের মেজাজ বেশ খারাপ। ট্রেন থামলেও সে ট্রেন থেকে নামছে না। সকাল থেকে সে চা-সিগারেট কিছুই খায়নি। নীলার খারাপ ব্যবহারের কারনে তার ক্ষুধা তৃষ্ণা বোধ সব চলে গেছে। কাল রাতে নীলা সিরামিকের ফুলদানিটা উড়িয়ে মেরেছে শাহেদের দিকে। শাহেদ সরে গেছে নইলে ফুলদানিটা তার কপালে লাগতো। রক্তারক্তি হতো! এই লজ্জার কথা শাহেদ কোনোদিন কাউকে বলত্রে পারবে না। শাহেদের জাগায় অন্য কোনো ছেলে হলে নীলার চুলের মুঠি ধরে মধ্যরাতেই ঘর থেকে বের করে দিত। শাহেদের পক্ষে এটা সম্ভব না। ট্রেন চলছে তার নিজস্ব ছন্দ নিয়ে। শাহেদ এর পাশে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক বয়স্ক একলোক বসে আছেন। তার চোখে ভারী চশমা। লোকটি খুব মন দিয়ে পত্রিকা পড়ে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক দেখতে অনেকটা ভারতের অভিনেতা নানা পাটেকরের মতোন।
ট্রেন গাজীপুর পার হয়ে গেছে।
আগামী এক ঘন্টা ট্রেন আর কোথাও থামবে না। শাহেদ এর পাশে বসা ভারী চশমা পড়া ভদ্রলোক বললেন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? শাহেদ বলল, আমি দিনাজপুর যাচ্ছি। ভদ্রলোক বললেন, এই ট্রেন চিটাগাং যাচ্ছে। শাহেদ পকেট থেকে ট্রেনের টিকিট বের করে ভালো করে দেখলো, আসলেই ট্রেন চিটাগাং যাচ্ছে। দিনাজপুর নয়। ট্রেন চিটাগাং যাক, বা দিনাজপুর যাক তাতে শাহেদের কিছুই যায় আসে না। ভদ্রলোক টিফিন বক্স বের করলেন। টিফিন বক্স ভরতি খাবার। শাহেদকে বললেন, আপনি নিশ্চয়ই ক্ষুর্ধাত? ভদ্রলোক একাই খেলেন না শাহেদকেও সাথে নিয়েই খেলেন। চালের আটার রুটি, হাঁসের মাংস আর সবজি। চমৎকার রান্না। বেশ আরাম করেই তারা দু'জনে খেলো। সব শেষে ভদ্রলোক একটা ফ্লাক্স বের করলেন। ফ্লাক্স ভরতি চা। তারা দু'জনে বেশ আরাম করে চা খেলো। চা শেষ করে শাহেদ বললো, চাচা আসলেই আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছিল। চাচা বললেন, আমি জানি। এও জানি তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। কমলাপুর এসে আন্দাজে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়েছে। শাহেদ মনে মনে ভাবছে, কিছু মানুষ এত বুদ্ধিমান হয় কি করে!(?) মিসির আলীর সাথে উনার বেশ মিল।
কখন ট্রেন চিটাগাং চলে এসেছে শাহেদ জানে না।
চাচার কথা শুনতে শুনতে শাহেদ অবাক। চাচা অনেক জানেন। ওস্তাদ লোক। জ্ঞানী একজন মানুষ। বুদ্ধিমান একজন মানূষ। যখন কথা বলেন, প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন। উনার কথা শুনে শাহেদ জামাল মুগ্ধ! ক্যাপিটালিজম আর রেসিজম নিয়ে উনার চিন্তা ভাবনা অনেক উন্নত। ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের মতন উনি একটানা কথা বলেন, তার কথা শুনতে শাহেদের একটু বিরক্ত লাগে নি। কথা বলার সময় উনার চোখ মুখ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দূর্দান্ত। ফ্লাক্সের চা কখন শেষ হয়ে গেছে কে জানে! মন্ত্রমুগ্ধের মতো শাহেদ শুধু তার কথা শুনে গেছে। অবশ্য শাহেদ খুব ভালো শ্রোতা। উনি অযৌক্তিক কোনো কথা বলেন নি। তার প্রতিটা কথায় লজিক ছিল। ট্রেন থেকে নামার আগে শাহেদ বলল, চাচা আপনার কি? চাচা হাসি মুখে বললেন, নামের কি দরকার? মানুষের পরিচয় কর্মে। শাহেদ বললো, তারপরও আপনার নামটা দয়া করে বলুন, প্লীজ। যদিও আমি কারো নাম মনে রাখতে পারি না। তারপরও আপনার নামটা জানতে ইচ্ছা করছে। চাচা বললেন, আমার নাম চাঁদগাজী।
চাঁদগাজীর একটা কথা শাহেদের মাথার মধ্যে বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। উনি বলেন, এই দেশের বেশির ভাগ মানুষ'ই গরীব। সম্পদহীন। আর সম্পদহীনদের জন্য শিক্ষাই সম্পদ। ইয়েস। খুব ভালো কথা বলেছেন। খুব দামী কথা।
(দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



