somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

একজন জেলের গল্প

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শফিক আফ্রিকা গিয়েছে।
আফ্রিকার সুদান। অদ্ভুত একটা দেশ। অদ্ভুর ভাষা। মানুষ গুলোও বড় অদ্ভুর। একদম দরিদ্র দেশ সুদান। সুদানের সমস্ত জনগন কালো। কুচকুচে কালো। শফিক এই দেশে এসেছে দুই বছরের চুক্তিতে। ইচ্ছা করে এদেশে আসেনি। আসতে বাধ্য হয়েছে। ভীষন কষ্টের কাজ তার। সারাটা দিনই কাজ করতে হয়। বিল্ডিং তৈরির কাজ। কোম্পানী জোর করে কাজ করায়। রাতেও বিশ্রাম নেই। রাতের বেলাও কাজ করতে হয়। বেতন খুবই কম। খেয়ে পড়ে বেতনের কিছুই থাকে না। অথচ দেশে থাকতে শফিক নদী আর সমুদ্রে মাছ ধরতো। তার মতো মাছ ধরতে অন্য কোনো জেলেরা পারতো না। বেশ নামডাক ছিলো শফিকের। শফিকের বাবা বেঁচে নেই। বঙ্গপোসাগরে মাছ ধরতে গিয়েই মারা যান। বেঁচে আছেন শুধু মা। শফিকই তার বাপ মায়ের একমাত্র সন্তান। মাছ ধরে বেশ ভালোই যাচ্ছিল শফিকের সময়। কিন্তু ভাগ্যের লিখন, না যায় খন্ডন।

দেশে থাকতে শফিক সুমিকে ভালোবাসতো।
আফ্রিকার সুদান এসে সুমির প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে শফিক সুমিকে ফোন দেয়। ফোনে কথা বলার পর শফিকের অনেক আনন্দ হয়। সেই রাতে খুব আনন্দের ঘুম হয়। বহু কষ্ট করে শফিক সুদানে দুই বছর পার করে। কোম্পানীর সাথে চুক্তি শেষ হয়। শফিক দেশে ফেরার পথে বিরাট বিপদে পড়লো। তখন তাদের গাড়ি যাচ্ছিলো মরুভূমির পাশ দিয়ে। শফিকসহ আরো দুইজন নিজ নিজ দেশে ফিরছিলো। ফেরার পথে সুদানের জঙ্গীরা শফিকদের অপহরন করে। এই সমস্ত জঙ্গীরা খুব বেশি হিংস্র। খুব ভয়ঙ্কর। জঙ্গী গুলো সাথে সাথে শফিকদের গাড়ির ড্রাইভারকে গুলি করে মেরে ফেলল। কমপক্ষে দশটা গুলি করে ড্রাইভারকে। শফিকরা এই দৃশ্য দেখে ভয়ে কাঁপছিলো। শফিকদের বহন করা গাড়িটা মুহুর্তের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। জঙ্গীরা শফিকদের খুব মারলো। শফিকের নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল।

জব্বর নামের এক লোকের মাধ্যমে শফিক সুদান যায়।
জব্বরের কাছ থেকে শফিক অনেক টাকা লোন নেয়। পরপর দুইবার বঙ্গোপসাগরে শফিকের নৌকা ডুবে যায়। নতুন নৌকা এবং ঘর মেরামত করার জন্য শফিক জব্বরের কাছ থেকে টাকা লোন করতে হয়। সেই টাকা শফিক যথাসময়ে পরিশোধ করতে পারেনি। তখন জব্বর বলল, যদি তুমি সুদান যাও। তাহলে তোমার টাকা মাফ করে দেওয়া হবে। মাত্র দুই বছরের জন্য। অনেক কষ্টে দুই বছর পার করে দেশে ফেরার পথে শফিক জঙ্গীদের হাতে ধরা পড়ে। জঙ্গীরা শফিকদের ধরে একটা গর্তের ভেতর ফেলে দিলো। বিশাল গর্ত। উপর থেকে কেউ দড়ি না ফেললে উপরে আসা সম্ভব না। টানা তিনদিন শফিকরা গর্তে বন্ধী। তাদের কোনো খাবার বা পানি দেওয়া হয়নি। জঙ্গীরা চায় শফিক তার কোম্পানীকে ফোন করে বলবে, তাদের ধরা হয়েছে। কোম্পানী বিশ লাখ টাকা দিলে তারা মুক্তি পাবে। সামান্য শফিককে নিয়ে কোম্পানীর কোনো মাথা ব্যাথা নেই।

চতুর্থ দিনে শফিকদের গর্ত থেকে তোলা হলো।
শফিকের সাথে দুইজনকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। গুলি করার আগে জঙ্গীরা বারবার চিৎকার করে বলছিলো i want money, i want money। এই জঙ্গী দলের লোকদের বয়স বেশী নয়। পনের থেকে পঁচিশ এর মধ্যে সবার বয়স। এদের দলে বেশ কয়েকটা মেয়েও আছে। জঙ্গী দলের সবাই পিস্তল চালাতে জানে। শফিকের কোম্পানী জঙ্গীদের কোনো টাকা দেয় নাই। দরিদ্র কোম্পানী টাকা কি দেবে! কোম্পানী ব্যাংকের কাছে অনেক ঋণ। জঙ্গীদের বিশ্বাস দেরী হলেও কোম্পানী টাকা দিবে। যাই হোক, জঙ্গীরা প্রতিদিন রাতে নাচ গানের আসর বসায়। মূরগী পুড়িয়ে খায়। শফিককে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। তাকে আজ দশ দিন ধরে কিছু খেতে দেওয়া হয়নি। টাকা না দিলে তাকে কিছু খেতে দেওয়া হবে না এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জঙ্গী দলের লিডার। সামান্য একটা ঘটনায় মানুষের জীবন পুরো বদলে যায়। কি অদ্ভুত!

শফিকের শরীরে কোনো শক্তি নেই।
সে উঠে দাড়াতে পর্যন্ত পারে না। দেশে ফিরতে পারলে এতদিনে সে সুমিকে বিয়ে করে ফেলতো। সুমি তাকে মজার সব রান্না করে খাওয়াবে। তার সাথে সুমির যখন শেষবার ফোনে কথা হয়েছে। তখন শফিক বলেছে দেশে ফিরেই সুমিকে বিয়ে করবে। এদিকে শফিকের কোম্পানী সুমিকে ফোন করে জানিয়েছে শফিক জঙ্গীদের হাতে ধরা পরেছে। তারা পুলিশকে জানিয়েছে। কোম্পানীর বিশ্বাস পুলিশ শফিককে উদ্বার করতে সক্ষম হবে। শফিকের ঘটনা জেনে সুমি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সারা দিনরাত শুধু কেঁদেই চলেছে। সুমির সাথে সাথে কাঁদছে শফিকের বৃদ্ধা মা। শফিক যে কাঁদবে, তার সেই শক্তিটুকুও নেই। মনে মনে শফিক সারাক্ষণ সুমির সাথে কথা বলে। সুমির সাথে কথা বললে তার ক্ষুধাবোধ হয় না। শফিক বিশ্বাস করে সে কোনো না কোনো ভাবে এখান থেকে ছাড়া পাবে। নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে। তারপর সুমিকে বিয়ে করে আনন্দময় জীবন যাপন করতে পারবে। মানুষ যতক্ষন পর্যন্ত নিঃশ্বাস নেয় ততক্ষন পর্যন্ত তার আশা থাকে।

শফিকের কোম্পানী টাকা না দেওয়ার কারনে-
একদিন জঙ্গীরা শফিককে খুব মারে। বন্ধুকের ডাট দিয়ে মুখের মধ্যে মেরে-মেরে নাক মুখ ভেঙ্গে দেয়। হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে দেয়। মার খেয়ে শফিক মৃত্যুর খুব কাছে চলে যায়। তখন শফিক সিদ্ধান্ত নেয় এখান থেকে সে পালাবে। তাকে পালাতে হবেই। জঙ্গীদের চোখে ধুলো দিয়ে একরাতে শফিক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সকালে উঠে জঙ্গিরা দেখে শফিক নেই। জঙ্গীরা তাতে মোটেও বিচলিত হয় না। তারা বুঝে গেছে শফিক দীর্ঘদিন ধরে না খাওয়া, মার খেয়ে খেয়ে তার মরার অবস্থা। এই শরীর নিয়ে শফিক বেশি দূর যেতে পারবে না। তাছাড়া চারিদিকে মরুভূমি। সে যাবে কোথায়! জঙ্গীরা শফিককে খুঁজতে বের হয়ে যায়। বিশাল মরুভূমি এলাকা। মাইলের পর মাইল মরুভূমি। শফিক কোথায় যাবে? কয় মাইল হাঁটবে? মরুভূমি কোথায় শেষ হয়েছে শফিকের জানা নেই। টানা চার পাঁচ ঘন্টা হেঁটে শফিক ক্লান্ত। বিধ্বস্ত। তারপক্ষে আর সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যে কোনো সময় নিঃশ্বাসটুকু বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শফিক মনে মনে প্রভুর উদ্দ্যেশে বলল, মা আর সুমিকে দেখে রেখো।

শফিক বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামলো।
পানি খাওয়ার জন্য সে অস্থির হয়ে আছে। খাবারের দরকার নেই। শুধু পানি হলেই চলবে। হঠাত তখন দু'টা চিতা বাঘ শফিকের সামনে এসে হাজির। চারিদিকে ধু ধু মরুভূমি। শফিক কোথায় যাবে? শফিক অজ্ঞান হয়ে গেল। অজ্ঞান হয়ে গেলেও তার অবচেতন মন সুমিকে দেখাচ্ছে। সুমি তাকে বুকে টেনে ধরেছে। বড় শান্তি পাচ্ছে শফিক। চিতা বাঘ শফিককে শুঁকে চলে গেল। মহান প্রভুর লীলাখেলা বুঝা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। শফিকের যখন জ্ঞান ফিরলো। চোখ মেলে তাকাতেই একজন জঙ্গী শফিকের সামনে। তার হাতে পিস্তল। জঙ্গী গুলি করার আগেই শফিক জঙ্গীর উপর হামলে পড়লো। জঙ্গীর মুখে পরপর চারটা ঘুসি বসালো। ঘুসি খেয়ে জঙ্গী অজ্ঞান। শফিক কিছু দূর গিয়েই অবাক। মরুভূমির শেষ মাথায় সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। বিশাল সমদ্র! সমুদ্র তার বড় আপন! শফিক ঝপাস করে সমুদ্রে লাফ দিলো। বহুদিন পর পানির স্পর্শ পেল শফিক। পানির চেয়ে শান্তি দুনিয়াতে আর কিচ্ছুতে নেই। মহান প্রভুর ইচ্ছায় শফিক তার মা এবং সুমির কাছে ফিরে যেতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:২১
১৬টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×