
সরস্বতী হলেন জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার দেবী। দূর্গার চেয়ে সরস্বতীকে আমার বেশি সুন্দর মনে হয়। বৈদিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সরস্বতী হিন্দুধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবী। হিন্দু ধর্মের লোকেরা মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা করে। এই দিন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের হাতেখড়ি হয়।
সরস্বতীর বাহন হাঁস। কারণ সরস্বতী ব্রহ্মবিদ্যা। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই হাঁসের সমান গতি। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। তাঁর এক হাতে বীণা অন্য হাতে পুস্তক। বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, বৃহস্পতি পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী।
আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন- প্রখর জ্ঞানকোষ আইস্টাইন সরস্বতীর পূজা না করেও মেধা-মননে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতমদের একজন হয়ে প্রমান করেছিলেন বিদ্যার্জনে সরস্বতীর ভূমিকা শূন্য।
বিদ্যার দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সনাতন ধর্মালম্বীদের ঘরে ঘরে। শাস্ত্র অনুসারে, সাদা রাজহাঁসে চড়ে বীণা হাতে পৃথিবীতে আসেন দেবী সরস্বতী। হিন্দুদের দেবী হয়েও বৌদ্ধ বা জৈনদের কাছ থেকেও পূজা পেয়েছেন সরস্বতী। অনেক বৌদ্ধবিহারেও সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া যায়।
সিন্ধু সভ্যতাও সরস্বতীর জলেই পুষ্ট হয়েছিল। আজ যে যমুনাকে আমরা দেখি, তা এককালে সরস্বতীরই উপনদী ছিল। ব্রহ্মা স্বয়ং এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে। বিপুলা জলরাশির নদী ছাড়া যে সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না তা সহজেই অনুমেয়। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। পূজার জন্য দেবী সরস্বতীর মূর্তি শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে থাকে যা পবিত্রতার নিদর্শন।
সরস্বতী পূজার দিন লেখাপড়া করা একেবারেই নিষেধ থাকে। মানুষের ভেতরের পশুকে নিবৃত্ত করে জ্ঞান দান করেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী। সরস্বতী পূজা করতে অনেক কিছু লাগে। যেমন- পলাশ ফুল, কুল(বইড়), প্রদীপ ৫-৭টি, ডাব ১টি, ধুপচি ১টি, পাখা ১টি, আলতা, তিল, হরতকী, পান, সুপারি, ঘি, মধু, চিনি, দুধ, দই, বাতাসা, ফল-মূল, কলা ৩ ছুরি, গামছা ১টি, শাড়ী ১টি, সিঁন্দুর, পঞ্চশস্য, চন্দন, খাতা ও কলম, ধুপ ও কর্পুর, যাতা ও যাতি, চিড়া, ভোগের দ্রব্য, পাটকাঠি ইত্যাদি। শুধু হিন্দু ধর্মেই নয়, তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মেও দেবী সরস্বতীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাজস্থানের মরুভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়ে ভবানীপুরে দৃশ্য হয়, আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়ে বরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়। গঙ্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী ছিলেন নারায়ণের তিন পত্নী। একবার গঙ্গা ও নারায়ণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলে, তিন দেবীর মধ্যে তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। এই বিবাদের পরিণামে একে অপরকে অভিশাপ দেন। গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী নদীতে পরিণত হন। পরে নারায়ণ বিধান দেন যে, সরস্বতী এক অংশে নদী, এক অংশে ব্রহ্মার পত্নী ও এক অংশে তাঁর সঙ্গিনী হবেন এবং কলিযুগের পাঁচ হাজার বছর অতিক্রান্ত হলে সরস্বতী সহ তিন দেবীরই শাপমোচন হবে।
মা সরস্বতী আমাদের আশীর্বাদ করুন- জীবনকে শুভ্র ও পবিত্র রাখুন। সরস্বতী দেবীর আরাধনা অশিক্ষা-কুশিক্ষা-প্রশ্নপত্র ফাঁসের কলঙ্ক থেকে রেহাই দিক, আমাদেরকে বিনয়ী করুক, জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনের পথে আমাদের এগিয়ে যাওয়াকে সার্থক করুক, এই প্রার্থনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






