
আজ ফেসবুক আর ব্লগে বাবাকে নিয়ে লেখা দিয়ে ভরে গেছে।
সবাই ইনিয়ে বিনিয়ে নানান কথা লিখছেন। তাদের বাবা হিরো। সুপারম্যান। তাদের বাবা সাধু, সৎ এবং মহৎ। এক কথায় তাদের বাপের তুলনা হয় না। কেউ কেউ বাপের গলা জড়িয়ে ধরে ছবি তুলে দিচ্ছেন ফেসবুকে। একজনকেও দেখলাম নিজের বাপের একটা দোষের কথা লিখতে। আমি জানি প্রতিটা ছেলেমেয়েই তাদের বাপকে সুপারম্যান ভাবতে চায়। আসলেই কি সব বাবারা সুপারম্যান হতে পারেন? সমাজে কি দুষ্ট বাপ নেই?
ফেসবুকে দেখলাম- এক মেয়ে তার বাপকে নিয়ে আহাজারি শুরু করেছে। তার বাপ দুনিয়ার সেরা বাপ। তার বাপের তুলনা হয়। অথচ এই মেয়ের বাপকে আমি চিনি। সে তিনটা বিয়ে করেছে। সারারাত জুয়া খেলে। মদ খায়। এমনকি মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে তার বাপের নানান কুকীর্তির কথা আমাকে বলেছে। আমি মেয়েটা শান্ত্বনা দিয়েছি। একবার তার বাপ জুয়া খেলতে গিয়ে নিজের কন্যাকে বন্ধক রাখতে পর্যন্ত চেয়েছে। মেয়েটা পালিয়ে গিয়ে বেঁচে যায়। অথচ সেই মেয়ে আজ নাকি কান্না কাঁদছে। আমাদের দেশে লোক দেখানো ব্যাপার খুব বেশি হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।
যাই হোক, আমি আমার বাপের কথা কথা বলি।
আমি আমার বাপের উপরেও রাগ। মায়ের উপরেও রাগ। এই দুষ্টলোকে ভরা পৃথিবীতে তারা আমাকে আনলো কেন। এখন দুষ্ট লোকেদের ভিড়ে আমার দম বন্ধ হয়ে মরার অবস্থা হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমাকে ফাইট করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। কি কষ্ট! কি যন্ত্রনা! তারা যদি আমাকে দুনিয়াতে না আনতেন তাহলে আমার কোনো চিন্তা ছিলো না। এখন আমার বাপ শিবঠাকুর হয়ে ধ্যানে বসে থাকেন। মা সারাদিন ইউটিউবে সিনেমা দেখেন। নাচ গান দেখেন। আর আমি আমার ঘর সংসার নিয়ে জীবন যুদ্ধে খাবি খাচ্ছি। আমার বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ তারা বিনদাস আছেন। তাদের কোনো চিন্তা ভাবনা নাই। বাপ মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে খোজ খবর নেয়। আমি বলি- খুব ভালো আছি আব্বা। কোনো সমস্যা নাই। তুমি ভালো থাকো। কোনো চিন্তা করো না। তুমি পত্রিকা পড়ো আর টিভিতে খবর দেখো। আমাকে নিয়ে চিন্তা করে নিজের প্রেসার বাড়িও না। মার দিন কাটছে সবচেয়ে আনন্দে তার কোনো কাম কাজ নাই। রান্নাও করতে হয় না। বুয়া রেখেছে দুইটা। একজন সকালে আসে, একজন বিকালে আসে। আমি থাকি ছয় তলায়, মা থাকে নিচ তলায়। যখনই মার কাছে যাই, দেখি উনি মুভি দেখছেন।
আমার বাপ সারা জীবন করেছে জমিদারী।
এমন কি উনি তার ঘরের পড়ার লুঙ্গীটা পর্যন্ত দোকান থেকে আয়রন করিয়ে আনেন। এখন যে সে বুড়ো হয়ে গেছে, কোনো কামকাজ করেন না- তবুও সে লুঙ্গি দোকান থেকে আয়রন করিয়ে আনেন। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আব্বা সারা বছর কাপড় বানান। শীতের সময় বানাবেন। গরমের সময় বানাবেন। বর্ষা কালেও কাপড় বানাবেন। আবার এক বছরের জামাকাপড় আরেক বছরে পড়তেন না। সারা জীবন গাড়ি ছাড়া চলাচল করেন নি আব্বা। ঢাকার বাইরে কোনোদিন বাসে করে যান নি। এখনও কোথাও গেলে বাসে যাবেন না। গাড়ি ছাড়া। আমি ফেসবুকে ছবিতে দেখলাম- সেদিন আব্বা কোনো এক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। ব্যানারে লেখা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক। আমি জানতাম না আমার আব্বা যে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক। ছোটবেলা আব্বা কখনও আমার হাতে দুই শ' টাকার বেশি দিতেন না। এক হাজার টাকা চাইলেও দিত দুইশ' টাকা। পাঁচ শ' টাকা চাইলেও দিত দুই শ' টাকা। অথচ উনি হাজার হাজার টাকা মদ খেয়ে উড়িয়ে দিতেন। দামী মদ ছাড়া কখনও খেতেন না। অবশ্য আব্বা সারা বছর মদ খেত না। বিশেষ বিশেষ দিনে। মা আর আব্বা যখন মিল থাকতো দুইজন কি খাতির! সারারাত জেগে ভিসিআরে সিনেমা দেখতো। আবার যখন তাদের ঝগড়া হতো দুইজন দুইজনের দিকে ফিরেও তাকাতো না।
আমি মনে করি- আমার আব্বা একজন ব্যর্থ মানুষ।
সারা জীবন উনি শুধু ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমার জন্মের সময় উনার একটা নিজের লঞ্চ ছিলো। পদ্মা নদীতে সেই লঞ্চ চলতো। লঞ্চ বিক্রি করে দিলেন। এরপর কিছুদিন চাকরি করলেন। আমার আব্বা এম এ পাস। তার হাতের লেখা অনেক সুন্দর। যাই হোক, চাকরী ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন। গার্মেন্টস দিলেন। সেই গার্মেন্টস দুই বছর পর্যন্ত টিকে ছিলো। ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক ঋণ করলেন। গ্রামের জমিজমা সব বিক্রি করে ঋণ শোধ করলেন। আমার দাদার অনেক জমিজমা ছিলো। এমন কি কলকাতাতেও দাদার দুইটা বাড়ি ছিলো।
আব্বা মাছের ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। সেই ব্যবসাতেও ধরা খেয়েছেন। ব্যবসায় লস করে-করে দাদার সমস্ত জমি বিক্রি করে ফেললেন। এরপর আব্বা শুরু করলেন গাড়ির ব্যবসা। সব মিলিয়ে তার বারোটা গাড়ি ছিলো। গাড়ির ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিলো। তখন রাজনীতি করতে গিয়ে নানান রকম মামলায় জড়িয়ে পড়লেন। মামলা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে একে একে সব ক'টা গাড়ি বিক্রি করতে হলো। যে ব্যবসাতেই আব্বা হাত দিয়েছেন ধরা খেয়েছেন। আমার দাদার মতোন আমার আব্বারও যদি অনেক জমিজমা থাকতো তাহলে আমার কোনো চিন্তা ছিলো না। আব্বা ভাগ্যবান দাদার কাছ থেকে অনেক কিছুই পেয়েছে। আমার ভাগ্য ভালো না। আমি আব্বার কাছ থেকে কিছুই পেলান না। মানুষ বাপ দাদার কাছ থেকে কত কিছু পায়। আমি শালা এক কাঠা জমিও পেলাম না। বংশ থেকে শুধু পেয়েছি রাগ। রাগ ছাড়া আমার আর কিছুই নেই।
আমার বাপের একটা গুনের কথা বলি।
আব্বার মনটা একেবারে নরম ছিলো। কোনো দিন আমাকে একটা চড় থাপ্পড় মারে নি। বরং রাতে বাসায় ফিরে জিজ্ঞেস করতো- আমি খেয়েছি কিনা। কারন বাসায় ছোট মাছ রান্না করলে আমি খেতাম না। যদি রাতে না খেতাম তাহলে আব্বা যত রাতেই বাসায় ফিরুক আমাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যেত। আমি মোরগ পোলাউ খেতাম। আমার মাথার চুল বড় হলেই আব্বা জোর করে ধরে সেলুনে নিয়ে যেত। একবার আমাদের বাসায় একটা চোর ধরা পড়লো। সেই চোরকে আব্বা একটা থাপ্পড়ও দেয় নি। সমস্ত এলাকার মানুষ বলছিলো- চোরটাকে মারুন। আপনি না মারলে আমাদের হাতে দিয়ে দেন। আব্বা সেই চোরটাকে ঘরে বসিয়ে পেট ভরে ভাত খাওয়ালো। কিছু জামা কাপর আর নগদ দুই হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করলো চোরকে। আব্বা কখনও ভিক্ষুককে ৫ বা ১০ টাকা দিত না। এক শ' টাকা দিয়ে দিত। আমি বলতাম এক শ' টাকা কেন দাও? দশ টাকা দিলেই তো হতো। আব্বা বলতো- দশ টাকায় কি হয়? আব্বার সাথে অনেকদিন দেখা হয় না। প্রায় এক বছর হয়ে এলো। অনেক অসুস্থ আব্বা। লেখা এখানেই শেষ করলাম। কারন আব্বাকে নিয়ে লেখা শুরু করলে ১০০ পর্ব লিখলেও শেষ হবে না।
(ছবিঃ আমার তোলা।)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০২০ রাত ৯:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


