
মেয়েটার নাম নীলা।
বয়স হবে সতেরো- আঠারো। মেয়ে তো নয় যেন সাক্ষাৎ আগুন। শাহেদ এত সুন্দর মেয়ে খুব কম দেখেছে। নীলা যখন গোছল শেষ করে রোজ বারান্দায় আসে চুল শুকাতে তখন শাহেদ জামাল মুগ্ধ হয়ে নীলাকে দেখে। শ্রভ্র সাদা জামা পরা, গলার কাছে লাল একটা ওড়না। মাথার ভেজা চুল গুলো দিয়ে কোমরের কাছে ভিজে গেছে। শাহেদের সবচেয়ে সুন্দর লাগলো বক্ষ। কত সুন্দর ভরাট। মসৃন আর কোমল। ইচ্ছা হয় ওই বক্ষে মাথা রাখতে। ইচ্ছে মতোন মুখ ঘষতে। বক্ষেই যেন পরম শান্তি। এজন্যই হয়তো মেয়েরা দু'হাত বাড়িয়ে পরম মমতা আর ভালোবাসায় বুকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। শাহেদের চোখ বারবার নীলার বক্ষের দিকে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে দুটা সদ্য ফুল ফুটে আছে যেন। তখন শাহেদ জামালের অল্প বয়স। মাত্র কলেজ শেষ করেছে। প্রতিদিন শাহেদ জামাল নীলাকে বেলকনিতে দেখতো আর মুগ্ধ হতো।
মেয়েরা পুরুষের মধ্যে জুটিলতা কুটিলতা পছন্দ করে না।
হয়তো তারাই সবচেয়ে বেশি কুটিল এবং জটিল বলেই। নীলা শাহেদ জামালের মধ্যে সরলতা দেখতে পেয়েছিলো। মেয়েরা সরলতা ভীষন পছন্দ করে। আর শাহেদ যেন সরলতার ডিব্বা। বাস্তব জীবনেও শাহেদ জামাল সহজ সরল জীবন যাপন করে। নীলা আর শাহেদ থাকতো পাশাপাশি বাসায়। তাই রোজ দেখা হতো। ছাদে গেলে আরো পরিস্কার দেখা যেত। নীলাদের বাসার ছাদ, শাহেদদের বাসার ছাদ থেকে দূরত্ব মাত্র তিন হাত। একদিন বিকেলে নীলা বলল, আমাকে দেখতে আপনার খুব ভালো লাগে? হাবার মতো হা করে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়ে থাকেন আপনি আর লজ্জা করে আমার। সেদিনই প্রথম কথা। শাহেদের বলতে ইচ্ছা করলো নীলা তুমি আমার সামনে রোজ এক ঘন্টা করে করে বসে থাকবে। আমি শুধু তোমাকে দেখবো। মন ভরে দেখবো। তুমি ভয় পেও না আমি তোমাকে স্পর্শ করবো না। শুধু আমি দেখবো। তুমি দেবী স্বরসতীর চেয়ে বেশি সুন্দর।
শাহেদ আজ সারাদিন নীলার কথা ভাববে।
তাই সে সকাল সকাল রমনা পার্কে চলে এসেছে। কেউ বিরক্ত করার নাই। বাসায় থাকলে শান্তিতে ভাবা যায় না। সবাই যেন 'কেমন' 'কেমন' করে তাকায়। বেকার থাকার যন্ত্রনা কেউ বুঝে না। পরিবারের সদস্যরা বেকারকে সহানুভূতি না দেখিয়ে বরং কেমন করে যেন তাকায়। এই তাকানো টা বড্ড কষ্ট দেয়। অপমান অপমান লাগে। বন্ধুবান্ধনরাও এড়িয়ে যায়। বেকাররা ঘরে বাইরে সব জাগায় অবহেলিত। কেউ বুঝে না, কেউ ইচ্ছা করে বেকার থাক না। থাকতে চায় না। যাই হোক, তাই শাহেদ জামালের জন্য রমনা পার্কই ভালো। একদম সন্ধ্যা পর্যন্ত নিশ্চিন্ত থাকা যায়। ভিক্ষুক, হকার সবাই শাহেদ জামালকে চিনে। কেউ বিরক্ত করে না। এমন কি সিকিউরিটি গার্ড গুলো পর্যন্ত শাহেদ জামালকে চা-টা খাওয়ায়। মাঝে মাঝে গল্প করতে আসে। পরিচিত মানুষের চেয়ে অপরিচিত মানুষেরা ভালো। এজন্য কথায় আছে, পরের চেয়ে জঙ্গল ভালো।
শাহেদ জামাল ভালো মন্দ খেতে খুব পছন্দ করে।
তার হাতে টাকা থাকলেই সে বড় বড় রেস্টুরেন্টে গিয়ে তার প্রিয় খাবার গুলো খায়। নীলাও তাকে নিয়ে মাঝে মাঝে পুরান ঢাকায় যায়। বিরানী খাওয়ায়। কেএফসি'তে নিয়ে গিয়ে চিকেন ফ্রাই, বার্গার খাওয়ায়। শাহেদ বেশ আরাম করে খায়। কেউ খাওয়াতে চাইলে শাহেদ কখনও মানা করে না। সে আগ্রহ নিয়ে খায়। প্রিয় খাবার গুলো খেলে শাহেদের মন ভালো হয়ে যায়। এই তো গত মাসে শাহেদের মন খারাপ ছিলো। নীলা তাকে জেনিভা ক্যাম্পের কাছে নিয়ে গিয়ে লুচি আর কাবাব খাওয়ালো। শাহেদের সবচেয়ে ভালো লাগে নীলা বিদায় নেওয়ার আগে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট শাহেদকে দেয়। সিগারেট শুধু সিগারেট নয়, যেন এক টুকরো আনন্দ। নীলার দেওয়া সিগারেট শাহেদ জামাল যখন মধ্যরাত্রে ধরায়, তার বড় ভালো লাগে। অবশ্য নীলা বলে দিয়েছে, বিয়ের পর শাহেদ আর সিগারেট খেতে পারবে না। নীলা যাওয়ার আগে শাহেদ নীলাকে অবাক করে দিয়ে পকেট থেকে বেলী ফুলের একটা ছোট মালা বের করে নীলার হাতে দেয়। নীলা বেলী ফুল গুলোর গন্ধ শুঁকে তার গালে ছোঁয়ায়। তখন আনন্দে নীলার চোখে পানি এসে যায়।
সন্ধ্যা ঘনায়মান।
আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। বেশ ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। যে কোনো সময় ঝুম ঝুম বৃষ্টি নামবে। বিজলি চমকাচ্ছে বেশ। শাহেদের মনে পড়লো এরকমই একটা দিনে শাহেদ নীলাকে প্রথম চুমু খেয়ে ছিলো। জীবনের প্রথম চুম্বন। সেদিন শাহেদ সাহস করে নীলাদের বাড়ির ছাদে গিয়েছিলো। নীলা ছাদে শুকাতে দেওয়া কাপড় আনতে গিয়েছিলো। নীলা বলল, তাড়াতাড়ি বাসায় যাও। বৃষ্টি নামবে। শাহেদ সীমাহীন সাহস সঞ্চয় করে বলল, নীলা আমাকে একটা চুমু খেতে দিবে। খুব ইচ্ছা করছে। শুধু একটা চুমু। আর কিচ্ছু না। প্লীজ। স্বচ্ছ পবিত্র চুমু। এই চুমু হবে ভালোবাসার চুমু। নীলার অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো। হাতে কাপড়, বাতাসে তার চুল উড়ছিলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিলো খুব। নীলাকে বড় পবিত্র দেখাচ্ছিলো। শাহেদ নীলার ঠোটে ঠোঁট রাখলো। অপার্থিব শিহরণে তারা আবদ্ধ হলো। কতক্ষন ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো, কে জানে! হঠাত বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। নীলা শাহেদকে ধাক্কা দিয়ে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো।
শাহেদ রমনা পার্ক থেকে বের হলো।
বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। শাহবাগ আসার আগেই শাহেদ পুরোপুরি ভিজে গেলো। খুব চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে তার। অথচ পকেট পুরো ফাঁকা। অথচ এক কাপ চায়ের জন্য বুক ফেটে যাচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়া যাবে না। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। শাহেদ চোরের মতো বাসা থেকে বের হয়, চোরের মতো বাসায় ঢুকে। এখন নীলার বাসায় চলে গেলে কেমন হয়! নীলার বাবা নিশ্চয়ই ভ্রু বাঁকা করে শাহেদের দিকে তাকাবেন। অবশ্য নীলা ঠিকই শাহেদকে বাঁকা ভ্রু থেকে বাচিয়ে নিবে। না খেয়ে নীলা তাকে ফিরতে দিবে না। ঘরে যাই-ই থাক সাথে গরম গরম ডিম ভাজা দিবেই। শাহেদের ধারনা এই শহরে নীলার মতো করে কেউ ডিম ভাজতে পারে না। শুধু ডিম ভাজা দিয়েই দুই প্লেট ভাত খেয়ে ফেলা যায়। শাহেদ ফেরার সময় নীলা গেট পর্যন্ত আসবে। নীলার চোখ ভিজে উঠবে। বারবার এরকমই হয়। শাহেদ নীলার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলবে-
জানি আমি তুমি রবে-আমার হবে ক্ষয়
পদ্মপাতা একটি শুধু জলের বিন্দু নয়।
এই আছে, নেই-এই আছে নেই-জীবন চঞ্চল;
তা তাকাতেই ফুরিয়ে যায় রে পদ্মপাতার জল
বুঝেছি আমি তোমায় ভালোবেসে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




