
১। ব্যথার দান কাজী নজরুল ইসলাম।
এই বইটা এতোটাই আমাকে ছুঁয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছিল আমার চিন্তাধারার সাথে বেশিরভাগ মানুষেরই মিল হয় না। অথচ নজরুল সেই কথা গুলোই তুলে ধরেছেন। প্রকৃত ভালবাসা কারে বলে তা যেন নতুন করে উপলব্ধি করেছিলাম। ‘ব্যথার দান’ দারা ও বেদৌরার প্রেম ও অতৃপ্তির গল্প। নজরুল দেখিয়েছেন প্রেমিকের সঙ্কট, যাতনা, অতৃপ্তির হাহাকার। ভালবাসার অনুভব দূর প্রবাসে সুতীব্র রূপ ধারণ করে। প্রেমের ভুলের জন্য হাহাকার করে ওঠে। সৈনিকের চোখ দিয়ে দেখা ভিন্নতর এক বিশ্ব। নিয়ত জীবন-মৃত্যুর সন্নিধানে প্রবাস জীবনের একদিকে থাকে প্রেম অন্যদিকে থাকে দেশমাতৃকার প্রতি- ভালবাসা।
লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তার ‘মানসী’কে। নজরুলের উপন্যাসের অধিকাংশ বাক্য ছোট ছোট- অনেকটা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মতো। নজরুলের বাঁধন-হারা, মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা এই উপন্যাসও অনেক সুন্দর। তার উপন্যাসে সমাজ সচেতনতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দরদ, নরনারীর প্রেমের প্রতি দরদি মনোভাব আমাকে মুগ্ধ করে।
২। শেষের কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ভালবাসলেই যে পেতে হবে এমন কোন কথা নেই। এটা একদম চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে- এই বই আপনি বার বার পড়লে, একেকবার একেকভাবে উপলব্ধি করবেন। মনস্তাত্ত্বিক রোম্যান্টিক উপন্যাস। উপন্যাসটির মূল চরিত্র অমিত ও লাবণ্য এবং এদের প্রেম পরিণত হয় একটি চতুর্ভূজ প্রেমের গল্পে।
অমিতর একটা উক্তি উল্লেখ করার মতো, "কেতকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল। প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।" উক্তিটির মধ্যে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সন্দেহ জাগে যে সে ভালোবাসে নি- না কেতকীকে, না লাবণ্যকে, না অন্য কোনো মেয়েকে। এই উপন্যাসটা প্রতি বছর আমি একবার করে পড়ি। আর মুগ্ধ হই।
৩। দূরবীন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
অসাধারণ একটা উপন্যাস। উপন্যাসে তিনটি প্রজন্মের জীবনের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসের শুরু ১৯২৯ সালের এক শীতকালীন ভোরে হেমকান্তের হাত থেকে কুয়োর বালতি পড়ে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে।
অতীতের আতসকাঁচ দিয়ে দূরবীনের মধ্যে অতীতের লোকগুলোকে যেমন বড় কাছের করে পাই, দূরবীন ঘোরালে আজকের মানুষ গুলোকেও বড় দূরের মনে হয়।
দূর্দান্ত এক উপন্যাস। সকলের পড়া উচিত।
৪। আরণ্যক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়।
শব্দ চয়ন শিখতে চান? চান, প্রকৃতির বর্ণনা কী করে করতে হয়? কী করে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে হয়? তাহলেই এই বই। এই উপন্যাসে লেখক প্রকৃতির নিবিড় রহস্যময়তা, মায়ালোক আর আদিমতায় খুঁজে পেয়েছেন জীবনের গাঢ়তম রূপ; দেখেছেন মানুষের বিচিত্র প্রবণতা আর উপলব্ধির নব নব রূপায়ন।
আরণ্যক বইটিকে বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য-সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। মানুষের মতোই প্রকৃতিও রহস্যময় এবং বৈচিত্র্যময়। এই রহস্যময়ী মানুষ ও প্রকৃতিকে পৃথক স্বাধীন মাত্রা দিয়েছেন বিভূতিভূষণ। উপন্যাসে লেখক যে প্রান্তিক মানুষগুলোর কথা বলেছেন-
(মটুকনাথ, মঞ্চি, ভানুমতী, রাজু পাড়ে, ধাতুরিয়া) এরা গয়া জেলা জানে, ভারতবর্ষ জানে না। তাদের চৈতন্য মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শহরের শ্রেণীর জাতীয়বাদ থেকে ভিন্ন। এখানে বৈপ্লবিক মধ্যশ্রেণীর সূচনা ও বিকাশ ঘটে নি।
৫। ন হন্যতে মৈত্রেয়ী দেবী।
এটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। 'ন হন্যতে' যার অর্থ- 'It does not die' বা যার 'ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই'! ১৯৩০ সালে ঘটে যাওয়া একটি কাহিনীর স্মৃতিচারণ এই উপন্যাস। বইটির শব্দ চয়ন অসাধারণ। লেখিকার গভীর জীবনবোধের পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসটি পড়ে। জীবনের শেষ লগ্নে এসে পুরাতন প্রিয়তম মানুষকে সামনে রেখে সেই চির সুন্দর প্রেমের উদ্ভাস ঘটেছে উপন্যাসে। উপলব্ধির কোন স্তরে পৌঁছিলে প্রেম শুধু শরীর সর্বস্ব থাকে না, তা হয় অসীম। চঞ্চল, জেদী, তরুণী মৈত্রেয়ী কী করে হতাশায় ডুবে ভালোবাসার মানুষটির অভাবে ধীরে ধীরে ধৈর্যশীল, শান্ত আর পরিণত হয়ে উঠেন, তারই সন্ধান মিলবে এই বইয়ে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ১১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




