
বিয়েটা হয়ে গেছে।
যে বিয়ে নিয়ে আমি, সুরভি, আর ভাবী খুব লাফাচ্ছিলাম। একমাস নানান ঘটনা চলছিলো। শুধু দেখা সাক্ষাত, আর আলাপ আলোচনা। একবার ছেলের মামা আসেন মেয়ের বাসায়। আবার মেয়ের চাচা যায় ছেলের বাসায়। ঘুরে ঘুরে এরকমই চলছিলো বারবার। গতকাল রাতে এসব দেখা সাক্ষাতের অবসান ঘটেছে। ফাইনালি গতকাল কাবিন হয়ে গেছে। মেয়ের বাসায় ছেলে পক্ষের সমস্ত আত্মীয় স্বজন এসেছে। তখন আমি বলেই ফেললাম, একমাস ধরে শুধু দেখা স্বাক্ষাত আর কথাবার্তা। আর কত! দুই পক্ষই যখন রাজী। সবচেয়ে বড় কথা ছেলেমেয়ে দুজন দুজনকে পছন্দ করেছে। তাহলে আর দেরী করে লাভ নেই। আসুন আমরা আজই কাবিনটা করে ফেলি। আমার কথার সাথে সবাই একমত হলেন। কাজী ডাকা হলো। এবং বিয়ে হয়ে গেলো রাত বারোটায়। ঝামেলা বিহীন সুন্দর বিয়ে। এই বিয়েতে আমি লাফানোর কারন হলো- ছেলে মেয়ে দুজনই ভদ্র, ভালো শিক্ষিত এবং আধুনিক।
গতকাল রাতে বাসায় ফিরলাম দুই টায়।
এদিকে সুরভির শরীরটা ভালো নেই। বিয়ে নিয়ে সুরভি আর ভাবীর উত্তেজনার শেষ নাই। গতকাল রাতে বর, মেয়ের বাসায় থেকে গেছে। ছেলে কিছুতেই থাকবে না। অনেক বুঝিয়ে তাকে রাখা হয়েছে। এ মাসের শেষে বিরাট অনুষ্ঠান হবে। দুইটা অনুষ্ঠান হবে। একটা অনুষ্ঠান মেয়েরা করবে, একটা ছেলেরা। গতকাল রাতে অনেক খানাপিনার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। পোলাউ, গরুর মাংস, রোষ্ট,সবজি, ইলিশ মাছ, রুই মাছ ভাজা, চিংড়ি ফ্রাই, কাবাব, বোরহানি, কোক। তারপর পায়েশ, পুডিং, কেক, নানান রকম মিষ্টি আর ফলটল। রাতে আমি আরাম করে খেতে পারি নি। রাত আট টায় এক হোটেলে আমি হালিম আর নান রুটি খেয়েছি। গতকাল তো আর বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো না। আগে জানলে হোটেলে খেতাম না। মেয়ের মা ভালো রান্না করেছেন। অবশ্য তারা প্রচুর খাবার দিয়ে দিয়েছেন। আজ রান্না করতে হবে না সুরভির।
এদিকে আরেক কাহিনী।
রাতে বাসায় ফেরার পর সুরভির বাসা থেকে ফোন। সুরভির বাবার অবস্থা খুব বেশি খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি। বেশ কিছুদিন ধরে সুরভির বাবা অসুস্থ। জ্বর, ঠান্ডা, কিচ্ছু খেতে পারেন না, মেজাজ হয়ে গেছে খিটমিটি। কোনো খাবারে স্বাদ পান না। শরীর প্রচন্ড দুর্বল। করোনা টেস্ট করা হলো। ৭২ ঘন্টা পর জানা গেলো সুরভির বাবার করোনা হয়েছে। অবস্থা তার খুব খারাপ। তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ২৪ ঘন্টা পার হওয়ার আগেই হাসপাতালের বিল হলো এক লাখ টাকা। সারারাত সুরভি ঘুমায় নি। কেঁদেছে। এখন আমি কি করবো? শ্বশুর মশাইকে দেখতে যাবো হাসপাতালে? সুরভিকেই কিভাবে শ্বাস্ত্বনা দিবো? সকালে জানতে পারলাম, সুরভির দুই ভাইয়েরও করোনা হয়েছে। ভয়াবহ অবস্থা। আমার মাথা কাজ করছে না। এদিকে আমারও কোমর ভাঙ্গা অবস্থা। মেরুদন্ড দিন দিন অদৃশ্য ভাবে নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।
সুরভিদের বিল্ডিং এ একজনের করোনা হয়েছিলো।
সে বিষয়টা গোপন রেখেছিলো। সেই করোনা রোগী প্রতিদিন আগের মতোই বিল্ডিং এর সবার সাথে মিশেছে। বিন্ডিং এর নিচে চা খেয়েছে, কেরাম খেলেছে। গল্প করেছে। সবার ঘরে ঘরে গিয়ে গল্প করেছে। নিচতলায় প্রতিদিন গল্প গুজব করেছে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। একসময় এই লোকের ভয়াবহ অবস্থা হয়। হাসপাতালে ভরতি এবং তিনি মারা যান। এরপর সুরভির বাবার করোনা হলো। এখন সে হাসপাতালে। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। সুরভি বাবা মানুষ হিসেবে ভালো। সারা জীবন সৎ এবং সুন্দর জীবন যাপন করেছেন। সময় মতো খাওয়া, সময় মতো ঘুম। চা সিগারেট খান না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। প্রতিমাসে একবার নিজের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এখন নিজের চেম্বারে বসেন। তার স্ত্রী মানে আমার শ্বাশুরি তের বছর আগে মারা গেছেন ক্যান্সারে। এখন আমার করিনীয় কি?
গতকাল ভোরে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়।
মসজিদ থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি কানে আসলো। একটা ছবির কথা মনে পড়ল, ভারত সমাট্র শাজাহানের নামাজ পড়ার ছবি! পরিবারে একটা ছেলে যখন চাকরী না পায়, সেই বেকার ছেলেটা পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষদের কাছেই বারবার উপেক্ষিত হয়। কি অদ্ভুদ ব্যাপার! যাদেরকে সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে বেশি দরকার হয় তারাই উপেক্ষা করে সবচেয়ে বেশি! সংসার নামের জোকটি অবয়ব থেকে সব ভা্লোবাসা আর মমতা শুষে নিয়ে সেখানে ছিটিয়ে দেয় রাশি রাশি গ্লানি আর যাতনা। যখন খারাপ সময় আসে, একটার পর একটা আসতেই থাকে। এই চলতি মাসে ঢাকা শহরে করোনা কিন্তু নিরবে বাড়তে শুরু করেছে। সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যাদু শিল্পী জুয়েল আইচ, নাট্যকর্মী আজিজুল হাকিম, অভিনেতা অপূর্ব থেকে শুরু করে বহু লোক করোনা আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিদিন। অথচ করোনা নিয়ে শহরের মানুষের মধ্যে কোনো সচেতনা নেই।
আমার প্রচণ্ড রাগ হয়-
সেদিন এক শিক্ষিকার সাথে রাস্তায় দেখা। আমি বললাম, আপা আপনার মাস্ক কই? শিক্ষিকা মহিলা বললেন, আমার করোনা হবে না। করোনা হবে ধনীদের। আপা হাসতে হাসতে বললেন, কখনও শুনিছিস বস্তিতে থাকা কারো করোনা হয়েছে? গতকাল বিয়েতে এক মুরব্বী বললেন, করোনা আল্লাহর গজব। বেছে বেছে আল্লাহপাক খারাপ দেশ গুলোতে করোনা দিচ্ছেন, ওদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ভালো দেশ গুলোতে কিন্তু করোনা হয়নি। চায়ের দোকানের শামসু ভাই বিশ্বাসই করেন না করোনা বলে যে একটা ভাইরাস আছে। তিনি বলেন, এগুলো মিডিয়ার সৃষ্টি। বাস্তবে কোনো করোনা ফরোনা নাই। মাদ্রাসার এক হুজুর বললেন, দুষ্টলোকদের বিনাশ করতে আল্লাহপাক করোনা দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। কাজেই ভালো মানুষদের ভয় নেই। আল্লাহ এবার বহু দুষ্টলোক দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিবেন। হে হে...। করোনা কবে থামবে সেই অপেক্ষায় আমি।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




