
১। ভদ্রলোকের নাম রশিদ তালুকদার।
বাড়ি সন্দ্বীপ। তবে তিনি ঢাকা থাকেন। কৃষি ব্যাংকে চাকরি করতেন। অবসর নিয়েছেন তেরো বছর হয়ে গেছে। স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগেই। দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকে। রশিদ তালুকদার বর্তমানে দুই রুমের ছোট্র বাসা নিয়ে একা থাকছেন। পত্রিকা পড়ে সময় কাটান। বুড়ো বয়সে লোকেরা নামাজ কালাম নিয়ে পড়ে থাকেন। কিন্তু ধর্ম কর্মে তার মন নেই। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, 'ধর্ম একটা ফালতু জিনিস'। তার দুই ছেলে নিয়মিত বাবার খোঁজ খবর নেয়। দুই ছেলে আমার চেয়ে বয়সে বড়। সকালে আমি যে হোটেলে মাঝে মাঝে নাস্তা খাই, সেখানেই তার সাথে আমার পরিচয়। ভদ্রলোক আমাকে খুবই পছন্দ করেন। এখন হোটেলে গেলে আমাকে না পেলেই ফোন দেন। নাস্তা না খেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করেন।
রশিক তালুকদার আমাকে সন্দ্বীপ নিয়ে যেতে চান।
তার গ্রামের বাড়ি নাকি অনেক সুন্দর। বিশাল একটা দীঘিও নাকি আছে। সেখানে তিনি আমাকে সাঁতার শেখাবেন। বরশি দিয়ে কিভাবে অতি দ্রুত মাছ ধরতে হয় সেটাও শেখাবেন। বঙ্গোপসাগরের মাছ খাওয়াবেন। রশিদ তালুকদার বলেন, তুমিও বেকার, আমিও বেকার। আমাদের হাতে অনেক সময়। সময়টা কাজে লাগাতে হবে। সময়কে অবহেলা করা যাবে না। সময়কে অপচয় করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না। ক্লিয়ার? রশিদ তালুকদারের বয়স আমার বাবার চেয়ে বেশী। অথচ তিনি আমার সাথে বন্ধুর মতো মিশেন। গল্প করেন। মাঝে মাঝে আমাকে গান গেয়েও শুনান। এর মধ্যে তিনি একবার আমাকে প্রায় জোর করেই তার এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে নিয়ে গেছেন। আগামী সপ্তাহে নাকি গাজীপুর আরেক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যাবেন।
রশিদ তাকুলদারের একটা ভেসপা আছে।
বহু পুরানো। ভট ভট শব্দ হয়। চলন্ত অবস্থায় হঠাত থেমে যায়। তখন ঠেলতে হয়। রশিদ সাহেব বলেন, এই ভেসপা আমার সাথে অনেকদিন ধরে আছে। আমার স্ত্রীও আমার সাথে এত দিন ছিলেন না। রশিদ সাহেব মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে চেয়ে সিগারেট খান। অথচ তিনি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন ত্রিশ বছর আগে। সেদিন তিনি আমাকে নিয়ে হাঁটে গিয়েছেন। ঢাকা শহরেও গ্রাম দেশের মতো হাঁট বসে আমি জানতাম না। মেরাদিয়া প্রতি বুধবার হাঁট বসে। হাঁট দেখে আমি অবাক। একদম গ্রামের মতো হাঁট। একদিন নিয়ে গেলেন নন্দীপাড়া। সেখানে ধান ক্ষেত দেখালেন। ঢাকায় যে ধানক্ষেত আছে আমি জানতাম না। রশিদ সাহেব কোনো এক বিশেষ কারনে আমাকে চমকে দিতে পছন্দ করেন। গত পরশু ঘুম থেকে ঢেকে তুলে আমাকে নিয়ে গেলেন রমনা পার্কে। সকালে নাকি রমনা পার্কের বাতাস গায়ে মাখা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
রশিদ সাহেব এখন বারডেম হাসপাতালে।
গতকাল রাতে তিনি আমাকে ফোন করে অনুরোধ করলেন তাকে যেন আমি অবশ্যই একবার দেখতে যাই। হ্যা, আজ আমি তাকে দেখতে যাবো। বয়স হয়ে গেলে মানুষের যে রোগ গুলো হয় রশিদ সাহেবের তার সব গুলোই আছে। ডায়বেটিকস প্রচন্ড পরিমানে। অথচ তিনি চায়ে আমার চেয়ে বেশী চিনি খান। ভদ্রলোক খেতে এবং খাওয়াতে পছন্দ করেন। আমার ধারনা তিনি ইচ্ছা করেই তার ছেলের সাথে থাকেন না। কারন ছেলেরা তার স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে চিনি ছাড়া চা দিবে। খাবারও দিবে হিসাব করে। অথচ রশিদ সাহেব হিসাবের মধ্যে থাকারে মানুষ না। যখন যা ইচ্ছা করছেন। খাচ্ছেন। কোনো নিয়ম কানুন এর ধারধারেন না। সব মিলিয়ে রশিদ সাহেবের সঙ্গ আমার খারাপ লাগে না। জ্ঞানী মানুষ। রশিদ সাহেব বলেছেন, তিনি আমার বন্ধু। ভালো বন্ধু।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ দুপুর ১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


