
ভদ্রলোকের সাথে যেভাবে পরিচয় হলো-
তালতলা মার্কেটের কাছে একটা চায়ের দোকান আছে। সেখানে আমি প্রায়ই চা খেতে যাই। বাসা থেকে তালতলা বেশ ভালো দূর। রিকশা ভাড়া চল্লিশ টাকা। হেঁটে গেলে পঁচিশ-ত্রিশ মিনিট লাগে। এত দূরে চা খেতে যাই কারন এই দোকানটায় চা ভালো বানায়। এক কাপ চা খেলেই মনটা ভরে যায়। সবচেয়ে বড় কথা এই দোকানে আমাকে বাকি দেয়। সেই চায়ের দোকানে ভদ্রলোককে প্রায়ই দেখি। প্রায় দুই বছর ভদ্রলোকটাকে দেখেছি। কিন্তু কখনও কথা হয়নি। একদম নিরীহ চেহারা। ছোটখাটো মানুষ। সহজ সরল ভালো মানুষ টাইপ। একদিন বৃষ্টির দিনে চায়ের দোকানে আটকা পড়েছি। সেদিনই তার সাথে অনেক আলাপ হলো। অনেক গল্প হলো। এবং তিনি আমার বন্ধু হয়ে গেলেন।
ভদ্রলোকের গল্পটা এই রকমঃ
নাম তার আতাহার। বিয়ের দেড় বছর পর আতাহার সৌদি যায়। সতের বছর পর দেশে ফিরে। এই সতের বছরের মধ্যে সে অনেকবার দেশে ফিরতে চেয়েছে কিন্তু তার স্ত্রী কঠিন ভাবে নিষেধ করেছেন। স্ত্রী বলেছেন, না তুমি এসো না। আমাদের অনেক টাকা জমাতে হবে। জমি কিনতে হবে। বাড়ি করতে হবে। ব্যাংকে অনেক টাকা করতে হবে। তাছাড়া আমাদের একটা ছেলে আছে তাকে মানুষ করতে হবে। জমি, বাড়ি, ব্যাংকে টাকা আর ছেলে মানুষ করতে গিয়ে আতাহার সাহেবের দেশে ফিরতে সতের বছর সময় লেগেছে। এই সতের বছর আতাহার যত টাকা ইনকাম করেছে তা স্ত্রীকে পাঠিয়েছে। আতাহারের ইচ্ছা অনেক টাকা জমেছে। এখন নিজ দেশে গিয়ে কিছু একটা ব্যবসা করবে। অথবা নিজেই একটা গাড়ি কিনে ভাড়ায় চালাবে।
দেশে ফিরে আতাহারের মাথায় বাড়ি।
তার স্ত্রী সমস্ত সম্পদ নিজের নামে করেছে। এবং এই সতের বছর অন্য একজনের সাথে ঘর সংসার করেছে। এমন কি ছেলে সন্তান পর্যন্ত তার না। স্ত্রী আতাহারকে চিনতে সম্পূর্ন অস্বীকার করেছে এবং বলেছে সে কোনো টাকা পাঠায় নি। ইত্যাদি ইত্যাদি। আতাহার সহজ সরল ভালো মানুষ। ক্ষমতাবান কারো সাথে তার পরিচয় নেই। তবু সে পুলিশের কাছে গিয়েছে। পুলিশ তাকে কোনো সহযোগিতা করে নি। বরং তার কাছ থেকে নানান উছিলায় টাকা খেয়েছে। স্ত্রীর কাছ থেকে তীব্র আঘাত পেয়ে আতাহার ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়লো। জমে মানুষ টানাটানি অবস্থা। সৌদি থেকে ফিরে আসার সময় যত টাকা এনেছিলো তার অর্ধেক চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেলো। তাই পুরো চিকিৎসা না করিয়ে সে বাকি টাকা দিয়ে তিনটা সিএনজি কিনে ফেলে। এর মধ্যে একটা সিএনজি হরতাল অবরোধের মধ্যে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
এখন তার দুইটা সিএনজি'ই সম্বল।
সিএনজি চালকরা তাকে ঠিক ভাবে ভাড়া দেয় না। প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা। কিন্তু তাকে পাঁচ শ' টাকার বেশী দেয় না। আতাহার ছোট একটা এক রুমের বাসা নিয়ে একা থাকেন। নিজেই রান্না করে খান। তার বয়স হয়েছে। তাছাড়া শরীর পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাই সে কোনো কাজ করতে পারে না। সিএনজি'র টাকা দিয়ে কোনো ভাবে ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে আছেন। আতাহার সাহেবের বর্তমান বয়স সাত চল্লিশ। কিন্তু তাকে দেখায় ৬৫ বছর। এখন আতাহার সাহেবের সাথে আমার সপ্তাহে দুই দিন দেখা হয়। কোনো কারনে দেখা না হলে, আতাহার অস্থির হয়ে পড়েন। আমাকে ফোন করে খোঁজ খবর নেন। একদিন তার বাসায় গিয়েছি- তিনি নিজে রান্না করে আমাকে খাইয়েছেন। তার হাতের রান্না ভালো। সৌদিতে সে নিজে রান্না করে খেতো।
আমি একজন শিল্পী।
আতাহার সাহেবকে পরিচয়ের প্রথম দিনে আমি প্রথম প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কি করেন? উত্তরে আতাহার সাহেব বলেছিলেন- আমি একজন শিল্পী। আসলে আতাহার সাহেব কোনো শিল্পী না। অতি সাধারণ একজন মানুষ। তবে তিনি প্রচন্ড গান ভালোবাসেন। নিজেই গান লিখেন। নিজের লেখা গান নিজেই গেয়ে আমাকে শুনান। আমি কাছে না থাকলে গান মোবাইলে রেকর্ড করে রাখেন। আমার সাথে দেখা হলে আমাকে সেই গান শুনতে হয়। মন্তব্য করতে হয়। তার গলা খুবই বাজে। এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান এর চেয়ে তার গলা আরো বেশী খারাপ। সম্ভব স্ত্রী দেওয়া দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকার জন্য তিনি গানে আশ্রয় নিয়েছেন। এই অসহায় লোকটার প্রতি আমার খুব মায়া হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ১১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


