
ছবিঃ আমার তোলা।
HSC পাশ করে ভাবলাম, আর লেখাপড়া করবো না।
অনেক হয়েছে। তখন লোকজন বলাবলি করতো লেখাপড়া করে লাভ কি, চাকরী পাওয়া যায় না। বিদেশে কামলা খাটতে হয়। তখন দেখতাম অনেকেই বিদেশ চলে যাচ্ছে। তাই আমিও বিদেশ চলে যাবো মনস্থির করে ফেলেছি। সে সময় মরিসাস যাওয়া আমার জন্য সহজ ছিলো। টাকাও খুব কম লাগতো। শুনেছি মরিসাস খুব সুন্দর দেশ। কাজ করতে পারলে ভালো টাকা আয় করা যায়। আমি জটপট পাসপোর্ট করে ফেললাম। ভিসাও হয়ে গেলো। আত্মীয়স্বজন সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। মরিসাস যাওয়ার আগের দিন ভাবলাম- নিজ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি! পরিচিত মানুষজনের সাথে আর দেখা হবে না। বাংলায় কথা বলতে পারবো না। বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিতে পারবো না! না, ভাই আমি বিদেশ যাবো না।
চায়ের দোকানের আড্ডা আমার ভীষন প্রিয়।
এখন আমি যে চায়ের দোকানে আড্ডা দেই, সেই দোকানটা আমার খুব ভালো লাগে। চায়ের দোকানে বসি না। চায়ের দোকানের উলটা পাশে একটা ডাব গাছ আছে। সুন্দর করে বাঁধানো সেই ডাব গাছের নিচে বসি। ইশারা করলেই চায়ের দোকানের মহিলা চা পাঠিয়ে দেয়। এই চা বিক্রেতা মহিলার মধ্যে একটা রংবাজ-রংবাজ ভাব আছে। জিন্স প্যান্ট পড়ে। মুখে সব সময় একটা টুথপিক থাকেই। কালো সানগ্লাস পড়ে। কানে সব সময় হেডফোন লাগানো থাকে। মহিলা বিয়ে করেনি। তার বোনের বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে। প্রায়ই দেখি ভিডিও কলে বোনের বাচ্চাদের সাথে কথা বলছে। ইদানিং দেখছি মহিলা টিকটক করছে। সন্ধ্যার সময় মহিলা বড় রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনিয়ে খায়। মাঝে মাঝে আমাকে সেই খাবারের ভাগ দেয়।
ডাব গাছের নিচে বসে আছি একা।
সন্ধ্যা তখন ঘনায়মান। লকডাউন চলছে তবু রাস্তায় প্রচুর মানুষ। দোকানপাট প্রায় সবই খোলা। ডাব গাছের পেছনে একটা ফার্মেসী। ফার্মেসীর নাম সেবা। সেবা নামটা যথার্থ হয়েছে। এরা আসলেই সেবাটেবা করে। পানি চাইলে ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে দেয়। টাকা নেয় না। ইদানিং এক বয়স্ক লোক এসে এই ডাব গাছের নিচে হেলান দিয়ে বসে থাকে। তার পা ভেঙ্গে গেছে। পায়ে নানান যন্ত্রপাতি লাগানো। তার সাথে এক চেংড়া ছেলে থাকে। সে তাকে হাত ধরে ডাব গাছের নিচে বসিয়ে দিয়ে, দূরে গিয়ে ফিক ফিক করে সিগারেট খায়। বয়স্ক লোক, তার উপর পা ভেঙ্গে গেছে। দেখলে মায়া লাগে! উনি এসে কারো সাথে কোনো কথা বলেন না। মোবাইল বের করে গান শুনেন। আধা ঘন্টা থাকেন। এক কাপ চা আর একটা সিগারেট খেয়ে চলে যান।
একদিন চায়ের দোকানে গিয়ে দেখি-
এক বুড়ো সেলাই মেশিন নিয়ে আমার ডাব গাছের নিচে বসে আছে। অর্থাৎ আমার বসার জায়গা নেই। আমি বললাম, চাচা মিয়াঁ এইখানে তো আমি রোজ বিকেলে এসে বসি চা-টা খাই। আপনি তো আমার জায়গা দখল করে নিয়েছেন। বুড়ো রাগ দেখিয়ে বলল, আমি এখানে বিশ বছর ধরে বসি। আমি বললাম, আমি গত ছয় মাস ধরে টানা এখানে আসছি। আপনাকে তো দেখি নাই। বুড়ো বলল, গত বছর করোনার শুরুতে গ্রামে চলে গিয়েছিলাম। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লো, আমার নিজের শরীরও বিশেষ ভালো না, তারপর চারিদিকে করোনা- তাই ভাবলাম আপাতত গ্রামেই থাকি। এই এলাকার সবাই আমাকে চিনে মঞ্জু মাস্টার নামে। সমস্যা নেই আপনি এখানে পাশ দিয়ে বসবেন। চা খাবেন, আড্ডা দিবেন। এই ডাব গাছ আমার না, আপনারও না। এই গাছ সরকারি গাছ। রাস্তায় পড়েছে। হি হি।
এই ডাব গাছটার প্রতি আমার মায়া পড়ে গেছে।
গাছ ভর্তি ডাব। নারকেল হওয়ার পথে। পা ভাঙ্গা লোকটা, বুড়ো দর্জি এবং চা বিক্রেতা মহিলা- এদের প্রতি মায়া জন্মে গেছে। এরা কেমন যেন আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছে। লকডাউন এর কারনে মাঝে দিয়ে তিন দিন চায়ের দোকানে যাই নি। কিন্তু ওদের কথা বেশ কয়েবার মনে পড়েছে। ওদের দেখতে ইচ্ছা হয়েছে। কারো নাম্বার আমার কাছে নেই। নাম্বার থাকলে অবশ্যই ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতাম। ভর সন্ধ্যায় এখানে বসে চা খেতে ভালো লাগে। যদিও মহিলা চা ভালো বানায় না। দুনিয়ার চিনি দিয়ে শরবত বানিয়ে রাখে। কিন্তু মহিলা বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। মহিলা আমার সাথে মায়ের মতো আচরন করে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০২১ দুপুর ১২:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




