
১। আব্বা তার ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।
আব্বা তার ভাইবোনদের সব সময় খোজ খবর রেখেছেন। যার যা প্রয়োজন আজীবন দিয়ে গেছেন। আব্বার ভাই বোনের সংখ্যা অনেক। সব মিলিয়ে এগারো জন। আমার দুই চাচা বউ বাচ্চা নিয়ে গ্রামে থাকেন। তাঁরা কিছুই করেন না। আব্বা চাচাদের সংসার টানতেন। দাদা দাদীর খুব খেয়াল রাখতেন। একটা বিষয় আমার খুব ভালো লাগতো আমার চাচা ফুপুরা কখনও আব্বার অনুমতি ছাড়া কিছু করতো না। আব্বাকে খুব সম্মান, শ্রদ্ধা করতো। চাচা ফুপুরা কিছু করার আগে আব্বার পরামর্শ নিয়ে নিতো।
২। ১৬ ডিসেম্বর রাতের কথা।
তখন আমি অনেক ছোট। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষ্যে টিএন্ডটি কলোনী মাঠে কর্নসাট হচ্ছিলো। আমি সেই কনসার্টে যাই। আব্বা রাতে বাসায় ফিরে দেখেন আমি বাসায় নাই। রাত তখন বারোটা। আব্বা জানেন না আমি কোথায় গান শুনতে গিয়েছি। কিভাবে কিভাবে যেন আব্বা আমাকে খুঁজে বের করে ফেললো! বলল, প্রচন্ড শীত! তোমার তো ঠান্ডা লেগে যাবে। চলো বাসায়। চলো। আমি বললাম, তুমি জানলে কি করে আমি এখানে। তাছাড়া বিশাল মাঠ। হাজার হাজার মানুষ। এত মানুষে মধ্যে আমাকে খুঁজে বের করলে কি করে? আব্বা বলল, বাপদের অনেক কিছু জানতে হয়। বুঝতে হয়।
৩। একবার আমি দাঁত ব্যথায় বিধ্বস্ত।
ঘরোয়া চিকিৎসায় কোনো উপকার পাই নি। গাল ফুলে আলু হয়ে আছে। রাতে আব্বা বাসায় এসে আমার অবস্থা দেখে অবাক! আব্বা বলল, চল ডাক্তারের কাছে যাই। মা বলল এখন বাজে রাত ১১ টা। এত রাতে ডাক্তারখানা খোলা পাবে না। আব্বা বলল, ছেলে ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে, একটা কিছু তো করতে হবে। রাত ১১ টায় বের হলাম। নীচতলায় ফার্মেসী খোলা কিন্তু দোতলায় দাঁতের ডাক্তার নেই। আব্বা ফার্মেসী থেকে ডাক্তারের ঠিকানা নিয়ে নিলো। ডাক্তারের বাসায় গেলাম। তখন রাত বারোটা। ডাক্তার ঘুমাতে যাচ্ছিলেন। আব্বা বলল, আমার ছেলে দাঁত ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ব্যথা নাই করার ব্যবস্থা নিন।
৪। আমাকে নিয়ে আব্বার চিন্তা খুব বেশি ছিলো।
একবার আমাদের সমস্ত আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব মিলে সুন্দরবন গিয়েছিলাম। বিশাল এক তিনতলা লঞ্চ ভাড়া নিয়ে। বঙ্গোপসাগরে আমাদের লঞ্চ। প্রচন্ড শীত। এত শীত যে হাতের ও পায়ের আঙুল ঠান্ডার কারনে বাঁকা হয়ে যায়। টেনে সোজা করতে হয়- এমন অবস্থা! তখন মধ্যরাত। যে যার কেবিনে। কেউ লেপ গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। কেউ তাস খেলছে। কেউ মদ্যপান করছে। আমার ঘুম আসছিলো না। আমি হাঁটতে বের হয়েছিলাম। তখন দেখলাম একটা কেবিনের দরজা খোলা। সেখানে গিয়ে দেখি তাঁরা মদ খাচ্ছে। আমাকে বলল, খাও। তাহলে শীত কম লাগবে। আমি মদ খেলাম। লঞ্চের ছাদে গেলাম। বঙ্গোপসাগরে দিকে তাকিয়ে আছি। আমার খুব ভালো লাগছিলো। হঠাত পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম সাগরে। ঠিক এমন সময় আব্বা এসে আমার হাত ধরে ফেলে।
৫। আব্বার হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিলো।
দেখলে মনে হবে কম্পিউটার কম্পজ। আব্বা সব সময় টিপটপ থাকতো। জামা জুতো, খাওয়াদাওয়া, হাতঘড়ি, গাড়ি, পারফিউম নিয়ে আব্বা খুব বিলাসিতা করতো। বাসায় পড়া লুঙ্গিটা পর্যন্ত দোকান থেকে আয়রন করে আনতো। আর আমার স্বভাব ছিলো এলোমেলো। অগোছালো। প্রায়ই আব্বা পকেট থেকে চিরুনি বের করে বলতো চুল আচড়ে নে। আব্বা কোনো দিন তার কোনো সমস্যার কথা আমাকে বলে নি। এমন কি তার শরীর খারাপ হলেও বলে নি। টাকা চাইলে কোনো দিন মানা করতো না। পাঁচ শ' টাকা চাইলে এক হাজার টাকা দিতো। আব্বা কেনাকাটা করলে কখনও কোনো কিছুর দাম জিজ্ঞেস করতো না। এই অভ্যাসটা আমার আছে। আমিও কেনাকাটা করার সময় দাম জিজ্ঞেস করিই না। শুধু বলি- ভালো জিনিসটা দাও।

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৩:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



