
প্রিয় কন্যা আমার,
এমাস শেষে তোমার এক বছর পূর্ন হবে। দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেলো। এই এক বছরে তোমাকে ২০ বার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়েছে। তোমার জ্বর হয়েছে। ঠান্ডা লেগেছে। তোমার ওষুধের নাম গুলোও আমার মুখস্ত হয়ে গেছে। এলার্জেস, ফ্লাকল, পেডিগ্যাস আর নাপা। একটা ভিটামিনের ওষুধ ছিলো নাম ভুলে গেছি। কত সাবধান থেকেছি আমি আর তোমার মা অথচ তুমি ঠিক জ্বর সর্দি বাধিয়েছো। গত দুইদিন ধরে তোমার আবার ঠান্ডা লেগেছে। অবশ্য এখন শীতকাল। শীতকালে সর্দি, জ্বর প্রায় সব শিশুদের হয়। গত এক বছরে তুমি দুইবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। সারারাত আমি আর সুরভি জেগে বসে ছিলাম।
প্রিয় কন্যা ফারাজা,
তোমার দাঁত উঠতে শুরু করেছে। তবে এখনও তুমি একাএকা হাঁটতে পারো না। একা খাট থেকে নেমে যাও। সোফা থেকে নেমে যাও। তাহলে একাএকা হাঁটতে পারছো না কেন? তবে আগামী দুই একমাসের মধ্যে তুমি একা হাঁটা শুরু করবে। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আব্বার প্রথম মৃত্যুতে বার্ষিকীতে তোমাকে গ্রামে নিয়ে গেলাম। তুমি প্রথম দাদা বাড়ি গেলে। সারাদিন তুমি বেশ আনন্দেই ছিলে। তুমি ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করো। কোনো সমস্যা নেই। আমি তোমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবো। তোমার প্রায় এক বছর হয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম গ্রামে নিয়ে গিয়ে তোমাকে উঠানে ছেড়ে দিবো। তুমি মনের সুখে সারা উঠান হেঁটে বেড়াবে। তা হয়নি।
প্রিয় কন্যা ফারাজা তাবাসসুম,
এমাসের ৩১ তারিখ তোমার জন্মদিন। বছরের শেষ দিন তোমার জন্মদিন। তোমার জন্মদিন পালন করবো। তোমার প্রথম জন্মদিন খুব বড় করেই পালন করবো। অলরেডি গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া হয়ে গেছে। সেদিন আমরা সবাই খুব মজা করবো। রাত বারোটায় তোমার সামনে কেক রাখা হবে। সেই কেক আমরা কেউ খাবো না। তুমি খাবে। সারা শরীর মাখামাখি করবে। তোমাকে কেউ কিচ্ছু বলবে না। তুমি প্রচুর আদর ভালোবাসায় বড় হচ্ছো। তোমার ভাগ্য ভালো। তুমি একজন ভালো বাবা পেয়েছো। ভালো মা পেয়েছো। ভালো চাচা চাচী পেয়েছো। আমি এমনটা পাই নি। ছোটবেলা থেকে শুধু মাকে কাছে পেয়েছি।
প্রিয় কন্যা ফারাজা তাবাসসুম খান ফাইহা,
দেশে করোনার প্রকোপ নেই এখন। আমি মাস্ক ছাড়া বাইরে যাই। বাইরে বের হলে অল্প কিছু মানুষের মুখে মাস্ক দেখা যায়। বাংলাদেশে করোনায় সরকারী হিসাবে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। করোনা সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীতে আরো এরকম রোগ আসবে। অতীতেও এসেছে। রোগ শোক দুনিয়াতে আছেই। থাকবেই। তোমাকে সাবধান থাকতে হবে। নিজেকে নিজেই সাবধান করবে। নিরাপদ রাখবে। কারো কাছ থেকে কখনও কোনো সাহায্য আশা করবে না। নিজের শক্তির উপর ভরসা রাখবে। দুনিয়াতে তুমি কারো উপর ভরসা রাখবে না। ভরসা রাখবে শুধু নিজের উপর। এই সমাজের কোনো মানুষের উপর তুমি আস্থা, ভরসা রাখবে না। কাউকে বিশ্বাস করবে না।
প্রিয় কন্যা ফাইহা,
আমি সারা জীবন বেঁচে থাকব না। তোমার মা সারা জীবন বেঁচে থাকবে না। আমি যতদিন বেঁচে আছি, তোমার কোনো ভয় নেই। কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু আমার মৃত্যুর পর তোমাকে পথ চলতে হবে একা। তোমাকে ফাইট করে বেঁচে থাকতে হবে। তুমি এমন একটা দেশে জন্ম নিয়েছো, যে দেশের মানুষ গুলো ভালো না। কেউ ভালো না। চারিদিকে এত এত দুষ্টলোকের মধ্যে তোমাকে বুদ্ধি করে বেঁচে থাকতে হবে। টিকে থাকতে হবে। সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যেন মানুষ তোমাকে ভালোবাসে। সম্মান করে। তোমার চলার পথ মসৃন হবে না। কিন্তু তুমি তোমার সমস্ত জ্ঞান দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে সাফল্যের শিখরে যাবে নিশ্চয়ই। অসহায় দরিদ্র মানুষদের সব সময় সাহায্য সহযোগিতা করবে।
প্রিয় কন্যা আমার,
তোমাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। করতেই হবে। অন্য দশজন সাধারণ মেয়ের মতো হলে চলবে না। তুমি রাজীব নূরের কন্যা। তোমাকে সমাজের জন্য কিছু করতে হবে। দেশের জন্য কিছু করতে হবে। এজন্য কেউ তোমাকে সাহায্য করবে না। যা করার তোমার নিজেকেই করতে হবে। এমনকি তোমার জ্বর এলে কেউ তোমার মাথায় পানি দিবে না। কাজেই জ্বরে কাতর হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা যাবে না। প্রচন্ড জ্বর, প্রচন্ড মাথা নিয়ে তোমাকে উঠতে হবে। ওষুধ খেতে হবে। তোমার পায়ের নীচে মাটি তোমাকেই শক্ত করতে হবে। তোমার দেখার ক্ষমতা গভীর হতে হবে। সাধারণ মানুষ যা দেখবে। তার চেয়ে তোমাকে বেশি দেখতে হবে। জানতে হবে, বুঝতে হবে।

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ১০:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



