
আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
জন্মেছিলেন ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে। অল্প কিছুকাল স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়া ছাড়া তিনি অন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় টাঙ্গাইলের কাগমারি স্কুলের শিক্ষক হিসাবে ১৯০৯ সালে। ভাসানীর রাজনৈতিক দীক্ষা হয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে। তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে লং-মার্চ। সমাজের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।
তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা।
এবং পঞ্চাশের দশকেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো। জনগণের একটুখানি সেবা করার উদ্দেশ্যেই রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ। নিজের ও বংশধরদের ভাগ্য গড়ার প্রয়োজনে নয়। এ ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ সার্থক। ৭০-এর দশকে ভারত সরকার মাওলানা ভাসানীকে দিল্লিতে নিয়ে আসে। সেখানে বিনা পয়সায় তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। তিনি ভারত থেকে ঢাকায় ফিরে এসেই সেই বিখ্যাত উক্তিটি করলেন- ‘আসাম আমার , পশ্চিমবঙ্গ আমার , ত্রিপুরাও আমার। এগুলো ভারতের কবল থেকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানচিত্র পূর্ণতা পাবে না’।
স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই,
বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি যিনি এক অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন, তিনি হলেন মওলানা ভাসানী। তিনি ছিলেন এদেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের মুক্তির দিশারী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন ভাসানী। তিনি ৯ মার্চ, ১৯৭১ সালে পল্টনে এই ভাষণ দেন। ’৭১ এর জানুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী সারাদেশে জনসভা করে জনগণকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৪ এপ্রিল পাকসেনারা মওলানা ভাসানীকে হত্যা অথবা গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে তাকে খুঁজতে থাকে এবং জিজ্ঞেস করে, ‘কাফের ভাসানী কোথায়?’ তাকে না পেয়ে তার বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় ।
পাকবাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে নানা কৌশলে মওলানা ভাসানী পাড়ি জমান ভারতে।
সেখানে প্রবেশের পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকার কলাম জুড়ে ছাপা হয়, ‘সীমান্তের এপার ভাসানী–সজল চোখে সাহায্য প্রার্থনা’। সেখানে লেখা হয় ‘বাংলাদেশের জনগণের উপর পাকিস্তানি জঙ্গি ফৌজের নির্যাতন বন্ধের জন্য তিনি করজোড়ে ও সজল চোখে ভারত সরকারের কাছে নৈতিক সমর্থন ও সাহায্য প্রার্থনা করেন।’ ভাসানী মুক্তিযুদ্ধকে সুদৃঢ় এবং মুক্তিযুদ্ধের গতিবেগ সঞ্চার করার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব, মুসলিম বিশ্বের কাছে, গণতান্ত্রিক সকল রাষ্ট্রসহ বিশ্ববাসীর কাছে একের পর এক চিঠি পাঠান। আর ’৭১ এ চীন ও আমেরিকা বাংলাদেশের বিরোধিতা ও পাকিস্তানকে সমর্থন করায় ভাসানী তাদের কৃত অন্যায়ের প্রতিবাদ করে একের পর এক বিবৃতি প্রদান করে চিঠিপত্র ও টেলিগ্রাম পাঠান এসব দেশে।
যুদ্ধের পুরো সময় মওলানা ভাসানী-
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রাখতে জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে তারবার্তা প্রেরণের পাশাপাশি তাঁর আন্তর্জাতিক প্রভাবের সর্বাত্মক ব্যবহার করেছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া স্বত্বেও মওলানা ভাসানী স্বাধীন দেশে পা রাখেন পাকিস্তানে কারাবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার ১২ দিন পর। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি সর্বপ্রথম যে দাবিটি তোলেন তা হলো, বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ।
সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে নির্বাচিত শেখ মুজিবকে-
ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তালবাহানা চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু যখন তাদের সাথে আলোচনা করছিলেন তখন ৯ ই জানুয়ারী ১৯৭১ সালে পল্টন ময়দানে বিরাট জনসভায় ভাসানী শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আলোচনায় কিচ্ছু হবে না, ওদের আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দাও”। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে এলে ভাসানী তাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য সহযোগিতা ও শরনার্থীদেরকে আশ্রয় দেয়ায় জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাকে মেহমানদারির জন্য ধন্যবাদ জানান সেই সাথে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ জানান। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে নেয়ার জন্য সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ভাসানী।
ভাসানী ৯৬ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
তার মৃত্যু হয় ঢাকা পিজি হাসপাতালে। তাকে সমাহিত করা হয় তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। ভাসানী বলতেন, “আমি হিন্দুস্থানের সাহায্য-সহযোগিতা চাই কিন্তু তাদের উপর নির্ভরশীল হতে চাই না”। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠিত করেন এই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আজ তার নাম কেউ নেয় না। তার নাম মুখে নিলে কি আওয়ামীলীগ ছোট হয়ে যাবে? শেখ মুজিব নিশ্চয়ই একা এদেশ প্রতিষ্ঠিত করেন নি। যারা শহীদ হলো তাদের অবদান নাই এদেশে? এদেশে সব কি শুধু শেখ মুজিব আর তার পরিবার করেছেন? তাজউদ্দিন আহমেদসহ জাতীয় চার নেতা, মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, ওসমানী, সিরাজ সিকদার, কর্নেল তাহের,খালেদ মোশাররফ, ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ কারো কিছু অবদান আছে? থাকলে তো তাদের নাম উচ্চারণ হতো।
তথ্য সুত্রঃ
১। আমার দৃষ্টিতে মওলানা ভাসানী
- মাওলানা আব্দুল মতিন
২। মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি
- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকি
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



