
আমি আর আমার বন্ধু শাহেদ জামাল।
দুই বন্ধু মিলে রাতের ঢাকা দেখতে বের হয়েছি। আসলে শাহেদ জামাল নতুন একটা গাড়ি কিনেছে। শাহেদের ইচ্ছা সে আমাকে নিয়ে ঢাকা শহর ঘুরবে। আমি শাহেদকে সময় দিতে পারছিলাম না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি- আমরা দুই বন্ধু একই শহরে থাকি। কিন্তু আমাদের দেখা হয় না মাসের পর মাস। অবশ্য রমনা পার্কে গেলে শাহেদ জামালের দেখা পাওয়া যায়। সে গাছপালা ভালোবাসে। শাহেদ আমার ল্যাংটা কালের বন্ধু। একসময় আমরা একই এলাকায় থাকতাম। একই স্কুলে পড়তাম। বিকেলে একসাথে মাঠে ফুটবল খেলতাম। শাহেদ ছিলো গোলকিপার আর আমি পুরো মাঠ জুড়ে খেলতাম। আমার পায়ে বল আসলে মুখ চোখ খিচিয়ে দিতাম এক দৌড়। দৌড়ে আমার সাথে কেউ পারতো না। যাইহোক, ঢাকা শহরের দশটা ভালো ছেলের তালিকা তৈরি করলে সেখানে শাহেদের নাম অবশ্যই থাকবে। বাংলাদেশ হচ্ছে ইতরের দেশ। এই ছেলে ভালো মানুষদের দেবতাদের মতো ভালোবাসা উচিৎ।
রাত একটায় বাংলামটর শাহেদ জামাল আমার জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলো।
রাতের ঢাকা দিনের ঢাকার চেয়ে সম্পূর্ন আলাদা। ফার্মগেট এলাকায় অনেক গাড়ি ও রিকশা দেখলাম। অবাক ব্যাপার হচ্ছে যাত্রীও আছে। সিএনজি আছে। ফুটপাতে অনেক মানুষ শুয়ে আছে। এই শীতে এবং ধুলো বালির মধ্যে মানুষ গুলো কি করে শুয়ে আছে? অসহায় মানুষ গুলো দড়ি দিয়ে টানানো ব্যানারকে বানিয়েছে চাদর। কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। তাদের পাশেই কিছু কুকুরও শুয়ে আছে। কাওরানবাজার এলাম। খুবই জমজমাট এলাকা। ঢাকার বাইরে থেকে বড় বড় ট্রাক আর পিক-আপ এসেছে সবজি বোঝাই করে। কুলিরা ভীষন ব্যস্ত। দিনের বেলার চেয়ে রাতে কাওরান বাজারে বেশি ভিড়। যারা ভ্যান গাড়িতে ঢাকার অলিগলিতে সবজি বিক্রি করেন তারা ভ্যান নিয়ে এসেছেন। দরদাম করে সবজি কিনছে পাইকারী আড়ৎদারদের কাছ থেকে। পিক-আপে করে একের পর এক আসছে ফার্মের মূরগী। চারিদিকে অপরিস্কার অপরিচ্ছন্ন।
আমরা চলে এলাম মিরপুর- ১০।
ফুটপাতে অসংখ্য দোকান। এবং সব দোকানে অনেক ভিড়। একটা দোকান থেকে আমরা খিচুড়ি আর হাঁসের মাংস খেলাম। রান্নার স্বাদ ভালো না। প্রতিটা দোকানের সামনে দরিদ্র ক্ষুধার্থ মানুষেরা দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার আগ্রহ নিয়ে খাছে অথবা পলিথিনে করে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মানুষ গুলো এত গরীব কেন? যেখানেই যাই গরীব মানুষ। ভিক্ষুক এসে হাত পাতে। এই গভীর রাতেও ভিক্ষুক পেলাম। দেখলাম অল্প বয়সী কিছু ছেলে বড় বাসের পেছনে বসে নেশা করছে। এদের কোনো ঘর বাড়ি নেই। হয়তো বাবা মা নেই। এরা রাস্তাতেই থাকে। শহর বদলে যাচ্ছে, অথচ এদের কোনো পরিবর্তন নেই। আগারগাতে দেলখলাম চারজন মেয়ে সেজে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ে গুলো মুখে সস্তা মেকাপ। খরিদদার পেলে ফুটপাতেই চাদর দিয়ে ঘেরা অস্থায়ী ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। এদের গ্রাহক কারা? দেখলাম একটা ছেলে বাইক করে আসলো। এবং মেয়েটাকে দরদাম করে নিয়ে গেলো।
প্রতিটা রাস্তা খালি। কোনো জ্যাম নেই।
বিজয় স্মরনী সিগনাল এক চান্সেই পার হয়ে গেলাম। কিছু লোক ফুটপাত মেরামতের কাজ করছে। মুহুর্তের মধ্যে চলে এলাম গুলিস্তান এলাকায়। গুলিস্তান খুবই বাজে একটা এলাকা। এই এলাকায় যারা ব্যবসা করে তারাও বাজে। যে সমস্ত পুলিশ এখানে ডিউটি করে তারাও বাজে। এদের মানসিকতা অতি নিম্মমানের। খুবই নোংরা এলাকা। রাত আড়াইটা। এখনও অনেক মানুষ সজাগ। ফুটপাতে কত মানুষ শুয়ে আছে। বসে আছে। চলে এলাম ফকিরাপুল পুলিশ হাসপাতালের কাছে। কিছু পুলিশ মোটা শীতের জামা পরে, কানটুপি দিয়ে নিজেদের ঢেকে রেখেছেন। ডিউটি বাদ দিয়ে এরা বেঞ্চে ঘুমাচ্ছেন। কেউ কেউ মোবাইল টিপছেন। রাস্তায় প্রচুর ধুলো। অনেক রিকশাচালক শুধু রাতে রিকশা চালায়। প্রতিটা বড় রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান দেখলাম। বড় বড় বাস যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের লোকজন কাজ করছে। অনেক রাত তবুও কিছু কিছু বার থেকে ছেলেগুলো হেলে দুলে বের হচ্ছে। একজনকে দেখলাম বাইকে করে যাচ্ছে। বাইক একবার ডান দিকে, একবার বাম দিকে হেলে যাচ্ছে।
শাহেদ গাড়ি ভালো চালায়।
তার ইচ্ছা ছিলো সে ময়মনসিংহ চলে যাবে। নীলাদের বাড়ি ছিলো ব্রহ্মপুত্র নদীর কাছে। নীলার সাথে শাহেদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন। এমনকি নীলার বিয়েও হয়ে গেছে। অথচ সে পুরাতন প্রেম জিইয়ে রাখতে চায়। শাহেদ জানে না নীলা আমাকে এবং কখনও কখনও সুরভিকে ফোন করে। শাহেদের খোজ খবর নেয়। আমি বললাম, বন্ধু এখন নীলক্ষেত চলো। তারপর গুলশান- ২। গাউসুল আজম মার্কেটের সামনের ফুটপাতে অসহায় ও দরিদ্র একটি পরিবার দেখলাম। ছোট বাচ্চাটাকে বাবা মা শীত থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করছেন। এরকম দৃশ্য দেখলে কষ্ট লাগে। চলে গেলাম গুলশান। এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ড গুলো ডিউটি ফাকি দিয়ে কাঁথা বিছিয়ে ঘুম দিচ্ছে। ঠিকই আছে, এত রাতে কেউ টাকা উঠাতে আসবে না। তাছাড়া বাইরে বেশ ঠান্ডা। একলোক দেখলাম ফ্লাক্সে করে চা বিক্রি করছে। আমি সিউর এই চা বিক্রেতার কাছে গাজা, ইয়াবা পাওয়া যাবে। এমনকি নিশিকন্যাও পাওয়া যাবে।

শাহেদ জামালের নতুন গাড়িটা এই রকম।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


