
প্রিয় কন্যা আমার-
আজ আমি আমার খালাকে ফোন করেছিলাম। খালা ফোনে অনেক কান্না করলেন। কাঁদতে কাঁদতে অনেক কথা বললেন। এখন খালা একজন অসুখী মানুষ। অথচ এখন তার সুখী হবার কথা। তার সব ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে। সবাই ভালো ভালো চাকরি করে। ছোট ছেলে বউ বাচ্চা নিয়ে থাকে আমেরিকা। আর্থিক কোনো সমস্যা নেই। অথচ খালা প্রায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। এটাই তার সবচেয়ে বড় শাস্তি। শারীরিক অসুস্থতা তিনি সহ্য করতে পারেন কিন্তু ছেলেমেয়েদের তুচ্ছতাচ্ছিলতা এবং নিয়মিত যোগাযোগ না করা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। খালা বললেন, আমার এত গুলো ছেলেমেয়ে। কত গুলো নাতী। অথচ কেউ আমাকে ফোন দেয় না। কোনো খোজ খবর নেয় না। আমি বড় একা। রাজীব তুই আমাকে ফোন দিলি, আমার খুব খুশি লাগছে। আনন্দ লাগছে। খালার জন্য খুব মায়া হলো। ফারাজা, বয়স হয়ে গেলে কি মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে?
আমার মায়ের যখন জন্ম হয়, তখন আমার খালার দশ বছর বয়স।
আমার নানা নানী ব্যবসার কাছে ভারত যায়। সেখানে অনেকদিন থাকতে হয়েছিলো। খালার জন্ম বিক্রমপুর। এবং ভারতের আসামে আমার মায়ের জন্ম হয়। আমার খালা মাকে কোলে করে মাকে ঢাকা আনেন। আমার দাদা বাড়ি, নানা বাড়ি দুটাই বিক্রমপুর। অবশ্য নানা বাড়ি এখন আর নেই। পদ্মা নিয়ে গেছে। যাইহোক, আমার মায়ের সাথে খালার কথা বন্ধ। দুই বোন অথচ কেউ কারো সাথে কথা বলে না। দশ বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে। আমার কোনো মামা নেই। একটাই খালা। মার সাথে খালার যোগাযোগ, কথাবার্তা একদম বন্ধ। খালা হজ্ব করতে যাবে। মায়ের সাথে দেখা করতে এলো। মা খালার সাথে কোনো কথা বলে নাই। মনে হয় না দুই বোন বাকি জীবনে আর দেখা সাক্ষাৎ করবে। আমার সাথে খালার যোগাযোগ আছে। কথাবার্তাও হয়। একসময় আমার মা এবং খালার ঝগড়া হয়েছে। হয়তো দোষ দুজনেরই ছিলো কম বেশি। এখন আমার মা এবং খালা দুজনেরই বয়স হয়েছে।
ফারাজা তাবাসসুম খান,
তোমার নানার কথা শোনো। তোমার নানা সরকারি চাকরি করতেন। চাকরি থেকে অবসরে গেছেন পনের বছর হয়ে গেছেন। তোমার নানা অবসর জীবনযাপন একদম পছন্দ করেন না। তাই তিনি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন ওকালতি করছেন। তিনিও আমার খালার মতো আজ একা হয়ে পড়েছেন। তোমার মামা মামী ফিনল্যান্ড থাকেন। তোমার খালা থাকে ইটালী। বাসায় থাকে শুধু তোমার ছোট মামা। এখন দেখা যায়, তোমার ছোট মামাও সারাদিন বাসায় থাকে না। সকালে বের হয়, অনেক রাতে ফিরে। আবার ছোট মামা আজ থাইল্যান্ড, কাল ভিয়েতনাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ঘোরাঘুরি নিয়ে মহা ব্যস্ত। বাসায় তোমার নানাকে একা থাকতে হয়। মাঝে মাঝে আমরা যাই তোমার নানা বাড়ি। তোমার মা পাচ সাত দিন থাকে। ফারাজা তোমার নানী অনেক আগেই মারা যান। তোমার নানা চিকিৎসার কোনো ত্রুটি রাখেন নাই। লাখ লাখ টাকা খরচ করেও তোমার নানীকে বাচানো যায়নি।
তোমার নানী অনেক আগেই মারা গেছেন।
আমি শ্বাশুড়ির আদর পেলাম না। আফসোস। অবশ্য মিথ্যা বলব না, তোমার নানা বাসায় গেলে তোমার মা আদর যত্নের কোনো ত্রুটি রাখে না। যাইহোক, এখন দেখো, আমার খালা আজ একা। এক হিসেবে তোমার নানাও একা। অথচ তাদের ছেলে আছে, মেয়ে আছে। নাতী আছে। বয়স হয়ে গেলে কি মানুষ একা হয়ে পড়ে? অসহায় হয়ে পড়ে? আমিও কি একসময় একা হয়ে যাবো? ইচ্ছা করলেই তোমাকে দেখতে পাবো না? তোমার সাথে কথা বলতে পারবো না? আজ খালা বলল, একা থাকা খুব কষ্টের। কিছুদিন আগে একলোক আত্মহত্যা করলো। কারন সে একা। অথচ তার ছেলে আছে, মেয়ে আছে। একাকীত্ব মানুষ সহ্য করতে পারে না। আমারও একা ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে। তোমার নানা একা হয়ে গেছেন। বাসায় তার সাথে কথা বলার কেউ নাই। আমার খালারও একই অবস্থা। কেন বাবা মায়ের বয়স হয়ে গেলে তারা একা হয়ে যায়? এই সমাজে বহু বাবা মা আজ একা।
প্রিয় কন্যা আমার-
আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তুমি আমার কাছেই থেকো। পাশেই থেকো। আমার মায়ের কথা বলি। আমার মা-ও কিন্তু এক হিসেবে একা। আমার আব্বা মারা গেলো তোমার জন্মের কয়েকদিন আগে। আব্বা বেচে থাকতেও মার সাথে একটা দূরত্ব ছিলোই। এখন মা সারাদিন একা ঘরে থাকে। টিভি দেখে। মোবাইলে ফেসবুক চালায় আর গেমস খেলে। এভাবেই তার দিন যাচ্ছে। মা নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যায়। আর তিনবেলা ওষুধ খায়। একসময় মা আশেপাশের বাড়ি বেড়াতে যেতো, এখন সেটাও যায় না। সিড়ি দিয়ে ওঠা নামা করা কষ্টকর। আমি প্রতিদিন মার ঘরে যাই। তার সাথে গল্প করি। মা অনেক খুশি হয়। আমি খেয়াল করে দেখেছি, মার ঘরে কেউ গেলে মা অনেক খুশি হয়। কেউ যখন মার ঘরে যায় না। তখন মা বাতের ব্যথা নিয়ে আমাদের ঘরে আসে। গল্প করে।
ফারাজা, প্রিয় কন্যা আমার-
বয়সকালে আমার জীবন কেমন কাটবে সেটা নির্ভর করছে তোমার উপর। তুমি চাকরি করো। বিজনেস করো। বিয়ে করো। ঘর সংসার করো। আমার কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু আমাকে একা ফেলে রেখো না। একাকীত্ব বড় যন্ত্রনাময়। মরে গেলে তো মরেই গেলাম। কিন্তু যতদিন বেচে আছি, তুমি আমার পাশেই থেকো। কাছেই থেকো। আমি চাই না আমার জীবন তোমার নানা অথবা আমার খালার মতো হোক। সারা জীবন তোমার নানা এবং আমার খালার পাশে কত লোকজন ছিলো। ফারাজা, আমি সারাদিন পর বাসায় এসে, আগে আমার মায়ের সাথে দেখা করি। তারপর দোতলায় যাই, ভাবীর সাথে দেখা করি। তারপর ছোট ভাইয়ের ফ্লাটে যাই। শাবির, কিয়ানের সাথে দেখা করি। কথা বলি। এরপর আরিশ, রোহা'র সাথে দেখা করি। সবশেষে ছয় তলায় যাই, আমাদের ঘরে। ঘরে তুমি আছো, সুরভি আছে। তুমি তো আমাকে দেখেই চিৎকার করে দৌড়ে আসো। বাবা, বাবা এসেছে। বাবা।

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সকাল ১১:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


