somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯৮১ সালের ৩০শে মে, একটি নক্ষত্রের ঝরে পড়া, শোকে মূহ্যমান জাতি – পর্ব ১০

০৯ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৮১ সালের ৩০শে মে, একটি নক্ষত্রের ঝরে পড়া, শোকে মূহ্যমান জাতি – পর্ব ১০

------------------------------------------------ ডঃ রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)
Click This Link

৮ই নভেম্বর ১৯৭৫-এর দিনের ঘটনাবলী
বিভিষীকাময় রাতটি পার হওয়ার পর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সারা ক্যান্টনমেন্টে অফিসারদের মধ্যে গভীর আতঙ্কের ছায়া। জানা গেলো কে বা কারা সৈনিকদের উস্কে দিয়েছে, অগ্র-পশ্চাৎ ভালো-মন্দ বিবেচনা না করেই তারা নির্বিচারে অফিসারদের হত্যা করছে। অফিসারদের অপরাধ কি? তাদের একটাই অপরাধ, তারা অফিসার। আপন সেপাইদের কাছ থেকে অফিসাররা ছুটে পালাচ্ছে। কোন ইউনিটে, অফিসে, হেড কোয়ার্টারে অফিসার নাই। সবাই ছুটে পালাচ্ছে সেনানিবাস ছেড়ে। যে যেদিকে পারছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে। অনেক অফিসার স্টেশন হেড কোয়ার্টারে এসে ভীড় করলেন। এই অপ্রত্যাশিত হিংস্রতার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান অফিসাররা। তারা নিজেদের নিরাপত্তার ভয়ে যতনা ভীত ছিলেন তার চাইতে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে। এতো এতো সসস্ত্র সৈনিক (ও গণবাহিনীর সদস্য)-দের মধ্যে তারা নিরস্ত্র অফিসাররা। বহু অফিসারকে সৈনিকরা নাম ধরে খুজছিলো। অরাজকতার মধ্যে কে কাকে মারছে, ধরছে, লাঞ্ছিত করছে বোঝার উপায় নেই।

৭ই নভেম্বরে সংঘটিত সিপাহী-জনতার বিপ্লব ৮ই নভেম্বরে সম্পুর্ণ ভিন্ন আকার ধারন করলো। কর্নেল তাহের ও জাসদের ক্ষেপিয়ে দেয়া সৈনিকরা ও গনবাহিনীর কিলাররা অফিসারদের তাড়িয়ে ফিরছে। সেপাইরা অফিসারদের বাধ্য করলো তাদের কাঁধের রাঙ্ক নামিয়ে ফেলতে। কেউ রাঙ্ক পরতে পারবে না। অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে বিশ্বস্ততা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। অফিসাররা পরিবার পরিজন নিয়ে পালাতে লাগলো। অনেক সৈনিক কৌতুক ভরে এই দৃশ্য দেখছে, কেউ তাদের তাড়া করছে, আবার বেশিরভাগ বিবেকবান অনুগত সৈনিকই অফিসারদের সাহায্য করলো পালিয়ে যেতে। জিয়াউর রহমানের শ্যালক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইদ ইস্কান্দার সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যান। কর্নেল হামিদকে তাঁর সুবেদার কাজী ও হাবিলদার সিদ্দিক বললেন, "স্যার আপনি পালিয়ে যান।" তিনি রাজী হলেন না। বললেন, "না আমি যাবোনা, মারলে তোমারাই তো মারবে।" এই কথা শুনে সুবেদার কাজী ও হাবিলদার সিদ্দিক লজ্জায় মুখ ঢেকে বললো, "স্যার এটা কখনোই হতে দেব না। আমাদের লাশের উপর দিয়ে আপনাকে মারতে পারবে, তার আগে নয়।" আসলে বেশিরভাগ সৈন্যই বিবেকবান, অনুগত ও দেশপ্রেমিক ছিলো। মাত্র গুটিকতক ছিলো তাহেরের ক্ষ্যাপাটে, আর কিলারদের অধিকাংশই ছিলো গণবাহিনীর সদস্য। যারা ছিলো কোন একটি গভীর ষড়যন্ত্রের পুতুল হাতিয়ার।

ঐদিন সকাল আট-টার সময়ও কয়েকজন অফিসারকে হত্যা করা হয়। দুপুরের দিকে হত্যা করা হয় মেজর নুরুল আজিমকে। বলা হয়ে থাকে যে সারাদেশে নারীসহ সর্বমোট চল্লিশজন সেনা অফিসার নিহত হয়েছিলেন ঐ ঘটনায়।

এবার প্রশ্ন ওঠে সেই সময়ে কোথায় ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান? পুরো সেনানিবাস যখন আতংকগ্রস্ত, অফিসাররা সব ভয়ে পালাচ্ছে, সসস্ত্র বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনীর সদস্যরা যখন গুলিভর্তি খোলা অস্ত্র উঁচিয়ে আছে খুনের নেশায় অস্ত্র তাক করছে, সেইসময় একজন নিরস্ত্র ব্যক্তি সব ভয়-ভীতি ভুলে সৈনিকদের এই উন্মত্ততা থামানোর জন্য পাগোলের মত সেনানিবাসের সবখানে ছুটছেন। তিনি হলেন অকুতভয় সেনানায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম।

তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সৈনিকরা শুধু দাবি পেশ করছে, তাদের তখন কেবল দাবি আর দাবি। জিয়া বললেন, "তোমাদের সব দাবি আমি মেনে নেব, আগে তোমরা অস্ত্র জমা দাও।" (খান আতাউর রহমান পরিচালিত 'আবার তোরা মানুষ হ' নামক একটি সিনেমার শেষ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। সেখানে কলেজের সসস্ত্র ছাত্র আর পুলিশ যখন অস্ত্র উঁচিয়ে মুখোমুখী তখন নিরস্ত্র কলেজের অধ্যক্ষ সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, "ওরে তোদের সব দায়িত্ব আমি নেবো তোরা অস্ত্র নামা। যা আবার তোরা মানুষ হ।) জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটেছিলো বাস্তবে।

বেলা দশটার দিকে সৈনিকদের একটা বড় মিটিং হলো ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের গ্রাউন্ডে। সেখানে জেনারেল জিয়াকে আমন্ত্রন জানানো হলো। বেশ কয়েকজন বিপ্লবী সৈনিক ঐ উন্মুক্ত সভায় ভাষণ দেয়। ঐ মিটিং-এ প্রায় সবাই ছিলো সসস্ত্র। উল্লেখ্য যে সৈনিকদের সবাই সব অস্ত্র চালাতে জানেনা। সেইদিন অতি উৎসাহীরা সবরকম অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলো। আনাড়িদের হাতেও ছিলো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। ঐ সভাতেই একজন আনাড়ির হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হলো দুইজন সৈনিক, আহত হলো কয়েকজন। জিয়া বললেন, "তোমরাই দেখো, ডিসিপ্লিন না থাকলে কি অবস্থা হয়।"

আসলে তাহেরের উস্কানিতে একদল সৈনিক তখন হয়ে উঠেছিলো উশৃঙ্খল। তাদের উশৃঙ্খলতায় একদিকে যেমন অনেক নিরপরাধ অফিসারদেরকে প্রান দিতে হয় তেমনি সৈনিকরাও নিজেদের অস্ত্রে মারা পড়ে। শান্তি-শৃঙ্খলা বলতে কিছুই আর সেদিন সেনানিবাসে ছিলো না।

এরপরেও নতুন প্রজন্মের অনেকে প্রশ্ন করেন - 'তারপরও কর্ণেল তাহেরের এতো সুনাম কেন? তার এই অফিসার হত্যার বিষয় কী মিডিয়ায় আসেনি?'
উত্তরে বলতে পারি যে, নিরিহ নিরাপরাধ অফিসার হত্যার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবেই গণমাধ্যমে এসেছে। সেই সময় আমি ঢাকায়ই ছিলাম, খুব ছোট ছিলাম তাই স্পষ্টভাবে মনে না আসলেও কিছু-কিছু আমার নিজেরই মনে আছে। তবে সারা দেশে বিষয়টি জানাজানি হতে সময় লেগেছে। কারণ তখন প্রচার মাধ্যম দুর্বল ও মন্থর ছিলো। সবচাইতে শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম টেলিভিশন তখন সম্প্রচার হতো কেবল বড় কয়েকটি শহরে। তার উপর সেই দরিদ্র বাংলাদেশে টেলিভিশন ছিলোই হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ীতে। অর্থাৎ আমি টিভি সংবাদে যা দেখেছি, আমার ঠিক পাশের বাড়ীর ছেলেটিই তা দেখেনি। সংবাদপত্রই তখন ছিলো ভরসা, তাও ঢাকার বাইরে বড় শহরে সংবাদপত্র পৌছাতে সময় লাগতো। আর গ্রামে-গঞ্জে তো পৌছাতো কয়েকদিন পরে। উপরন্তু সামরিক বাহিনীর ভিতরের সংবাদ তখন খুব গোপন রাখার চেষ্টা করা হতো। পুরো বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে জানা গিয়েছে কয়েক বছর পরে। কর্নেল হামিদের লেখা বইয়ে ও আরো কয়েকটি বইয়ে। সুনাম-দুর্নাম বিষয়টি আপেক্ষিক। বামপন্থীরা মনে করে সমাজে উঁচু অবস্থানে থাকা লোকজন খারাপ তাদেরকে হত্যা করা জায়েজ আছে। তাই অনেকে বিষয়টিকে সাধুবাদই জানিয়েছে। তাদের কাছে কর্নেল তাহের হিরো। আবার মানবতাবাদীরা ভিন্নমত পোষণ করে। আবার বিচারের কাঠগড়ায় হত্যা হত্যাই। হত্যাকান্ডের বিচার হয়।


(কেন ঘটলো এই ঘটনা? কাদের এত আক্রোশ ছিলো আমাদের নিরাপরাধ অফিসারদের প্রতি? নাকি আমাদের দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দিতেই এটি ছিলো একটি গভীর ষড়যন্ত্র?)

(চলবে)

সাহায্যকারী সূত্রঃ
১। মিশ্র কথন - মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক।
২। দাসত্ব-এর ব্লগ
৩। তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা - কর্নেল এম এ হামিদ।
৪। সাতই নভেম্বর, জেনারেল জিয়া ও কর্নেল তাহের : নির্মল সেন
৫। ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন আর্টিকেল
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:২৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ কি আজন্ম পাপ?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬



রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আছে, জনগণের নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারটুকুও আমাদের নেই? সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকে। কিন্তু সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×