অন্ধকার আছে, আলোও আছে
------------- ড. রমিত আজাদ
এক ফেইসবুক ফ্রেন্ড খুব হতাশাজনক একটা পোস্ট দিয়েছেন। তাই দেখে মনটা খারাপ হলো। আসলে মনে কষ্ট পেলে এরকম পোস্ট দেয়াটাই স্বাভাবিক। যারা হঠাৎ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তাদের জন্য একটা ক্ষুদ্র ঘটনা শেয়ার করছি।
অনেকগুলি বছর আগের কথা, তখন ইউক্রেইনে পড়ালেখা করছি। নব্বই-এর সেই উত্তাল দিনগুলোতে ওখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ ছিলো। শহরে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন অঘটন ঘটে। জবাবদিহীতার বালাই নেই, তাই দুষ্ট লোকেরা যা খুশী তাই করে। দিনের বেলায়ও অনেক সময় অপরাধ সংঘটিত হতো, আর সূর্যাস্তের পর তো কথাই নেই। এরকম এক সন্ধ্যায়, ডরমিটরীতে আমার রূমের দুই রূম পরে একটি রূমে গেলাম আমার ইয়েমেনী সিনিয়র ফ্রেন্ড আলীকে কিছু বলতে। উনার রূমে দরজা নক করে কোন সাড়া পেলাম না, বুঝলাম রূমে উনি নেই। ফিরে আসবো, এ সময় হুড়মুড়িয়ে ঐ ব্লকে (দুই রূম মিলিয়ে একটি ব্লক) ঢুকলো দুই তরুণী। আলীর পাশের রূমে নক করলো তারা। সেখান থেকেও কোন সাড়া আসলো না। এবার আমি ওদের দিকে তাকালাম, ওদের একজনকে আমি চিনলাম। ঐ রূমে ঝেনিয়া নামে এক ছেলে থাকতো, তার বড় বোন, ঐ তরুণীও আমাদের ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। আমি বললাম, "ওরা বোধহয় নেই।" তরুণীটি আমাকে চিনলো, আগে দু'একবার দেখেছে আমাকে, তবে করিডোরে দাঁড়িয়ে 'হ্যালো কেমন আছো?'-র বেশী কথা কখনো হয়নি। সে আমাকে বললো, "আপনার রূমে কি একটু বসতে পারি?" ওদের আচরণে মনে হলো ওরা খুব শংকিত বা কোন একটা ঝড় চলে গিয়েছে এই মাত্র ওদের উপর দিয়ে। আমি বললাম, "চলুন।"
ভাগ্যের কল্যাণে আমি একা এক রূমে থাকতাম। তাই ঝামেলা ছিলো কম। ওদের রূমে এনে বসালাম। কফি দিলাম। টিভি সেট অনই ছিলো। টিভি দেখতে দেখতে, কফি খেতে খেতে ওরা কিছুটা ধাতস্থ হলো। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আপনাদের কি হয়েছে?" এরপর ওরা হরবর করে বললো যে, ওরা নিজ ডরমিটরী থেকে বেরিয়ে (ওদের ডরমিটরীটা আমাদেরটা থেকে শ'দুয়েক মিটার দূরে হবে, দুজনই আমাদের ইউনিভার্সিটির ছাত্রী) কোথাও যাচ্ছিলো, হঠাৎ দু'জন বজ্জাত ওদের দিকে তেড়ে আসে, আক্রমণ করতে চাইছিলো বা টেনে-হিঁচড়ে কোথাও নিয়ে যেতে চাইছিলো এমন। ওরা তাড়াতাড়ি আশ্রয়ের জন্য আমাদের ডরমিটরীর দিকে পালিয়ে আসে, যেহেতু ছোট ভাই এখানে আছে। তারপরেও ওরা ভিত ছিলো যদি বজ্জাতগুলো এই ডরমিটরীতে চলে আসে বা নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে! আমি বললাম, "হ্যাঁ, এরকম তো এখন প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। সাবধান থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। যাহোক, এখন তো আপনারা এখানে, আর ভয় নাই।"
একটু পরে ইয়েমেনী আলী এলো আমার রূমে। ওদের দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। আমি সবকিছু বললাম। সেও খুব সিমপ্যাথী দেখালো। আলী খুব মিশুক ছিলো। তরূণীদের কাছে আরো বেশী মিশুক! দ্রুত ওর রূমে চায়ের পাশাপাশি আরো কিছু নাস্তার ব্যবস্থা করলো। তারপর শুরু হলো জমিয়ে আড্ডা। মনে হলো এই সন্ধ্যায় নয়, আমরা অনেক আগে থেকেই পরিচিত। গল্পগুজব হাসি-ঠাট্টা করে সুন্দর একটা সন্ধ্যা কাটলো। পরিশেষে তরূণীরা বললো, "ভেরী ইন্টারেস্টিং! দুই-একটি বজ্জাতের তাড়া দিয়ে প্রবল শংকার মধ্য দিয়ে সন্ধ্যাটা শুরু হয়েছিলো, আর তার পরপরই পরিচয় হলো দুজন সজ্জনের সাথে। এই পৃথিবীতে খারাপ মানুষের পাশাপাশি ভালো মানুষও আছে!"
তাই বলি, কেউ যদি আপনার মনে কোন আঘাত দিয়ে থাকে, এতে একেবারে মুশড়ে পড়বেন না। অনেকেই আছে যারা আপনার বন্ধু, আপনার একান্ত শুভাকাঙ্খী! এরা অনেক সময় চেনাও হয়, অচেনাও হয়। অসুর-হিংসুটে মানুষগুলো আপনার পৃথিবীটাকে যেমন বেসুরো-অসুন্দর করে ফেলে, তেমনি শুভ-সুজন মানুষগুলো আপনার পৃথিবীটাকে সুর-ছন্দে ভরে দিয়ে সুন্দর করে তুলতে পারে।
এই পৃথিবী বৈপিরিত্যে ভরপুর।
এখানে যেমন শত্রু আছে, তেমনি মিত্রও আছে,
ঘৃণা আছে, ভালোবাসাও আছে,
বেসুরো কর্কশতা আছে, সুরের ঝংকারও আছে,
অন্ধকার আছে, আলোও আছে,
দুঃখ আছে, সুখও আছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




