
কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ পর্ব ৪
---------- ড. রমিত আজাদ
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
(কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ - পর্ব ১, ২, ৩)
আগেই বলেছি স্কুলে কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ তেমন কিছুই হতো না। আমাদের পাড়ায় আমরা শিশুরা আনন্দের জন্য যেটা করতাম তা হলো স্কুল থেকে আসার পর পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলতাম। শীতকালে সামান্য ক্রিকেট খেলা হতো। এক সিজনে ঘুড়ি উড়াতাম। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়াবান্ধা, কাবাডি খেলতাম। একবার এক বাংলা জানা বিদেশীকে কাবাডি খেলাটা বুঝাচ্ছিলাম তিনি কিছুদূর শুনে আমাকে প্রশ্ন করলেন, "বুঝলাম মাঠের দুইপাশে দুইদল থাকে, তারপর একদল ছুটে আসে, কিন্তু বলটা কোথায় থাকে?" তার প্রশ্ন শুনে আমি তো হাসতে হাসতে শেষ। কিন্তু পরে আমার মনেও প্রশ্ন জাগলো দাঁড়িয়াবান্ধা, কাবাডি, কুতকুত, ডাঙ্গুলি এইসব ইনস্ট্রুমেন্ট বিহীন খেলা কি করে প্রচলিত হলো আমাদের দেশে? পরে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালাম নিজের মনে, খুব সম্ভবত ইংরেজ আমলে নিজ ভূমে আমরা এমনই দরিদ্র হয়ে পড়েছিলাম যে সামান্য বল বা সরঞ্জাম কেনার টাকাও ছিলোনা, তাই বাধ্য হয়েই সরঞ্জামবিহীন এইসব খেলা প্রচলিত হয়। যাহোক ছুটকা-ছাটকা যা আমরা পাড়ার মধ্যে খেলতাম সেইসব খেলার মানও খুব ভালো ছিলো না, নিজেরা নিজেরা খেলতাম আর খেলা নিয়ে মনোমালিন্য হয়ে মাঝে মাঝে বন্ধুরা বন্ধুরা মারামারি করতাম, কথা বলা বন্ধ করে দিতাম, ইত্যাদি। শিশুদের দৈহিক-মানসিক গঠনে সৃষ্টিশীল কোন উদ্যোগ নিতে পাড়ার মুরুব্বীদেরকেও দেখিনি।
তখন ১৯৭৯ সালে ঘোষিত হলো বিশ্ব শিশুবর্ষ, আর তার পরপরই সরকারী উদ্যোগে ১৯৮০ সালে ঘোষিত হলো বাংলাদেশ শিশুবর্ষ। সারাদেশে নানা আয়োজন নানা তোড়জোড়, সবাই একটা উৎসাহ পেলো। আমাদের পাড়ার বয়োজ্যোষ্ঠ বড় ভাইয়েরা (যারা তখন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে পড়তেন) সিদ্ধান্ত নিলেন একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করার। (তার কিছুকাল আগে আমাদের পাশের পাড়ায় মুরুব্বীদের উদ্যোগে একটা ক্লাব হয়েছিলো, কিন্তু তা টেকেনি বেশীদিন, নিজেরা নিজেরা কলহ করে ওটা আবার ভেঙেও দেয়।) তবে আমাদের পাড়ার ভাইয়েরা ইনডিপেনডেন্ট কোন ক্লাব না করে কোন সংগঠনের শাখা খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। করা হলোও তাই, 'চাঁদের হাট' নামে একটা শিশু সংগঠন ছিলো তখন, তারই শাখা খোলা হলো। আমরা শিশুরা মহা উৎসাহে তার মেম্বার হলাম, মুরুব্বীরা চাঁদা দিয়ে সহযোগীতা করলেন। এবার সাংগঠনিকভাবে কাজ শুরু হলো। আমাদের ফুটবল খেলা শুরু হলো বিকালে টাইম মাফিক, বড় ভাইয়েরা এলেন প্রশিক্ষণ দিতে। তারপর শুরু হলো ড্রীল, এক বড় ভাই মহা উৎসাহে আমাদের ড্রীল শেখাতেন, আরো শিখানোর চেষ্টা করতেন শৃঙ্খলা। ভুল করলে তিনি খুব ধমক-ধামক দিতেন আমাদের। জীবনে প্রথম ড্রীল ওখানেই শিখেছিলাম।
একটা ওয়াল ম্যাগাজিন করা হলো। নাম দেয়া হলো 'ঢাক-ঢোল'। পাড়ার যে যা পারে লেখা দিলো, সেই লেখা লিখে পাড়ার এক দেয়ালে টাঙানো হলো। অভিভাবকরা দেখে বললেন, 'হু, সুন্দর হয়েছে, সাবাশ!' পাড়ার কয়েকটি পুকুরে কচুরীপানা জমে মশার উৎকৃষ্ট খামার তৈরী হয়েছিলো, সবাই মিলে ঝাপিয়ে পড়ে সেই পুকুরগুলো সাফ করে ফেললাম। মশাদের উৎপাত কমে গেলো।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে মাঠে ফিল্ম দেখানোরও আয়োজন করা হলো। রাতের বেলা প্রজেক্টর এনে পর্দা টাঙিয়ে ফিল্ম দেখানো হলো। খোলা মাঠে মাটিতে বিছানো ত্রিপলে বসে আমরা মহাআনন্দে সেই ফিল্ম দেখলাম।
এরপর সিদ্ধান্ত হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের। শুরু হলো প্র্যাকটিস, গান-নাচ-কবিতা যে যা পারে। একটা খুব পজিটিভ জিনিস লক্ষ্য করলাম, বড়দের মধ্যে যাদের মাস্তানী টেন্ডেসী ছিলো তারাও ওসব ছেড়ে দিয়ে ভদ্র হয়ে ক্লাবের কাজে লেগে গেলো। তারাও সংস্কৃতিমনা হয়ে গেলেন। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠান শুরু হলো, আমাদের সে কি উৎসাহ! অতিথী হয়ে এলেন শিশুদের অতি প্রিয় ব্যাক্তি রোকনুজ্জামান দাদা ভাই। সেই সময় গুণী লোকজনের সম্মান ছিলো, তাঁদেরকেই প্রধান বা বিশেষ অতিথী করা হতো। অনুষ্ঠানের কোরাস গানটি এখনো মনে পড়ে, 'তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে'। সেই গান আমাদের রক্তে আগুন জ্বালাতে শুরু করে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করেই পারছি না। আমাদের ক্লাবের মূল উদ্যোক্তা ও পরিচালক ছিলেন আবুল ভাই (ছদ্মনাম), কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন আহবায়ক হিসাবে নাম ঘোষণা করা হলো গণি ভাইয়ের। গণি ভাই-ই মঞ্চে বক্তৃতা দিলেন ও প্রধান অতিথির পাশে বসলেন। আমি অবাক হয়ে স্টেজের পাশে দাঁড়ানো আবুল ভাইয়ের দিকে তাকালাম, "আপনি যাবেন না?" উনি আমার দিকে তাকিয়ে লাজুক হেসে বললেন, "নাহ! আমাকে কি মানায়?" পরবর্তিতে বুঝতে পেরেছিলাম, আবুল ভাই লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন না, পরিচয় দেয়ার মত অত ব্রিলিয়ান্ট ছিলেন না। পক্ষান্তরে গণি ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন, সুবক্তা ছিলেন, স্মার্ট ছিলেন। প্রধান অতিথী যেন দেখে চমৎকৃত হয় এমন একজনকেই সবাই মিলে আহবায়ক হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন (আজকাল যেখানে দেখি মেধাবীদের হটিয়ে দিয়ে ফাউলরাই সংগঠনের চেয়ারে বসে)।
এই ঘটনাগুলো আমার ও আমার বন্ধুদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলো এবং স্পোর্টস ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করেছিলো। আমরা আরও উৎসাহ নিয়ে শুরু করলাম ফুটবল ও ড্রীল প্র্যাকটিস, সংস্কৃতি চর্চা।
বেঁচে থাক কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ।
(চলবে)
(ছবি আকাশজাল থেকে নেয়া)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০১৬ সকাল ১০:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


