somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিল্লী কা লাড্ডু - পর্ব ১২

১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
দিল্লী কা লাড্ডু - পর্ব ১২
--------------------------- রমিত আজাদ



(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

আনিতা হিন্দী ইংরেজী দুটোতেই দক্ষ ছিলো। তবে হাসানের সাথে ও মূলতঃ ইংরেজীতেই কমুনিকেট করতো। হিন্দী-ঊর্দু দুটা ভাষাই হাসান খুব ভালো বোঝে। এই নিয়ে হাসানের মধ্যে হেলা বা আলিঙ্গন কোনটাই নেই। ভাষা তো আর কোন ব্যাক্তি নয় যে তার সাথে শত্রুতা করতে হবে। ভাষা অবুঝ ও নিরেট কিছু একটা; আরো ভালোভাবে বললে, একেবারেই এ্যাবস্ট্রাক্ট! বহুভাষাবিদ পন্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, "এক একটি ভাষা শেখা মানে, মনের এক একটি চোখ খোলা"। বাংলা সাহিত্যের আর এক কিংবদন্তী ড. সৈয়দ মুজতবা আলীও ছিলেন একজন বহুভাষাবিদ পন্ডিত। শোনা যায় যে, আসর জমিয়ে রাখতে উনার সমতুল্য কবি নজরুল ছাড়া আর কেউ ছিলো না।

দিল্লীর ইন্ডিয়া গেইট চত্বরে রূপসী সুনিতার পাশে দাঁড়িয়ে হাসানের বারবার মনে পড়ছে আর এক মায়াবিনী ও অপ্সরী আনিতার কথা। যদিও পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। তাও কিছুই মুছে ফেলা যাচ্ছেনা স্মৃতি থেকে! এমনকি একটুও ফিকে হয়নি সেই স্মৃতি! বিদেশে পড়তে গেলো হাসান। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। ঐদেশে ১ম সেপ্টেম্বর হলো 'এডুকেশন ডে'। প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐদিনই ফল সেমিস্টারের প্রথম ক্লাস শুরু হয়। তাই ঐটাই এ্যাকাডেমিক ইয়ারের প্রথম দিন। তবে হাসান-রা প্রথমে ভর্তি হয়েছিলো প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় কোর্সে, যার অপর নাম প্রিপারেটরি কোর্স। এটা ছিলো শুধুই রুশ ভাষা শিক্ষার জন্য। কারণ ক্ষেত্রফলের দিক থেকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঐ দেশটির পড়ালেখা রুশ মিডিয়ামে। তাই যে কোন বিদেশীকেই শুরুতে রুশ ভাষা শিক্ষা করতে হবে, এক বৎসর। তারপর যার যার সাবজেক্ট অনুযায়ী আবারো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে দেয়া হবে।

হাসানের এখনো মনে পড়ে, কয়েকটা দিন পার হয়েছে ক্লাস বিহীন। তারপর একদিন ডরমিটরি-তে এসে ফ্যাকাল্টি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলো, কাল থেকে পরীক্ষা শুরু হবে, প্রস্তুত থাকো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হবে এই নিয়ে খুব এক্সাইটেড ছিলো হাসান। ক্লাস মানে একটা বড় শ্রেণীকক্ষ, সেখানে ত্রিশ-চল্লিশজন ছাত্রছাত্রী থাকবে, সামনে একটা ব্লাকবোর্ড, সেখানে দাঁড়িয়ে শিক্ষক ক্লাস নেবেন -এও তো ছিলো ক্লাস সম্পর্কে হাসানের ধারণা। কিন্তু পরদিন হাসানকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো, সেটি একটি ছোট রুম। সেখানে পাশাপাশি তিনটা টেবিল পাতা, টেবিলের ওপাশে সাত-আটটি চেয়ার পাতা, এপাশে একটি চেয়ার পাতা, সামনে একটি সবুজ রঙের বোর্ড। তাছাড়া কামড়ার একপাশে বিশাল উঁচু ক্যাবিনেট রাখা আছে। ভিতরে হয়তো বইপত্র আছে। আর শো-কেসে কিছু ডেকোরেশন পিস রাখা আছে। কামড়ার ভিতর প্রথমে প্রবেশ করলো হাসান, তারপর চারজন আরব ছেলে, তারপর দুজন সাউথ আমেরিকান ছেলে ও মেয়ে। সাউথ আমেরিকান মেয়েটিকে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের মিক্সড মনে হলো। সবাই টেবিলের একপাশে বিভিন্ন চেয়ারের সামনে দাঁড়ালো। তারপর প্রবেশ করলেন টিচার। একজন শিক্ষিকা। প্যান্টশার্ট পরিহিতা দীর্ঘাঙ্গীনী শিক্ষিকা-কে ভীষণ স্মার্ট মনে হলো! তিনি কামড়ায় ঢুকে চোস্ত ইংরেজীতে কথা বলতে শুরু করলেন। হাসানের ধারণা ছিলো যে, এই দেশের লোকেরা ভালো ইংরেজী বলতে পারে না, সেই ধারণা এক লহমায়ই ভেঙে দিলেন তার শিক্ষিকা। সবাইকে তিনি বসতে বলে জানালেন যে, তিনিই এই গ্রুপের রুশ ভাষা শিক্ষিকা। আরো কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমাদের ক্লাস নেবেন তবে তারা ফিজিক্স, কেমিস্ট্রী, গণিত, ইত্যাদি ক্লাস নেবেন; কিন্তু এই কোর্সের মুখ্য উদ্দেশ্য যেহেতু রুশ ভাষা শিক্ষা; তাই তিনিই আমাদের মূল শিক্ষিকা এবং আমাদের ক্লাস টাইমের বেশীরভাগ সময় তার সাথেই কাটবে। স্মার্ট ও অমায়িক শিক্ষিকার মনোমুগ্ধকর লেকচার হাসান বিমোহিত হয়ে শুনছিলো। পাশাপাশি লক্ষ্য করলো যে, উনার লেকচারের সমঝদার শ্রোতা একমাত্র হাসানই। পরে কারণটা বুঝেছিলো যে, আরবরা ইংরেজী বোঝে কম, আর সাউথ আমেরিকান দুজন ইংরেজী বোঝেই না! তাই বাকীরা উনার কথা ভালো ক্যাচ করতে পারছিলো না। হাসান ভাবলো, এই গ্রুপে সে একাই বাংলাদেশী, প্রতিবেশী দেশগুলোরও কেউ নেই; নিজেকে কেমন একা একা মনে হলো হাসানের! মিনিট পনের পরে দরজায় নক করার শব্দ পাওয়া গেলো। ম্যাডাম "ইয়েস কাম ইন" বলার পর পরই পৌরাণিক যুগের এক দ্রৌপদী প্রবেশ করলো কামড়ায়। হাসান বুঝে নিলো যে, তরুণীটি ভারতীয়। তরুণ হাসান যেমন পলক হীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে তাতে আর বুঝতে বাকী রইলো না যে, ঐ রূপসীর রূপের বর্ণনা করতে অনেক সময় লাগবে ও যথেষ্ট পরিমানে বিশেষ্য-বিশেষণ ব্যবহার করতে হবে। আপাততঃ শুধু এটুকুই বলা যায় যে, জানালার বাইরে উত্তুঙ্গু ককেশাস পাহাড়ের পটভূমিকায় কালো চোখ, কালো চুলের সুলোচনা তরুণীটিকে ঊর্বশীর সাথে তুলনা করলে কম হবে না!



বাংলাদেশী মেয়েদের চাইতে ভারতীয় মেয়েরা বেশী ফাস্ট এরকম একটা ধারনা সেই সময়ে (মানে হাসানের ছাত্রজীবনে) প্রচলিত ছিলো বাংলাদেশে। যদিও 'ফাস্ট' শব্দটিকে নানাভাবেই ইন্টারপ্রেট করা যায়। দস্তুর ইউরোপীয় পোষাক আশাক পড়া, মুখে চোস্ত ইংরেজীওয়ালা নব্বইয়ের দশকের আনিতা ফাস্ট ছিলো কি স্লো ছিলো সেই আলোচনা পরে করা যাবে। আপাততঃ তার অলমোস্ট রেপ্লিকা সুনিতায় ফিরে আসি।

সুনিতাকে নিয়ে হাসান যখন বেড়াচ্ছিলো ইন্ডিয়া গেইট চত্বরে, তেমন ইমপ্রেসিভ কিছুই মনে হয়নি হাসানের! হাসানের মনে পড়ে যে, তার বড় বোন আশির দশকে ইন্ডিয়া ভ্রমণ করেছিলেন। ফিরে এসে তিনি যখন ভারত ভ্রমণের গল্প করছিলেন, তখন ঘরের লোকজন তো অবশ্যই প্রতিবেশীরাও খুব মনযোগ দিয়ে শুনছিলো সেই বিদেশের গল্প। বাংলাদেশে তখনও কোলকাতা ক্রেজ ছিলো। তার উপরে হাসানের বড় বোন দিল্লী, আগ্রা, কাশ্মীর সব ঘুরে এসেছেন! সকলের মনে হলো যে, তিনি চাঁদে ভ্রমণ করে এসেছেন! কয়েকটা এ্যালবাম ভর্তি রঙিন ছবি নিয়ে এসেছিলেন তিনি। সেখানে ইন্ডিয়া গেটের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলো শিশু হাসান। কিন্তু এরপর পেরিয়ে গেছে বহু বছর। গঙ্গা-হুগলী দিয়ে যেমন জল গড়িয়েছে, পদ্মা-মেঘনা দিয়েও তেমন জল গড়িয়েছে বিস্তর! বৃটিশ আমলে জৌলুস হারানো ঢাকার জৌলুস দিন দিন শুধু বেড়েছেই! যে দেশের মানুষ দিল্লী যাওয়াটাকে চাঁদে যাওয়া মনে করতো, সেই বাংলাদেশীরাই ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বে। লন্ডন থেকে নিউ-ইয়র্ক, মস্কো থেকে টোকিও, সিউল থেকে বেইজিং, কোথায় নেই তারা? হাসানের বড় বোন বেড়াতে গিয়েছিলেন দিল্লী, ছোট ভাই হাসান লেখাপড়া করেছে ইউরোপে! বাংলাদেশীরা এখন ভারত ভ্রমণ-কে আর কোন গোনায় ধরেনা! কোলকাতা ক্রেজ নামক কোন ক্রেজ এখন আর ঢাকায় নেই!



ইন্ডিয়া গেইটের পিছনে ফোয়ারাবেস্টিত একটি জলাধারের মাঝখানে একটি ক্যানোপী আছে। শোনা যায় বৃটিশ শাসনামলে এখানে রাজা পঞ্চম জর্জের মূর্তি ছিলো। স্বাধীনতার পর তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আচ্ছা ইন্ডিয়া গেইট তো একটা কনভার্শন! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে নিহত ৯০,০০০ বঙ্গ-ভারতীয় সেনা জওয়ানদের স্মৃতিরক্ষার্থে এই স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়। স্বাধীনতার পর ইন্ডিয়া গেটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর "অনামা সৈনিকদের সমাধি" হিসেবে পরিচিত করে তোলা হয় ও স্থাপন করা হয় "অমর জওয়ান জ্যোতি"। এবার প্রশ্ন ঐ নব্বই হাজার সৈন্যের বলীদান কি তাহলে মিথ্যে হয়ে গেলো? হতে পারে তারা প্রফেশনাল সোলজার ছিলো, বেতনের বিনিময়ে যুদ্ধ করেছিলো, কিন্তু তারা যে আত্মোৎসর্গ করেছিলো এটা তো মিথ্যে নয়! তাহলে তাদের স্মৃতি রক্ষা আর হবে না? কি জানি, ইতিহাস বড়ই তালগোলে! ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে ভ্যালুজগুলোও পাল্টে যায়! সবকিছুই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়!



ক্যানোপীর পিছন দিক থেকে হেটে হেটে ঘুরে এসে, আবার বড় রাস্তার সামনে দাঁড়ালো হাসান। আরেকটা অটো ভাড়া করতে হবে। টাকা কাউন্ট করার জন্য হাসান পকেটে হাত দিলো। টাকা গুনে হাসানের মনটা অন্ধকার হয়ে গেলো! হাসানের মনে হলো ঐ বাটপার অটোওয়ালাকে সে দুশো রূপী দেয়নি, দু'হাজার রূপী দিয়েছিলো। দুশো রূপী আর দু'হাজার রূপীর নোট দেখতে একই রকম! একই রঙ, তাই হাসান কনফিউজড হয়েছে! এখানকার টাকার নোটগুলি খুবই কনফিউজিং! নানান রঙের, নানান আকৃতির, নানান অংকের নোট আছে! সবই চলে! অটোওয়ালা ব্যাটা তো বিশাল বাটপার! সে তো দেখেছে যে এটা দুশো রূপী না, দুহাজার রূপীর নোট, সে তো কারেকশন করে দিতে পারতো! একটা লোকের এত বড় লোকশান সে করিয়ে দিলো! এবার সুনিতার উপর রাগ ঝাড়লো হাসান, ঘটনাটা বলে সে সুনিতাকে বললো, "তুমিই বা কেমন? আমাকে একটু হেল্প করতে পারলে না? ফট করে অটো থেকে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলে? আমি তোমাদের দেশে একজন ভীনদেশী, এসব ব্যাপারে আমি তো কিছুটা কনফিউজিং হতেই পারি! তোমার কি উচিৎ ছিলো না, আমাকে হেল্প করা?" সুনিতা তো রীতিমত অবাক!
সুনিতা: ভুল করলে তুমি, রাগ করছো আমাকে?!
হাসান: তোমাকে রাগ করবো না, তো কাকে রাগ করবো?
সুনিতা: নিজে ভুল করে এখন আমার উপর রাগ করছো, আশ্চর্য্য!
এ' পর্যায়ে হাসানেরও একটু মায়া হলো! তাইতো ভুলটা তো তারই। সুনিতা বেচারীর উপর সে রাগ ঝাড়ছে কেন? কিন্তু মেজাজ ঠান্ডা হলো না তার।

হাসানের এবারের গন্তব্য, গতকালের ঐ এ্যাম্বেসী। সেখানে যেতে হলে সামনের বড় রাস্তাটি পার হয়ে, আরেকটি রাস্তায় গিয়ে অটো ধরতে হবে। হাসান রাস্তা পার হওয়ার জন্য সিগনালের সামনে দাঁড়ালো, রেড লাইট জ্বললে সে রাস্তা পার হবে, অথবা ট্রাফিক কমে গেলেও রাস্তা পার হওয়া যায়। একটু পরে দেখলো যে, ট্রাফিক কমে আসছে। এসময় সে রাস্তা পার হবার জন্য যেই পা বাড়িয়েছে, ফট করে একটা অটো এসে হাসানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। চালক বললো, "কাহা যায়েগী?" মেজাজ আরো গরম হয়ে গেলো হাসানের! ঢাকার মতই বেত্তমিজ দিল্লীর চালকগুলো, মনে মনে ভাবলো, 'গাধার ব্যাটা, আমি কি হাত তুলেছি? তোকে থামতে ইশারা করেছি? তুই ফট করে আমার সামনে থামিয়ে আমার রাস্তা পার হওয়াটা আটকালি কেন?' মেজাজ তিরিক্ষী হওয়ায় হাসান চড়া গলায় সোজা বাংলায় বলে বসলো, "ব্যাটা, আমি এইখানে দাড়াইলাম, রাস্তা পার হওয়ার জন্য। তুমি ফট করে থামাইলা কেন? আমি কি থামাইতে বলছি? এখন রাস্তা পার হবো কিভাবে?" অটোওয়ালা বাংলা কিছুটা বুঝলো মনে হয়। তারপর বললো, "ঠিক হ্যাঁয়, তো পার হও।"

গটগট করে রাস্তা পার হয়ে গেলো হাসান। পিছনে পিছনে আসতে লাগলো সুনিতা। ওপাশে গিয়ে একটা ফুটপাথের উপর দাঁড়ালো হাসান। সুনিতা বললো, "তুম আভ কাহা যায়েগী?"
হাসান: উয়ো এ্যাম্বেসী যাউঙ্গা। 'ভাসান্ত ভিহার'।
সুনিতা: ঠিক হ্যায়। তুম যাও এ্যাম্বেসী। ম্যায় তো 'ভাসান্ত ভিহার'-মে হিই রহতা হু। হামকো ছোড় দো, মেরা মাকাম পর।
হাসান: (উদাস বদনে বললো) ঠিক হ্যাঁয়।



হাত তুলতে একজন মাঝ বয়সী শিখ চালক অটো থামালো। হাসান বললো যে সে 'ভাসান্ত ভিহার' যেতে চায়, কত নেবে চালকটি। চালকটি বললো, "মিটার-মে জো আয়েগা, ওহিই লেউঙ্গা"। ভালো প্রস্তাব! দরদামের দরকার নাই। মিটারে মাপা যা আসবে তাই, গুড। অটোতে উঠে বসলো হাসান আর সুনিতা। চলতে শুরু করলো অটো। হঠাৎ হাসানের মনে খটকা লাগলো, ঢাকার মত আবার মিটারে না বাটপারি করে বসে! এদিকে হাসান আর সুনিতা কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছে না। কিছুক্ষণ পর মন শান্ত হলো হাসানের। আড়চোখে সুনিতার দিকে তাকালো। মেয়েটির মুখভাব দেখে মনে হলো, খুব অভিমান হয়েছে তার! এবার হাসানের মন খারাপ হয়ে গেলো। আহারে এই বিঁভুয়ে মেয়েটা নিজ থেকে এসেছে তাকে হেল্প করতে, আর তার উপরই রাগ ঝাড়লো হাসান! কিন্তু কেন জানি হাসানের মন পুরোপুরি গলছিলো না!



কিছুক্ষণ পর
হাসানের মনে হলো যে, অটোওয়ালা অনেক সময় নিচ্ছে, গতকাল যখন এই পথে ফিরেছিলো এত তো সময় লাগেনি!
হাসান: তুম সহি রাস্তা সে যা রাহি হ্যায়?
অটোওয়ালা: হাঁ, হাঁ, বিলকুল সহি!
হাসান: মেরা তো লাগতা হ্যাঁয়, ইয়ে সহি রাস্তা নেহি হ্যাঁয়। এতনি টাইম কিউ লাগতা হ্যাঁয়?
অটোওয়ালা: এহি হি সহি হ্যায়।
হঠাৎ হাসান খেয়াল করলো, এমন একটা রাস্তা যেটা সে গতকাল দেখেনি! দুপাশে ভাঙাচোরা দোকানপাট, নয়াদিল্লীর রাস্তাঘাট তো এমন নয়! এটা ওল্ডদিল্লীর মত লাগছে!
হাসান: ইয়ে কেয়া নিউদিল্লী হ্যাঁয়?
অটোওয়ালা: ও হো হো! ইয়ে বাত? তো বাতাউ, উস রাস্তাপে জ্যাম হ্যাঁয়, তো শর্টকাট রাস্তে মে আপ কো লে যাতা হু!
হাসানের মেজাজ আরেক দফা খারাপ হয়ে গেলো! সে যা ভেবেছিলো তাই হচ্ছে নিশ্চয়ই! শর্টকাটের অজুহাতে ব্যাটা নিশ্চয়ই ঘুরাচ্ছে, যাতে মিটারে ভাড়া বেশী আসে।
হাসান: তুম খামোখা ঘুমাতে তো নেহি হ্যাঁয়?
অটোওয়ালা: খামোখা কিউ ঘুমাউঙ্গা?
এবার হাসান মেজাজ খারাপ করে বাংলায় বলা শুরু করলো।
হাসান: আচ্ছা আচ্ছা যাও যাও। যেই পথেই যাও, আমাকে ভাসান্ত বিহার পর্যন্ত পৌঁছে দাও তাহলেই হবে।
অটোওয়ালা হাসান-কে অবাক করে দিয়ে বাংলায় বলতে শুরু করলো।
অটোওয়ালা: যাচ্ছে তো, হামি তো যাচ্ছেই। ঠিকঠাক যাচ্ছে। ভাসান্ত বিহার আপনাকে পৌছ দেব।
লে হালুয়া! এ ব্যাটা পাঞ্জাবী হয়েও তো দেখি ভালো-ই বাংলা বলছে!
একটু পরে পরিচিত পথ দেখতে পেলো হাসান। বাম পাশে ঝকঝকে দেয়াল, তার পাশে কোন ফরেস্ট পার্ক-টার্ক হতে পারে, সেখানে শুধুই কাঁটা গাছ। সুনিতাকে জিজ্ঞেস করলে জায়গার নাম বলে দেবে। কিন্তু হাসানের মন এখনো গলেনি। ডান পাশে মনে হলো উঁচু কোন রাস্তা, তারপর দেখলো একটা মেট্রো চলে গেলো রাস্তার উপর দিয়ে। হ্যাঁ, এটা মেট্রোর রাস্তা। একপাশে ফরেস্ট পার্ক, আরেক পাশে ঝকঝকে মেট্রোর প্রায় নিঃশব্দ চলাচল। রোমান্স উর্দ্রেক হতে হতেও হলো না হাসানের মনে।



ভাসান্ত বিহারের প্রবেশমুখটা চিনতে পারলো হাসান। সেখানে অর্ধেক রাস্তায় 'রোড ব্যারিকেড' দিয়ে বড় বড় করে লেখা Delhi Police। দিল্লীর অনেক জায়গাতেই সে এই জাতীয় ব্যারিকেড দেখেছে। এখানে ডান পাশ দিয়ে ঢুকলে সুনিতাদের বাড়ী। সুনিতাকে এখানে নামিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু ও নামার কথা কিছু বললো না। হাসানও চুপ করে রইলো। তবে মনে মনে খুশী হলো যে, সুনিতা আরো কিছু সময় তার সাথে থাকবে!

একটা পার্ক পার হলো, তারপর ভাসান্ত বিহারের ই ব্লক। সেখানে ই-ব্লক মার্কেট, ওর বাঁ পাশের রাস্তা দিয়ে সোজা গেলে এ্যাম্বেসীটা পাওয়া যাবে। অটো ই-ব্লক মার্কেটের কাছে আসতে সুনিতা বললো, "রুখো ইহাসে"। অটো থামলো, হাসান বললো, "এ্যাম্বেসী তো থোড়া আগে।" সুনিতা বললো, "মেরা এক কাম হ্যায় ইহাপে। অটো ইহাপে ছোড় দো।" হাসান তাই করলো। মিটার অনুযায়ী ভাড়া দিতে গিয়ে দেখলো, দরদাম করে যা ভাড়া হয়, তার চাইতে বেশী আসলো মিটারের ভাড়া। হাসান সিদ্ধান্ত নিলো, যে কয়দিন দিল্লী-তে আছে আর মিটারে ভাড়া করবে না, কন্ট্রাক্টেই যাবে।

সুনিতা: তুম দো মিনিট ইন্তেজার করো। ম্যায় আতা হু।
হাসান খেয়াল করলো যে, সুনিতা ই-ব্লক মার্কেটের উল্টা দিকে একটা একতলা ঘরের ভিতর ঢুকলো। তাকিয়ে দেখলো ওখানে লেখা আছে, 'পাবলিক টয়লেট'। এবার হাসান বুঝলো ব্যাপারটা। বাইরে থেকে 'পাবলিক টয়লেট'-টিকে ছিমছামই মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সুনিতা বেরিয়ে আসলো। হাসান বললো, "আভ, তুম দো মিনিট ইন্তেজার করো।" পাঁচ টাকা চার্জ দিয়ে ভিতরে ঢুকে হাসান দেখলো, 'পাবলিক টয়লেট'-টি ভিতরেও পরিচ্ছন্ন!

কিছুদূর হেটে তারা এলাকার গন্তব্যে পৌঁছালো। ঢাকার গুলশান-বনানী-ডিওএইচএস--এর সাথে ৯৮% মিল থাকা এলাকাটির একটি রোডে এসে থামলো তারা দু''জন। এখানে একটি বাড়ীর দেয়াল ঘেষে লাগানো একটা বড় কল্কে ফুল গাছ থেকে ঝরে পড়েছে অনেকগুলো ফুল। হলুদ রঙের কিউট ফুলগুলি বিছানো রাস্তাটিকে সুন্দর লাগছিলো! তার ঠিক উল্টা দিকেই এ্যাম্বেসীটি। এ্যাম্বেসীর গার্ডরুমে কাছে পৌঁছানোর পর বাঙালী গার্ড সুন্দর হেসে হাসানকে সালাম দিলো। তারপর আড়চোখে সুনিতার দিকে তাকালো। কি ভাবছে সে? এত অল্পবয়সী একটা মেয়ে হাসানের সাথে কেন? কি এই মেয়ের পরিচয়? আবার ভুল ভেবে বসবে নাতো? হাসান দ্রুত তাকে বললো, "উনি আমার পরিচিত। এই এলাকায় কাছেই উনার বাড়ী।"



এ্যাম্বেসীর ভিতরে ঢোকার পর, আবারো দেখা হলো গতকালকের রূপসী রিসিপশনিস্টের সাথে। সেও মিষ্টি হেসে হাসানকে গুড ডে বললো। অন্য এমপ্লয়ী মহিলা এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন, "টি অর কফী?" হাসান বললো, "কফী"। সুনিতার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, সুনিতা উত্তর দিলো, "টি"। হাসান রিসিপশনিস্ট-কে বললো, "বাই দ্যা ওয়ে, আই ডু নট নো ইওর নেম।" রিসিপশনিস্ট উত্তর দিলো, "মাই নেম ইজ শীতল"। এই নামটা বোধহয় হিন্দুস্তানে পপুলার। একটা জনপ্রিয় হিন্দী সিনেমায় দেখেছিলো নায়িকা জিনাত আমান-এর নাম সেখানে 'শীতল'। এক নায়িকা, দুই নায়কের ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী ছিলো ওটা। "ইওর ন্যাশনালিটি?" রিসিপশনিস্ট-কে প্রশ্ন করলো হাসান। সে মিষ্টি হেসে বললো, "আই এ্যাম এ্যান ইন্ডিয়ান"। হাসান বললো, "ইয়েস রাইট। আই মীন ইওর এথনিসিটি?" শীতল উত্তর দিলো, "ওহ্! আই এ্যাম পাঞ্জাবী"। এবার হাসান বুঝলো যে, সে ঠিকই আঁচ করেছিলো, ফেয়ার কমপ্লেকশনের দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি হিন্দুস্তানী নয়। এবার হাসান সুনিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো শীতলের। "দিস ইজ সুনিতা। শী ইজ এ্যান ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট। শী লিভস নিয়ার-বাই"। মেয়েদেরকে শুধু পরিচয় করিয়ে দেয়াই যথেষ্ট। এরপর তারা নিজেরাই একে অপরের হাঁড়ির খোঁজ নিয়ে ফেলে! শীতল আর সুনিতা গল্প জুড়ে দিলো।



মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চা-কফী নিয়ে উপস্থিত হলেন ভদ্রমহিলা। হাসান ওয়েটিং রূমের সোফায় হেলান দিয়ে কফীর কাপে ছোট ছোট করে চুমুক দিতে থাকলো। অপেক্ষা করতে লাগলো মান্যবর রাস্ট্রদূত-এর জন্য। রাস্ট্রদূত অসম্ভব ভদ্রলোক। গতকালই বিষয়টা লক্ষ্য করেছিলো হাসান।

এ্যাম্বেসীর ওয়েটিং রূমটি যথেষ্ট বড়। সেখানে একপাশে ভিজিটরদের বসার জন্য সোফাসেট আছে। সামনে কাঁচের সেন্টার টেবিল তার উপর একটি ছোট জাতীয় পতাকা। কয়েকটি ডেউলি নিউজপেপার ও কিছু ডিপ্লোমেটিক জার্নাল রয়েছে। সোফার পিছনে একটা বড় পেইনটিং যেখানে সেই দেশের কোন এক প্রাকৃতিক দৃশ্যের পটভূমিতে রঙিন জাতীয় পোষাক পড়া দুজন রমণীর হেটে যাওয়া অংকিত হয়েছে। পেইনটিং-টির দুপাশে বড় আকারের দুটি পতাকা সজ্জিত। একটা ঐ দেশের পতাকা, আরেকটি ভারতের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা। তার অপর পাশে দেয়াল ঘেষে একটা ক্যাবিনেট, সেখানে কিছু বই রাখা আছে, আর কিছু শো পীস। তার মধ্যে একটি গান্ধীমূর্তিও আছে। লাঠি হাতে নেংটি পরিহিত বৃদ্ধ করমচাঁদ গান্ধী হেটে যাচ্ছেন। রূমের ভিতরে কিছু ছোট ছোট টবে ইনডোর প্লান্টিং আছে। ঢাকার এ্যাপার্টমেন্টগুলোতেও ইনডোর প্লান্টিং-এ এই গাছগুলিই দেখা যায়। আরেকপাশে রিডিং টেবিলের মত একটা বড় টেবিল। চারপাশে চেয়ার ও বেঞ্চ আছে। তার উপর কিছু ম্যাগাজিন ও একটি ছোট ল্যাপটপ আছে। ঠিক উল্টা দিকে দেয়ালে ঝোলানো একটা বিশাল এলসিডি স্ক্রীন। দেয়ালের স্ক্রীনটির সাথে ল্যাপটপের সংযোগ রয়েছে, তাই ঐ স্ক্রীনটিকে ল্যাপটপের মনিটর হিসাবে ব্যবহার করা যায়। টেবিলের একপাশে বড় বড় দু'টি পতাকা টাঙানো। পতাকা দুটি কার বা কিসের পতাকা তা হাসান জানে না। সেই দিকের দেয়ালে টাঙানো তাদের দেশের রাষ্ট্রপতির ছবি। সাউথ আমেরিকার দেশগুলির বেশীরভাগের রাষ্ট্রপতিই শ্বেতাঙ্গ, তবে এই ভদ্রলোক আদিবাসী। রূমের একপাশের পুরো দেয়াল জুড়েই বিশাল কাঁচের জানালা ও দরজা। সেই জানালা ও দরজা দিয়ে পাশের রাস্তার দৃশ্য দেখা যায়। দরজার ওপাশে একটা বেলকুনি। বেলকুনিতে বড় টবে একটি বড় পামট্রী রাখা আছে।

হাসান ক্যাবিনেটের কাছে গিয়ে বইগুলো দেখছিলো। এসময় টের পেলো, কেউ একজন প্রবেশ করেছেন রুমে। ঘুরে তাকিয়ে দেখলো, অতীব ভদ্রলোক রাষ্ট্রদূত মহোদয় প্রবেশ করেছেন। হাসান হেসে সম্ভাষণ জানালো তাকে।



রাষ্ট্রদূত: কেমন আছেন?
হাসান: জ্বী, ভালো আছি। আপনি?
রাষ্ট্রদূত: আমিও ভালো আছি। বাই দ্যা ওয়ে, গতকাল জিজ্ঞেস করা হয় নি। আপনার বাংলাদেশ থেকে দিল্লী আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?
হাসান: জ্বীনা। তেমন কোন সমস্যা হয় নি। তবে দিল্লীর ট্রেনের টিকিট পাওয়া ভীষণ ঝক্কি ছিলো। এছাড়া অল ওকে।
রাষ্ট্রদূত: হ্যাঁ। আপনার অসুবিধা হওয়ারও তো কথা না! আপনি একজন বাংলাদেশী।
হাসান: কোন অর্থে?
রাষ্ট্রদূত: আপনার কাছে তো বাংলাদেশ আর ভারত একই। একসময় বাংলাদেশ তো ভারতের অংশই ছিলো।
এবার মেজাজ গরম হয়ে গেলো হাসানের! এই কথাটা বহির্বিশ্বে প্রচারিত আছে, এটা জানে হাসান। কিন্তু উনার মুখে এই কথা শুনে অতি সজ্জ্বন রাষ্ট্রদূতের উপরও মেজাজ গরম হয়ে গেলো হাসানের।
হাসান: জ্বীনা। ঐ হিসাবে দেখলে ভারতও বাংলাদেশের অংশ ছিলো।
রাষ্ট্রদূত: (একটু অপ্রস্তুত হয়ে) হ্যাঁ। সেটাও হয়তো বলা যায়। ক্যালকাটাই তো একসময় ভারতের রাজধানী ছিলো।
হাসান: জ্বী। ক্যালকাটা রাজধানী ছিলো তবে সেটা বৃটিশ শাসনামলে। ঐ শহর বৃটিশদের নির্মিত। আর তার আগে বহু শতাব্দী ধরে ঢাকা-ই ছিলো বাংলার রাজধানী।
রাষ্ট্রদূত: জ্বী?
হাসান: হ্যাঁ। ঢাকা অনেক প্রাচীন শহর, কোলকাতার চাইতে অনেক অনেক পুরাতন।
রাষ্ট্রদূত: ঢাকা, ক্যালকাটার চাইতেও প্রাচীন!
হাসান: আর পাল রাজবংশ নামে একটা ডাইনাস্টি ছিলো বাংলায়। তারা রাজত্ব করেছিলেন দীর্ঘ চারশত বছর। সেই ডাইনাস্টির শাসনামলে একটা সময় ভারতের বিশাল অংশ বাঙালীদের করতলগত ছিলো, ইনক্লুডিং দিস দিল্লী। (পায়ের নীচের দিল্লীর মাটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো হাসান)
এবার অনেকটা দমে গেলো গেলেন রাষ্ট্রদূত।
রাষ্ট্রদূত: আপনি শো-কেসে কি দেখছিলেন? গান্ধীর মূর্তি?
হাসান: জ্বীনা, আমি বইগুলো দেখছিলাম। গান্ধীতে আমার আগ্রহ নেই। তিনি আমার হিরো নন।
রাষ্ট্রদূত: (একটু অবাক হয়ে) কে তাহলে আপনার হিরো?
হাসান: নেতাজী।
রাষ্ট্রদূত: কে তিনি?
হাসান: নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু।
রাষ্ট্রদূত: চেনা চেনা লাগছে নামটা। আরেকটু খুলে বলবেন?
হাসান: কোলকাতার এয়ারপোর্ট-টি উনার নামে। এয়ারপোর্টের সামনে উনার বিশাল মূর্তি আছে।
রাষ্ট্রদূত: (একটু চিন্তা করে) আই সি! আমি তো কয়েকদিন আগেই কোলকাতা গিয়েছিলাম। দাঁড়ান দেখি।
বলে উনার হাতে রাখা ফাইলটি খুললেন। কোন একটা কাগজ বের করলেন। রাষ্ট্রদূত ও হাসান দুজনে একসাথে তাকালেন কাগজটার দিকে। সেখানে কোন এক জায়গায় লেখা 'নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এয়ারপোর্ট'।
রাষ্ট্রদূত: রাইট! ইউ আর রাইট!
এবার সজ্জ্বন রাষ্ট্রদূত লাজুক হেসে বললেন
রাষ্ট্রদূত: দেখেন তো এমন গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যাক্তি সম্পর্কে আমি জানি না!
হাসান: আসলে নেতাজী-ই ছিলেন ত্রাণকর্তা! উনার আন্দোলনের ফলাফল হিসাবেই শেষতক স্বাধীন হয়েছিলো ভারত।
রাষ্ট্রদূত: আই সি! আমি পড়বো উনার সম্পর্কে।
হাসান: একটা ফিল্ম দেখলে আপনার প্রাথমিক ধারণা হবে।
রাষ্ট্রদূত: কি ফিল্ম?
হাসান: 'বোস দ্যা ফরগটেন হিরো'। ইউটিউবে পাবেন।
রাষ্ট্রদূত: গুড! আমি দেখবো ফিল্মটি। বাই দ্যা ওয়ে, আপনার পড়ালেখা যেন কি বিষয়ে?
হাসান: ফিজিক্স।
রাষ্ট্রদূত: আই সি! ফিজিক্সের ছাত্র হয়েও এত ইতিহাস জানেন! এরকম তো কম দেখা যায়!
রাষ্ট্রদূতের চোখে ইমপ্রেশনের ছাপ দেখলো হাসান!
রাষ্ট্রদূত: বাই দ্যা ওয়ে, আসুন আমরা কাজ শুরু করি।
অনেক সময় লাগলো পেপার ওয়ার্কগুলো করতে। কিন্তু সজ্জ্বন রাষ্ট্রদূত ধৈর্য্য ধরে সব কাজ করে যাচ্ছিলেন। হাসান লক্ষ্য করলো এ্যাম্বেসীতে কর্মচারীর সংখ্যা খুব কম।

এ্যাম্বেসীতে শীতলের সাথে গল্প করা ছাড়া, হাসানের সাথে গোমড়া মুখ করেই বসে ছিলো সুনিতা। কাজ শেষ হতে হতে বিকেলের শেষ দিক হয়ে গেলো। রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে। এ্যাম্বেসী থেকে বেরিয়ে এলো ওরা দুজন।

পড়ন্ত বিকেলের কল্কে ফুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনিতা প্রশ্ন করলো।
সুনিতা: এখন কোথায় যাবে?
হাসান: জাহান্নামে যাব!
সুনিতা: জাহান্নামেই তো আছো!
হাসান: মানে?
সুনিতা: এ্যাম্বাসাডারের সাথে যেভাবে ভারত বাংলাদেশ নিয়ে কথা বললে, আমার তো মনে হলো ভারতের উপর অনেক রাগ তোমার!
আড়চোখে সুনিতার দিকে তাকালো হাসান। কি বলবে বুঝতে পারছিলো না! আনিতার সাথেও এই সমস্যাটা হতো তার। রাজনীতি প্রসঙ্গ আসলেই, আনিতাকে অনেক ঠেস দিয়ে কথা বলতো হাসান! আনিতা পলিটিক্সে ইন্টারেস্টেড ছিলো না মোটেই। তাই ও শুধু চুপ করেই থাকতো। ঐ বয়সে তেমন বুঝতো না হাসান। তবে পরে বুঝতে পেরেছিলো, যেকোন নারীর কাছেই প্রেমটাই বড়। প্রেমের ঊর্ধ্বে কোন কিছুকে স্থান দেয় না তারা। প্রফেশন, রাজনীতি কিছুই না। এই প্রেমের টানে নারীরা সব কিছু ছাড়তেই প্রস্তুত থাকে। যুগে যুগেই প্রেমের টানে নারীরা জন্মদাতা পিতামাতা ও চিরকালের ঘর ছাড়ে, চাকরী ছাড়ে, আত্মীয়-স্বজন ছাড়ে, এমনকি ধর্ম ও দেশও ছাড়ে!

হাসান: ক্ষুধা লেগেছে। কিছু একটা খেতে চাই।
সুনিতা: খাওয়ার যায়গা তো সামনেই আছে। ই-ব্লক মার্কেটে গিয়েই কিছু খাওয়া যাবে।
হাসান: তারপর, তুমি বাসায় চলে যাবে? তোমার বাসা তো কাছেই। এখান থেকে প্রায় হাটা পথ।
সুনিতা: ভাগানা চাহ্তা হ্যায়?
হাসান: তাড়াবো কেন?
সুনিতা: ঐ যে, বাসায় যাওয়ার কথা বলছো!
হাসান: না, মানে।
সুনিতা: মানে মানে কি? এখন তো মাত্র সন্ধ্যা হবে! আরো কিছু সময় বাইরে বেড়াই।
হাসান: কোথায় যাওয়া যায়?
সুনিতা: লাল কেল্লা দেখতে চাও না?
হাসান: লাল কেল্লা? হ্যাঁ। অবশ্যই। ভারতের আকর্ষণ-ই তো 'দিল্লীর লাল কেল্লা' আর 'আগ্রার তাজমহল'। একটা 'শাসনের জৌলুস'-এর প্রতীক, আর অপরটা 'প্রেমের পরাক্রম'-এর প্রতীক। মোগল বাদশাহী 'শান-শওকত' আর 'পেয়ার মহব্বত'! প্রাসাদ ও হেরেম!
সুনিতা: বাহ্। চমৎকার সংলাপ আউরালে কবি!
ব্যবসায়ী হাসানের মন গলে গেলো 'কবি' ডাক শুনে। আসলে ইনোসেন্ট সুনিতা তো হাসানের কিছুই করেনি! পকেটে হাত দিলো হাসান, টাকা কাউন্ট করার জন্য। এবার লজ্জ্বা পেয়ে গেলো হাসান! নাহ্। ভুলে কোন দুহাজার রূপীর নোট অটোওয়ালাকে দেয়নি হাসান। তার কাছে একটা চিরকুটে হিসাব লেখা ছিলো। সেই হিসাবের সাথে আরেকবার টাকা মিলালো। সব ঠিকঠাকই আছে।
হাসান: সুনিতা।
সুনিতা: হাঁ, কাভিজ্বী!
হাসান: তোমার কাছে মাফ চাই।
সুনিতা: কিসের মাফ?
হাসান: আমি ভুল করে কোন দুহাজার রূপীর নোট অটোওয়ালাকে দেইনি।
তড়াক করে উঠলো সুনিতা, "তাই?"
হাসান: হু। এখন গুনে দেখলাম সব ঠিক আছে।
সুনিতা: দেখোতো, কেমন রাগ ঝাড়ছিলে আমার উপর!
হাসান: মাফ চাইলাম তো। মাফ করো।
সুনিতা: মাফ করলাম তো!
হাসান: সত্যিই মাফ করেছ?
সুনিতা: (এবার অভিমান ঝরে পড়লো সুনিতার কথায়) তোমরা পুরুষরা কিছু বোঝ না কেন বলতো? তোমরা যুবা বয়সে যেমন বোঝনা, ম্যাচিয়ুরড এইজেও তেমন বোঝ না! সেই দুপুর থেকে আমি তোমার সাথে আছি। তুমি রাগ করার পরও চলে যাইনি। আমার বাসা এত কাছে তার পরেও আমি আরো কিছু সময় তোমার সাথে কাটাতে চাই। এর পরেও তুমি বোঝনা কেন?
আবেগ উথলে উঠলো সুনিতার কন্ঠে!
হাসান কি বলবে বুঝতে পারছে না। সুনিতার মুখটা আরেকবার আনিতার মুখ হয়ে গেল হাসানের চোখে। মনে হলো দিল্লী নয়, সুদুর জর্জিয়ায় ককেশাস পাহাড়ের ঢালে হাসানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আনিতা। পিছনে শরতের রঙিন বনবীথিকার পটভূমি। ওর সোনালী মুখের উপর শেষ বিকেলের পাহাড়ী সোনা রোদ এসে পড়ছে! নিসর্গ ও নারী সৌন্দর্য্যের অপূর্ব সমন্বয়ে একটা স্বর্গীয় চিত্র ফুটে উঠেছে! চিত্রকর হলে আরেকটি 'মোনালিসা' আঁকতো হাসান!

পরিস্থিতি হালকা করার জন্য হাসান মৃদু হাসলো। এরপর হাসান ও সুনিতা দুজনাই হাসিতে গড়িয়ে পড়লো। এতকিছুতে হাসানের নিজের বয়স অনেক কম মনে হলো!

(চলবে)
-----------------------------------------------------------
রচনাতারিখ: ১লা অক্টোবর, ২০১৯ সাল
সময়: দুপুর ৩টা ৩৪ মিনিট



সুন্দরী ও সুন্দরী
--------------------- রমিত আজাদ

সুন্দরী ও সুন্দরী,
পুষ্প সুধার মঞ্জুরী,
রূপ মাধুরী সঞ্চারি,
করছো কাহার মন চুরি?

অঙ্গনা ও অঙ্গনা,
চলার শোভা মন্দ না,
চঞ্চলা এক চন্দনা!
করলে যে মন উন্মনা!

রূপসী ও রূপসী,
স্বর্গালোকের ঊর্বশী,
সৌরভিত মেঘকেশী,
করলে কাহার মন খুশী?

অপ্সরি ও অপ্সরি,
বেহেশতী এক হুরপরী,
ঢেউ তুলিয়া ফুলকুঁড়ি,
নিলে কাহার মন কাড়ি?

ফুল্লরি ও ফুল্লরি,
শাড়ীর জমিন বল্লরী,
কন্ঠসুধার কিন্নরী,
দিলে কাহার হৃৎ পুড়ি!

হুরপরী ও হুরপরী,
আলার ছটা বিচ্ছুরী,
নয়নতারা জল ভরি,
কাঁদিয়ে গেলে সুন্দরী!

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৫৯
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাও সে তুং-এর 'পিপলস কমিউন' ব্যবস্থা যেভাবে ৩-৪ কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬



চীনের আধুনিকায়নে মাও সে তুং-এর নেওয়া সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল কৃষির সমবায়িকরণ এবং "পিপলস কমিউন" ব্যবস্থা, ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার মূল... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার রিসাচ পেপার পাবলিশভ

লিখেছেন মোঃ মােজদুল ইসলাম, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:৩৪

Hailstorm, Rain, Dust The effect of Climate Change in Bangladesh
XXXX
IOSR Journal of Environmental Science, Toxicology and Food Technology
2319-2402
International Organization of Scientific Research
www.iosrjournals.org
Open Access Publishing
Blind Peer Review Process
Indexed Refereed Journal
20
06
10.9790/2402-2006020106 ...বাকিটুকু পড়ুন

সংস্কৃতি হারালে, বাংলাদেশ শুধু মানচিত্রে থাকবে- আত্মায় থাকবে না

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

সংস্কৃতি হারালে, বাংলাদেশ শুধু মানচিত্রে থাকবে- আত্মায় থাকবে না

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধ লাগে না।
তার ভাষা, সাহিত্য, গান, নাটক, ইতিহাস আর সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে দিলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×