ধর্ম বিষয়ে মনত্দব্য করার আগে বিষয়টা সম্পর্কে বিসত্দারিত জেনে নিলে ভালো হয়। অনেক অজ্ঞানের (যথা : ওয়াজ ব্যবসায়ী) সোচ্চার ধর্ম চর্চার কারনে এমনিতেই আমাদের ত্রাহি দশা। ফলে আপনার মতো বিজ্ঞজনরা যদি 'অবসর ছিল, তাই কিছু হাদিস ঘাটলাম' এই ঢংয়ে ধর্ম বিষয়টা খেলোভাবে নেন তাহলে, আপনার বক্তব্যও এমনকি আপনি নিজেও অনেকের খেলার শিকার হতে পারেন। ধার্মিকের চেয়ে ধর্মান্ধের সংখ্যা যে এদেশে বেশি সেটা তো আপনার না জানার কথা না। সুতরাং দয়া করে সিরিয়াস বিষয় নিয়ে সিরিয়াসলি কাজ করবেন। অবহেলার চোখে নয়, যুক্তির নির্বিকার দৃষ্টিতেই দেখবেন।
নাউ কাম টু দা পয়েন্ট।
আপনি কিছু হাদিসের কথা বলেছেন যেগুলির প্রামান্যতা নিয়ে সংশয় আছে।
এই সংশয় আমার নয়। অনেক পুরোনো মুহাদ্দিসদের।
এইখানে হাদিস বিষয়ে দুটো কথা বলতেই হচ্ছে।
হাদিস সংকলন শুর হয় নবীজী মারা যাওয়ার অনেক অনেক পরে। তখন যারা হাদিস সংগ্রহ শুরু করেন তাদের অনেকেই ঝামেলায় পরেন নানা পরষ্পরবিরোধী এবং উদ্ভট, অসমঞ্জস হাদিস নিয়ে। এবং তারা সতর্ক হন। কিরকম সতর্ক?
আমরা ছোটবেলায় পরেছিলাম, ইমাম বুখারি নাকি একবার অনেক পথ পাড়ি দিয়ে একজনের কাছে হাদিস সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেন যে সে লোকটি তার উটের সাথে প্রতারণা করছে, তাকে খাবারের লোভ দেখিয়ে খোয়াড়ের ভিতর ঢুকাচ্ছে। এটা দেখে তিনি আর তার কাছ থেকে হাদিস নেননি।
এহেন সতর্কতার সাথে হাদিস সংগ্রহ করার পর তার সংগ্রহ দাড়িয়েছিল প্রায় লাখখানেক। কিন্তু তার সংকলনে কত হাদিস আছে। 5/6 হাজারের বেশি না। বাকী গুলো নানা বিচার বিশ্লেষন করে তিনি নিজেই বাদ দিয়েছেন।
বিচার বিশ্লেষনটা হাওয়া থেকে আসেনি।
হাদিসের নানা অব্যবস্থা থেকে সে সময় বিভিন্ন এলাকার মুহাদ্দিসরা একটা মিটিংয়ে বসেছিলেন। সেই মিটিংয়ে, সহীহ হাদিস নির্বাচনের জন্য উনিশটি (সম্ভবত) নীতিমালাও তারা তৈরি করেছিলেন।
তার মধ্যে কয়েকটি এরকম :
সনদ ঠিক থাকা। আমি অমুকের কাছে সে তমুকের কাছে এভাবে যে পরম্পরা নবী পর্যনত্দ তাকে সনদ বলে। এর মধ্যে যারা বর্ননাকারী হিসেবে আছেন সবাইকে বলে রাবী। প্রথম কথা হলো সনদটা ঠিক থাকতে হবে এবং সেটা সরাসরি নবী পর্যনত্দ যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাবীদের চরিত্র ঠিক থাকতে হবে। যে হাদিস তারা বর্ননা করবেন তার উপর যদি তারা নিজেরাই আমল না করেন তাহলে সেটি জয়িফ বা দুর্বল বলে ধরা হয়। রাবীদের কোনরকম চারিত্রদৌব্যল্য হাদিসকেও দুর্বল করে। যেমন কোন রাবী যদি কোন ফরজ বা সুন্নত নিয়মিত আদায় না করতেন তাহলে তার হাদিস দুর্বল বলে গন্য হতো। কিংবা তাকে যদি বাজারে বসে খামাকা আড্ডা দিতে দেখা যেতো তাহলেও তার হাদিস দুর্বল হবে। রাবীদের সম্পর্কে জানার জন্য সে সময়ে ছোট ছোট অনেক জীবনী গ্রন্থও বের হয়, গড়ে ওঠে রেজালশাস্ত্র।
এছাড়াও আছে দেরায়াৎ যার উপর বিশেষ জোর দিয়েছিল অই কমিটি। অর্থাৎ হাদিসের ভিতরের বক্তব্য নিয়ে বিচার বিশ্লেষন। যেমন নীতিমালার একটা ছিল : হাদিসের বক্তব্য যদি অশালীন হয় তাহলে তা বাতিল বলে গন্য হবে। কারণ, নবীজী কখনো অশালীন কথা বলতেন না।
বা হাদিসের বক্তব্য যদি প্রত্য সত্যের বিপরীত হয় তাহলে তা বাতিল। যেমন কালিজিরায় মৃতু্য ব্যতীত সকল রোগের ঔষধ আছে। আমরা সবাই জানি কালিজিরা খেলে সব রোগ সারে না। সুতরাং এটাকে জাল বলে বাদ দেয়া যায়।
ভবিষ্যৎ বাচক সব হাদিসকেই দুর্বল বলে মনত্দব্য করেছিল অই কমিটি।
এর ফলে যুক্তির আলোকে হাদিস বিচার করার যে ধারা গড়ে উঠেছিল তা এই মাত্রায় গিয়েছিল যে, শোনা যায়, ইমাম আবু হানিফা নাকি মাত্র 18টি হাদিসকে সহীহ বলে স্বীকার করতেন। তিনি কোরআনের আলোকে নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়ে অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করতেন। এ কারনে হানাফি মাজহাবের আর এক নাম ব্যাক্তিগত মতাবলম্বী।
তো এভাবে যুক্তি বিচার বিশ্লেষণ করে সে দিনের মোহাদ্দেসরা হাদিসকে জঞ্জাল মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সে চেষ্টা বহুদিন জারি ছিল। এখনো মাঝে মধ্যে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাল হাদিসের সংকলন বেরোয়। দুভার্গ্য আমাদের, এ দেশে সেসব বই কখনো আসে না। এলে ওয়াজের গল্পগুজব থেকে আমরা রেহাই পেতাম।
আর আপনি যেসব হাদিস বলেছেন সেসবও ঐসব বিচার বিশ্লেষনে বাতিল বলে গন্য হবে বলে আমার বিশ্বাস।
কীভাবে এতো জাল হাদিস ছড়ালো তার প্রোপট বিশাল। আমি একটা দিকের কথা বলি। সেটা ভাষাগত।
আরবী ভাষা প্রচন্ড রকমের ইলাস্টিক ভাষা। একই শব্দের শতরকম মানে হয়। শুনেছি এক ঘোড়ারই নাকি 900 প্রতিশব্দ রয়েছে আরবী ভাষায়। ফলে আপনি ইচ্ছেমতো যে কোন কথার মোড় যে কোন দিকে ঘুড়িয়ে দিতে পারবেন। এবং সেটা হয়েছে এনত্দার। কোরআনের তফসির থেকে হাদিসের ব্যাখ্যা সর্বত্রই।
যেমন ধরুন মুসা নবী দরিয়া পার হয়ে এসেছেন এক পার্বত্য এলাকায়। তখন তার সহচররা পানিতৃষ্ণায় কাতর হলেন। পানির জন্য তখন মুসা নবী কী করলেন? যে ভাষ্যটা আমরা সবাই জানি তা হলো: তিনি তার হাতের লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করলেন, এবং সেখান থেকে 12 টি ঝর্না বের হলো। এখানে, যে আরবী শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে আঘাত করো, তার আরেকটা অর্থ পরিভ্রমন করো। যেহেতু এলাকাটি পার্বত্য, ফলে, এখানে ঘুরে ঘুরে 12টি ঝরনা পাওয়াটাই স্বাভাবিক। সেটাই ছিল ঐশি নির্দেশ। কিন্তু ওটা হলে তো আর নবীর কেরামতি থাকে না। এই জন্য ভক্ত অনুবাদকের বা তাফসিরকারের হাতে মাজেজার ঘটনাটি উঠে এসেছে।
অধিকাংশ অলৌকিক ঘটনার বেলাতেই এটা ঘটেছে।
এ ব্যাপারে আরো অনেক কথা আছে। কিন্তু এতো কথা লিখে বলা কঠিন, হাত ব্যাথা করছে। অতএব আপাতত এখানেই ানত্দ দিই। পরে সময় সুযোগ মতো আবার বলা যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


