somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এক চিলতে সোনালী আলোর অপেক্ষায়…

০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৪ সকাল ১১:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কিছু সত্য, কিছু কল্পনা
মিশে হয় একাকার।
অর্পণ করতে বাধবে না আজ
তোমার উপহার….

।।এক।।

আমরা কজন বসেছিলাম সবুজ ঘাসের পরে। ঝলমলে রোদ ছিলনা, ছায়াঢাকা মেঘ ছিল আকাশে। সময়টা বর্ষাকাল। এ সময় মেঘের আনাগোনা নিত্যদিনের ব্যাপার। আমরা বসেছিলাম ভার্সিটির লাল রঙা দালানটার সামনে। ব্রিটিশদের সময় ব্রিটিশ ছাঁচে তৈরী। বিলেতিরা সৌন্দর্য্যবিলাসী। একটু সৌন্দর্য্যের জন্য একটু বাড়তি পয়সা খরচ করতে কিছু আসে যায় না তাদের। লাল রঙা বাড়িটার গম্বুজাকৃতির চোখা চোখা মাথাগুলো অবশ্য সবসময়ই আমার মনে হাসির উদ্রেক করে। কালো মেঘের পটভূমিতে পুরাতন আমলের বাড়িগুলোকে ভুতূড়ে ভুতূড়ে মনে হয়।
রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। এই সাধ-সকালে সবুজ গাছের পাতাগুলোর ওপর এখনও জমে আছে বৃষ্টির কিয়দংশ। রাতের বৃষ্টিটা আমি খুব উপভোগ করেছি। একটা জানালা খুলে দিয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আর ভেজা মাটির ঘ্রাণ নিতে নিতে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুমটা ভালো হয়েছিল, তাই এখনো যথেষ্ট ফুরফুরে মেজাজে আছি। একটু দূরে বাতেন নামের এক ভদ্রলোক, যাকে আমরা বাতেন মামা বলে সম্বোধন করি, ফ্লাস্ক হাতে চা বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন। বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়ায় কোক-পেপসির চাইতে এই পানীয়টাই চলে বেশি। আমার হাতেও আছে এক কাপ। সকালে আসার সময় চা-খাওয়ার সময় হয় নি। এখন দু’কাপ খেয়ে পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করছি।
এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছাত্রছাত্রীরা। অন্যসময় লালপাথরের বেঞ্চের মতো জায়গাগুলোতে তাদেরকে বসে থাকতে দেখা যায়। কালরাতে বৃষ্টি হওয়ায় জায়গাগুলো পানিতে ভিজে গেছে। ছেলেমেয়েরা তাই খবরের কাগজ বিছিয়ে ঘাসের ওপরই বসে পড়েছে। মনে আছে, সিলেটে শাহজালাল (র) এর মাজারের সামনে জুমআর নামাজ পড়তে গিয়ে দেখি খোলা রাস্তায় সিজদাহ দেয়ার জায়গা নেই। এক খবরের কাগজ বিক্রেতার কাছ থেকে পুরো দাম দিয়ে সেদিনের কাগজ কিনতে হয়েছিল। আজকের ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো, রহমত নামের একটা ছেলে গতদিনের কাগজ নামমাত্র মূল্যে দিয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির সাথে সাথে যেন আজকের জন্য তার ভাগ্যটাও খুলে গিয়েছে।
বসেছিলাম আমরা চারজন। আমি, রবিন, রেনু আর ইমা। রবিন চশমাপরা পড়ুয়া টাইপ ছেলে। পিঠব্যাগে সবসময় টেক্সটবুক নিয়ে ঘোরে। পরীক্ষার ফলাফলটাও অত্যাধিক ভালো। রেনু রবিনের পেছন পেছন ঘোরে সবসময়। ওর মনে কি চলে আমি বুঝতে পারি না। সে মাঝারি আকারের সুন্দর একটা মেয়ে। চাইলেই একটু সাজগোজ করে নিজেকে অন্যের ঈর্ষার পাত্র করে তুলতে পারত। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সে সেটা করে না। সেও ভালো ছাত্রী। যদিও তার অনেকটাই রবিনের অবদান। রেনু কি চায় তা বোঝার মতো স্বাভাবিকতা সম্ভবত রবিনের নেই। অথবা বুঝলেও সে না বোঝার ভান করেই থাকে। আমি কখনোই তথাকথিত ভালো ছাত্র বলতে যা বোঝায় তা ছিলাম না। বাবা-মায়ের অগাধ ইচ্ছা আর তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে কিছুটা হলেও ধাতস্থ হয়েছি। মানুষ হিসেবে আমি যথেষ্টই আগোছালো ধরণের। সব কিছু নিয়ে খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা আমার পছন্দ না। আমার কেন জানি মনে হয়: রঙিন কাপড় সূর্যের নিচে নেড়ে শুকোতে গেলে রং মলিন হয়ে আসে। তাকে ঠাণ্ডা জায়গায় রেখে ধীরে ধীরে শুকোনোই ভালো।
বাদ থাকল ইমা। পাতলা, ছিপছিপে ধরণের শান্ত স্বভাবের একটা মেয়ে। আমার সবচাইতে ভালো বন্ধু। রেনুর সাথে একটা জায়গায় খুব মিল। সাজগোজ একদম পছন্দ করে না। সবসময় খুবই সাধারণভাবে থাকে। আগোছালো চুলগুলো বেণী করে ছেড়ে রেখে দেয়। অনেক পড়াশোনা করে বা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ফলাফলে খুব বেশি সেটা প্রকাশ পায় না। এই ব্যাপারটা নিয়ে তাকে সবসময়ই চিন্তিত থাকতে দেখা যায়। আমাদের সাথে কথা বলা বাদে বাকি সময় আমি তাকে বিষন্নতায় ডুবে থাকতেও দেখি। আমি তার খুব ভালো বন্ধু হলেও এই একটা ব্যাপারে সে আমাকে এড়িয়ে যায়। রবিন চা শেষ করে উঠে পড়ল।
“আমার ক্লাস আছে রে। আমি যাই।” বড় বইটা ব্যাগে ভরতে ভরতে সে বলে। ওর দেখাদেখি রেনুও উঠে পড়ে। ভাব দেখায় যেন তারও চা শেষ। আমি আড়চোখে দেখলাম কাপের বাকি চা টুকু কাত করে ফেলে দিল রেনু। “আমিও যাই”, বলে সে মুচকি হাসি হেসে পা বাড়ায় ক্লাসের দিকে।
আমি আর ইমা বসে রইলাম। আজ আর আমাদের ক্লাস নেই। মেঘের আড়াল থেকে সূয্যিমামার দেখা দেবার কোন্ও সম্ভাবনা দেখা গেল না। আমি অলসভাবে কাগজের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে ঘাসের ডগা চিবোতে থাকি। ইমা-ই কথা বলল প্রথম।
“একটা টিউশনি জোগাড় করে দিবি রে দীপ্ত?” আমি ঘুরে তার দিকে তাকাই। ইমা একটু হাসল। হাসির আড়ালের বিষন্নতাটুকু তবু আমার চোখ এড়াল না। আমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকি।
“বাবা-মায়ের ঘাড়ে বসে বসে আর খেতে ইচ্ছে করে না। মাসে মাসে কিছু টাকা হাতে পেলে আর হাত খরচের জন্য বাবার কাছে হাত পাততে হতো না।”
বাতেন মামা ফ্লাস্ক হাতে নিয়ে ঘুরছিলেন। চা এর আর ক্রেতা খুজে পাচ্ছিলেন না। আপাতত আর চা বিক্রি হবে না বুঝতে পেরে ওখানেই বসে পড়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করলেন।
“তোকে বাসা থেকে কিছু বলেছে?” ঘাসের ডগাটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললাম আমি।
“বাসা থেকে বলবে কেন? আমার নিজের কাছেই খারাপ লাগে।”
মাথা দোলালাম আমি। “চাকরি-বাকরি করার আগ পর্যন্ত এভাবেই থাকতে হবে তোকে। মেয়েমানুষ টিউশনি করবি কি করে?”
“কেন, মেয়েমানুষ বুঝি টিউশনি করাতে পারে না? কেন, শাফিয়া, বেলী ওরাও তো করে…”
“ওদের কথা আলাদা। ওরা আর তুই কি এক? ওদের বাসা থেকে পড়ার খরচটাই যোগাতে পারে না। ওদেরকে বাধ্য হয়ে করতে হয়। তোদের কি একই অবস্থা?”
ইমা কিছু বলে না। চুপ হয়ে যায়। রহমত ছেলেটা ছাত্র-ছাত্রীদের ফেলে যাওয়া খবরের কাগজগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে। হয়তো এরপর সের দরে বিক্রির চেষ্টা করবে। সময় বাড়তে থাকে। আকাশের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপের দিকে যেতে থাকে। আমি ইমাকে বললাম, “বাড়ি যা আজ। মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে ভালো মতো।” ইমা কাপড় থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে পড়ে। আমি একটু দূরে দাড় করানো আমার সাইকেলটার দিকে এগোলাম। ইমা পেছন থেকে ডাক দিলো, “দীপ্ত, শোন্। একটু চেষ্টা করে দেখিস আমার জন্য। খুব উপকার হয় তাহলে।” মিষ্টি হেসে বলল সে। আমি কিছু না হলে দীর্ঘসময় তাকিয়ে থাকলাম। তারপর সাইকেল ঘুরিয়ে চলে আসি। পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারি, ইমা আমার চলে আসার পথের দিকে বিষন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

।।দুই।।

ইমার খুবই দুষ্টু একটা ছোট ভাই আছে। নাম ইমন। যেমন দুষ্টু, তেমন বাঁচাল। একবার বকবক করতে শুরু করলে থামাথামির কোনও লক্ষণ দেখায় না। কোন কাজ দিয়েও এই পিচ্চিকে ব্যস্ত রাখার কোনও উপায় যখন তার পরিবার বের করতে পারল না, তখনই তাদের মাথায় প্রাচীন এক উক্তি খেলে গেল- ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হবে’। সেই স্কুল থেকে একসাথে পড়ে আসছি দেখে ইমার পরিবারের সাথে আমার পরিবারের ভালোই পরিচয় ছিল। ইমনকে সামলাতে ওরই মতো বান্দরজাত কাউকে প্রয়োজন, এই চিন্তা করতেই ইমার মায়ের মাথায় প্রথমেই আমার নামটা আসল। ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে তার সাধের টি-সেটটা তো আমিই ভেঙে দিয়েছিলাম। তাই তাকে এ ব্যাপারে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না।
আজও যথারীতি আমি ইমাদের বাসায় এসে বসে আছি। বাসাটা অনেক গোছালো। জিনিসপত্রের একটুও এদিক সেদিক নেই। ইমা আর তার বড় বোন রিমা আপু মিলে সবকিছু সর্বদা গুছিয়ে রাখে। ইমনের ঘরটা আগোছালো হওয়ার কথা ছিল। আশ্চর্যজনকভাবে এটা আরও বেশি সুন্দর করে সাজানো। ইমনের কার্টুনের নকশা করা পড়ার টেবিলের বই-খাতা গুলো একটার পর একটা সমান করে রাখা, টেবিল ঘড়িটা টেবিলের সাথে সমকোণে সোজা করে রাখা, র্যা কের ভেতর কাপড়গুলো সুন্দরমতো ভাঁজ করে রাখা। কার্টুর আঁকা বিছানার চাদরে কোথাও এতটুকু ভাঁজ নেই। জানালার পর্দাগুলো সোজা করে দু’পাশে টানা। সম্ভবত: আমি আসবার আগে অনেক সময় নিয়ে যত্ন করে এই ঘরটা গোছানো হয়। আন্টির দিয়ে যাওয়া বিস্কুট আর চা খেতে খেতে আমি চারপাশ দেখতে থাকি।
আমার এই সুদীর্ঘ অপেক্ষার কারণ- ইমন বাসায় নেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না। ইমা গিয়েছে আশেপাশের বাসায় খোঁজ করতে। ইমনের এমনিতে আমার কাছে পড়তে কোনও প্রকার অপারগতা নেই, আমার কাছে খুশি হয়েই পড়ে সে। আজ কি কারণে চম্পট দিল কে জানে। উত্তরটা পাওয়া গেল ইমন আসার পর। দোতলার বাসা থেকে তাকে কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল ইমা। রাগের বহি:প্রকাশ স্বরূপ পেছন থেকে ভেংচি কেটে দিলো ইমন। আমি কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই শুরু হয়ে গেল তার বকবকানি।
“ভাইয়া জানো, আজকে রাতুলের বাসায় ওর নতুন গেমবক্সটা দেখলাম। ইশশশ…এত্ত সুন্দর। কালোরঙের। ওর খালু আমেরিকা থেকে নিয়ে এসেছে। খেলতে বসব, ঠিক তখন আপুনি গিয়ে হাজির। ভাইয়া, তুমি আসার আর টাইম পেলে না?” টানা কথা বলে তখন হাপাচ্ছে সে।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তোমার কথা শুনে তো আমারও খেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এখন না পড়ালে তো আমাকেও কানমলা খেতে হবে।” ইমন ফিক করে হেসে দেয়। “তুমি এত বড় হয়েছ, তোমাকে কান মলা দেবে কেন?”
“মায়েদের কাছে ছেলেরা কখনো বড় হয় না। কানমলা খাওয়ারও কোনও বয়স নেই।” আমি বইপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে বলি, “এই যেমন আজ। আজকে পড়াতে আসতে একেবারেই ইচ্ছে করছিলো না, মা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে পাঠালো।” ইমন আবারও হাসি দেয়।
আমি বললাম, “আজ যেন কি পড়ানোর কথা?”
“উমম…ভাইয়া, আজকে তো অংক করানোর কথা। কিন্তু আজকে না, অংক করতে একদম ইচ্ছে করছে না।” গম্ভীরভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল সে। তার এই কৃত্রিম গাম্ভীর্য দেখে আমি হেসে ফেললাম।
“আচ্ছা, আচ্ছা। অংক করতে হবে না। কিন্তু এভাবে প্রতিদিন অংকে ফাঁকি দিলে তো আবার রেজাল্ট খারাপ হবে। তখন তো আবার আব্বু-আম্মু খুব করে বকবে।”
“নাহ। আমার সব বকা আপুনির ওপর দিয়েই যায়।”
“কেন? তোমার রেজাল্ট বুঝি আপুনির জন্য খারাপ হয়?”
“না, তা ঠিক না। আপুনি আমাকে খুব আদর করে তো। বাবা বলে আমি আপুনির সাথে মিশে মিশে এমন হয়ে গেছি।”
আমি চুপ করে চিন্তা করতে থাকি। ইমন বলতেই থাকে।
“আচ্ছা ভাইয়া তুমিই বল, আপুনি কি খারাপ? আপুনি কত ভালো। আমাকে রাতে গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ঘুম না এলে রূপকথার গল্প শোনায়।”
আমি ইমনের কথাগুলো কল্পনা করার চেষ্টা করি। ইমার এই স্নেহময় দিকটা আমি নিজ চোখে কখনো দেখি নি, তাই সেটা কল্পনা করতেই ভালো লাগল। ইমন তখনো গম্ভীরভাবে মাথা নেড়েই চলেছে।
“আচ্ছা, তুমি তাহলে আপাতত বীরপুরুষ কবিতাটা লেখে ফেলো দেখি। আমি তোমার আপুনির সাথে একটু কথা বলে আসি। দেখো, কমা-দাড়ি ভুল হয় না যেন।” ইমন খুশি হল খুব। বীরপুরুষ তার প্রিয় কবিতা। এ নিয়ে সে দশ থেকে বারোবার এই কবিতা লেখেছে। আমি ইমনের ঘরের দরজা খুলে বের হতেই ইমার সামনে পড়ে গেলাম।
“তোর সাথে কথা আছে একটু।” চারপাশে তাকাতে তাকাতে বললাম আমি। আমরা দাড়িয়ে আছি খাবার ঘরে। সেগুল কাঠ বাধানো সুন্দর ডাইনিং টেবিলটা ভেজা একটা কাপড় দিয়ে মুছছিল সে। ডাইনিং আর ড্রয়িং রুম পাশাপাশি। সে কাপড়টা রেখে হাত মুছতে মুছতে আমার সাথে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত আসে। ফুল আঁকা সুন্দর কুশনগুলো সরিয়ে বসতে বসতে বলল ইমা, “কি কথা?”
“টিউশনি পেয়েছি একটা, তোর জন্য।”
ইমা খুশি হয়ে ওঠে। অনেকদিন পর তাকে আমি সত্যিকার অর্থে হাসতে দেখি।
“অনেক ধন্যবাদ তোকে। কোথায় গিয়ে পড়াতে হবে, কতদূর, কতদিন যেতে হবে সপ্তাহে, কোন ক্লাসে…”
“ধীরে, ধীরে ম্যাম। এত অধৈর্য্য হবার কিছু নেই। আমার খালা অনেকদিন ধরে আমাকে গুতোচ্ছিল আমার ক্লাস থ্রির খালাত বোনকে পড়ানোর জন্য। আমি ফাঁকি ঝুকি মেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। আজ তোর কথা বলতেই রাজি হয়ে গেল। ইংলিশ মিডিয়াম। পড়ানোর দিনক্ষণ নেই। যেদিন খুশি গিয়ে পড়িয়ে আসলেই হবে।”
ইমা চুপ করে অন্যদিক তাকিয়ে কিছু একটা চিন্তা করতে থাকে। আমি বলতে থাকলাম।
“খালা চাকরি করে তো। পড়ানোর সময় পায় না। টাকা পয়সা নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না। সাধারণের থেকেও বেশি পাবি।”
ইমা হেসে আমার দিকে তাকাল। “অনেক বড় একটা উপকার করলি। তোর একটা ট্রিট পাওনা থাকল আমার কাছ থেকে।”
“একটা ট্রিটে হবে না মিস। একাধিক ট্রিট লাগবে। কাল একবার দেখা করে আসিস গিয়ে। আমি ঠিকানা লেখে দিচ্ছি…”
ইমা আমার কথা শুনছিল বলে মনে হয় না। অন্যদিক তাকিয়ে থেকে সে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল। চেহারায় খুশির একটা আভা খেলা করছে যেন। কিছু একটা ব্যাপার রয়েছে যেটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না।

।।তিন।।

রবিনের বাসা থেকে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছি। বর্ষার মৌসুম। যেকোন সময় বৃষ্টি নামে। এখন নেমেছে মুষলধারে। ছাতা-টাতার ধার ধারি না আমি কখনো। সাইকেলের ঝুড়িতে রেইনকোট রেখে দেই। তাই বৃষ্টিতে ভিজতে হয় না কখনো। বৃষ্টির বেগ বেড়ে যাওয়ায় রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা একেবারেই কম। ভালো করে কিছু দেখা যায় না। আমি সাবধানে সাইকেল চালাতে থাকি। কিছুদূর আসার পর সামনের দৃশ্য দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ।
মাথার ওপর ছাতা ধরে ঝুম বৃষ্টির মাঝে রাস্তায় দাড়িয়ে আছে ইমা। ছাতাটা একটা প্রহসন। এদিক ওদিক থেকে এসে তার প্রায় শরীরের সবটাই ভিজিয়ে দিয়েছে বৃষ্টি। এরই মাঝে চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে সে প্রাণপণে রিক্সা ভাড়া করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অরণ্যে রোদন। এসময় এই রাস্তায় খালি রিক্সা পাওয়া অসম্ভব। আমি ওর পাশে গিয়ে সাইকেল থামালাম। আমার শরীরে রেইনকোটা জড়ানো থাকায় দূর থেকে ইমা আমাকে চিনতে পারেনি। কাছে গিয়ে দাড়ানোর পর চিনতে পেরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আমি বৃষ্টির জোরাল শব্দ উপেক্ষা করে চিৎকার করে বললাম, “কি করিস এখানে?”
“পড়াতে এসেছিলাম। ভেতরে রিক্সা পাইনি দেখে হেটে হেটে মেইনরোডে আসলাম রিক্সার আশায়। আসতেই বৃষ্টি শুরু হল।”
“এখন তো আর রিক্সা পাবি না।”
“কি করব তাহলে?”
আমার মগজ ঝড়ের গতিতে উপায় খুজতে থাকে। ওয়াটার প্রুফ ঘড়িটাতে দেখলাম- রাত সাড়ে নয়টা। বৃষ্টি কখন থামে তার ঠিক নেই। বৃষ্টি থামার পর রওনা দিলে ওর বাসায় পৌছাতে পৌছাতে বারটা বেজে যাবে। আর কোনও উপায় নেই।
আমি বললাম, “সাইকেলের পেছনে ওঠ।”
হতবাক হয়ে চিৎকার করে উঠল ইমা, “কিহ? তোর মাথা নষ্ট!”
“কি করবি তাহলে? সারারাত দাড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজবি? ঠিক আছে, ভিজতে থাক, আমি গেলাম।”
আমি প্যাডেল ঘোরাতে যাই। ইমা আমার হাত টেনে ধরে। “এই দাড়া, আমাকে একা ফেলে যাস না।”
“তাহলে কি করব?”
ইমা জোরে একটা শ্বাস নেয়। “ঠিক আছে, আমি উঠছি পেছনে। কিন্তু তুই চালাতে পারবি তো?”
আমি হাসলাম। “তোর দ্বিগুণ ওজনের মানুষ পেছনে নিয়ে চালিয়েছি আমি। তাড়াতাড়ি ওঠ।” ইমা ছাতা হাতে নিয়ে উঠতে যায়। সমস্ত শরীর ভিজে গিয়ে তখন সে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। আমি বললাম, “দাড়া এক সেকেণ্ড।” সাইকেল দাড়া করিয়ে রেইনকোটটা খুলে দিয়ে বললাম, “এটা পর। এতক্ষণ তুই ভিজেছিস। এবার আমি একটু ভিজি।” ইমা কাপতে কাপতে কিছু না বলে রেইনকোটটা গায়ে চড়িয়ে দেয়। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে তো বাড়ছেই। থামাথামির কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় পানি জমে যাবে।
ইমাকে শক্ত করে ধরে বসতে বলে আল্লাহর নাম নিয়ে প্যাডেল ঘোরাতে শুরু করলাম। কুকুর-বিড়াল বৃষ্টির মাঝ দিয়ে কি করে ইমার বাসা পর্যন্ত পৌছালাম জানি না। পৌছাবার পরও বৃষ্টি থামল না। সারা-রাস্তা ইমা তার ছাতাটা আমার মাথার ওপর ধরে থাকল। বৃষ্টি ছিল দেখে সাইকেল আস্তে চালিয়েছি। ইমার বাসায় পৌছে দেখি সোয়া-দশটা বেজে গেছে। বাসার সামনে নেমে ইমা তাড়াতাড়ি রেইনকোট খুলে আমার হাতে দেয়। তখনও হালকা-হালকা কাঁপছে সে।
“বাসায় জানে, তুই টিউশনি করাস?”
ইমা কিছু না বলে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল।
“তাহলে কি বলবি আজ বাসায়?”
ইমা আবারো কিছু না বলে বিষন্ন হাসি দিযে আমার দিকে তাকায়। ওর চোখের এই বিষন্নতা আমার সহ্য হয় না। আমি সাইকেল ঘুরিয়ে চলে আসি।

।।চার।।

গত দুদিন ধরে ইমার কোনও পাত্তা নেই। ভার্সিটি আসে নি। ফোন ধরে নি। ইমনকে এর মধ্যে পড়ানোর কথা ছিল না দেখে ওর বাসায়ও যাওয়া হয় নি। যাব যাব করেও সময় করতে পারলাম না। খালাত ভাইয়ের ভিসার কাজের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হল। তিনদিনের মাথায় নাদিয়ার কাছ থেকে খবর পেলাম, ইমা ভার্সিটি এসেছে। লেকের ধারে বসে আছে।
তখন ক্লাস ব্রেক। আমি কফির কাপ হাতে নিয়ে লেকের দিকে এগোতে থাকি। এদিকটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে সৌন্দর্য্যমণ্ডিত অংশ, অনেকটা গর্ব করার মতো সুন্দর। লাল ইট দিয়ে বাধাই করা পাড়ের সাথেই লাগোয়া ছোটখাট একটা বিল। বর্ষাকালে বিলটা টইটম্বুর হয়ে যায়। শীতে আবার পানি নেমে যায় অনেকদূর। বর্ষায় নৌকাও চলে মাঝেসাঝে। ইমাকে কিছুটা দূরে একা বসে থাকতে দেখলাম। বসে বসে চুলে হাত বুলোচ্ছে। হাতে একটা অতিরিক্ত কফি ছিল। ইমার দিকে সেটা বাড়িয়ে দিলাম। প্লাস্টিকের কাপটা নিয়ে তাতে আস্তে আস্তে চুমুক দিতে থাকে সে।
“দুদিন কোথায় ছিলি?”
“একটু অসুস্থ ছিলাম।”
“অসুস্থ হলে বুঝি ফোন ধরা যায় না?”
“কথা ব লার শক্তি ছিল না রে।”
“দেখি, আমার দিকে তাকা তো।” সে তাকাল। ভাঙাচোরা চেহারা। চোখ হালকা হালকা লাল। আমি হাসলাম। “একদিন বৃষ্টিতে ভিজেই কাত? মানুষজন আরও শখ করে বৃষ্টিতে ভেজে…”
“অভ্যাস নেই। তোর কিছু হয় নি?”
“নাহ। বাড়িতে গিয়ে গরম পানিতে গোসল করে নিয়েছি। সব উধাও। ওরকম বৃষ্টিতে এক-আধ দিন ভিজলে আমার কিছু হয় না।”
আমরা আবার চুপচাপ হয়ে যাই। ইমা নীরবে কফিতে চুমুক দিতে থাকে। আমি মাটি থেকে ছোট ছোট ইটের টুকরা নিয়ে পানিতে ছুড়তে থাকি।
“বাসায় কি বললি?”
ইমা হাসল। “যা সত্যি, তাই বলেছি।”
“কিছু বলল না?”
“কি বলবে? তোর অনেক তারিফ করল। আমার টিউশনি করানোর কথা শুনে বকাঝকা করল অনেক। বোকামির জন্যও বকল।” ইমার মুখ দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
“টিউশনিটা বোধহয় ছেড়েই দেব। কেউ আমাকে বুঝতে চায় না রে দীপ্ত।” ইমাকে বিষন্ন দেখেছি সবসময়। কিন্তু কষ্টের কথা বলতে শুনিনি কখনো। ওর হাতটা আমি শক্ত করে চেপে ধরি। টপ করে এক ফোঁটা পানি আমার হাতের ওপর পড়ে। বৃষ্টির পানির মতো ঠাণ্ডা নয়। লবণাক্ত জলের মতো উষ্ণ অশ্রু।
“রিমাপুর জন্মের পর বাবা চেয়েছিলেন এবার তার একটা ছেলে হোক। সব বাবা-মা ই ছেলে চায়। ছেলেরা তাদের সব দু:খ-কষ্ট দূর করে দেবে, এই আশায়।” আমি চুপ করে তার কথা শুনতে থাকি। বিলে একটা দুটা নৌকা ঘুরতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা মাঝে মাঝে মজা করতে বাতাসে ফোলানো নৌকা নিয়ে আসে। রাব্বি অনবরত পাথর ছুড়ে অতুলদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছিলো এবং সে সফলও বটে। অতুলের প্রেমিকা নাহার নৌকায় বসে ভয়ে চিৎকার চেচামেচি জুড়ে দিয়েছে।
“আমি হবার পর থেকে বাবা আমাকে দু’চোখে দেখতে পারত না। বাবা পছন্দ করত না দেখে মাও খুব একটা আদর করেনি আমাকে কখনো। বাবা-মা থাকার পরও প্রায় বলতে গেলে বাবা-মায়ের ভালবাসা ছাড়াই বড় হয়েছি আমি।” রাব্বির ছোড়া একটা ইট অতুলদের বাতাসে ফোলানো নৌকায় লাগলো। নাহার গগন বিদারী চিৎকার দিয়ে ওঠে। আশেপাশের ছেলেমেয়েরা উঠে দাড়িয়ে গলা বাড়িয়ে দেয় কি হয় দেখবার জন্য। অতুল নাহারকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে।
“আমার বযস যখন বারো, তখন ইমনের জন্ম। ইমনকে পেয়ে বাবা-মা যে কি খুশি হয়, বলে বোঝানো যাবে না। রিমাপুর সাথে আমার সম্পর্ক ছোটকালে ভালোই ছিল। আস্তে আস্তে বড় হওয়ার পর সেও কেমন জানি হয়ে গেল। তখন থেকেই আমার পুরো পৃথিবী জুড়ে শুধু ইমন। ওকে আমি অনেক আদর করি জানিস?” অতুল বাধ্য হয়ে নৌকা ভিড়িয়েছে। রাব্বি আগে থেকেই হাওয়া, আশেপাশে কোথাও তার টিকিটাও দেখা গেল না। নাহার ভয়ে কাঁপছে। অতুল তাকে পরম ভালোবাসায় লাল ইটের বাধানো ঘাটের ওপর বসায়।
“এতদিন সব ঠিকই ছিল রে। হঠাৎ করেই ইমনের রেজাল্ট খারাপ হতে থাকল। আর বাবার মনে হলো, আমি অলক্ষ্ণী টাইপের একটা মেয়ে। আমার কাছে থেকে থেকেই ইমনের পড়াশোনা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক অনেক স্বপ্ন। আমি নাকি তাদের স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছি।” ইমার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতেই থাকে। ওর আর আমার দুজনেরই হাত লবণ-জলে একাকার হয়ে যায়। আকাশটা যেন আজ ইমার চোখে নেমে এসেছে, বৃষ্টিটাও তাই ঝরছে সেই চোখ থেকেই। ইমা ফোপাতে ফোপাতে বলল, “বাবা এখন চায় আমি ইমনের থেকে দূরে দূরে থাকি। আমি এখন কি করব বল? আমার নি:শ্বাস প্রশ্বাস প্রতিটা অস্তিত্বে মিশে আছে আমার ছোট ভাইটি। ওকে ঘুম না পাড়িয়ে আমি ঘুমোতে পারি না, না খাইয়ে আমি খেতে পারি না। ওকে দূরে রেখে আমি বাঁচব কি করে?” আমি ইমার হাত আরও শক্ত করে ধরলাম। সে কাঁদতে কাঁদতে আমার কাধে মাথা রাখে। তার প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কঠিন প্রশ্নগুলো সবসময়ই এতো কঠিন হয় কেন? প্রায় দশ মিনিট পর যখন ইমা শান্ত হয়ে আসল, তখন তার হাত ধরে টেনে উঠালাম। “চল্ আমার সাথে।”
“কোথায়?”
“গেলেই দেখবি।” ইমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

।।পাঁচ।।

আজ আর সাইকেল নিয়ে এলাম না। ইমাকে আবার সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিয়ে আসার ইচ্ছে হচ্ছিল না। যে জায়গাটায় আসলাম সে জায়গাটার রাস্তাটা কাঁচা মাটির। সাইকেল, রিক্সা ছাড়া তেমন চলে না। মাঝে মধ্যে দু’একটা মোটর সাইকেল অথবা মোটরগাড়ি এদিকটায় আসে হয়তো। জমিনের মালিকেরা যখন স্বচক্ষে নিজের জমিনের তদারকি করতে আসেন, তখন। রিক্সা থেকে নেমে কিছুটা দূরত্ব পায়ে হেঁটে যেতে হলো। যখন জায়গাটায় পৌছালাম চারপাশে হালকা পাতলা জঙ্গলের মতো ঘন গাছ-লতা-পাতায় ভরপুর। একটা পুরাতন আমলের বটগাছ দেখা গেল। গায়ে একটা মই ঠেস দিয়ে রাখা। আমি ইমার দিকে ফিরলাম।
“মই বেয়ে উঠতে পারিস?”
ইমা ওপরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “পারব।”
“তাহলে উঠে যা। আমি তোর পেছনে আসছি। পড়ে গেলে ধরতে পারব।” আমি দাঁত বের করে হাসলাম। আমার রসিকতায় সে হাসল না। কটমট করে তাকাল শুধু। ইমা ধীরে ধীরে মই বেয়ে উঠতে থাকে। প্রায় মগডালের কাছাকাছি ওঠার পর একটা চারকোণা ছোটখাট ঘরের মতো চোখে পড়ে।
ইমা অবাক হয়ে বলল, “এই গাছের ওপর ঘর বানিয়েছে কে?”
আমি হেসে বললাম, “আমি বানিয়েছি।” ঘরটায় দুজন মানুষ অনায়াসে ঘুমিয়ে থাকতে পারবে। ডানদিকের দেয়ালে জিনিসপাতি রাখার একটা তাক আছে। তাতে দু’একটা বই, খাবারের প্যাকেট পাওয়া গেল।
ইমার বিস্ময় শেষ হতে চায় না। “এই ঘর বানিয়েছিস কেন? আমাকেই বা নিয়ে এলি কেন?”
“তোকে নিয়ে এসেছি”, সামনের দিকের একটা হার্ডবোর্ড ঠেলে সরাতে সরাতে বললাম আমি, “বারান্দাটা দেখাব বলে।” সরিয়ে দিলাম হার্ডবোর্ড। ঝুপ করে আলো এসে ঢুকল ঘরের ভেতর। সামনে যতদূর চোখ যায়, আদিগন্ত বিস্তৃত ভূমি। কোনও জনমানুষের চিহ্ন নেই, ঘন গাছপালা আর সবুজে মোড়ানো মাঠ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। আকাশে আগে থেকেই মেঘ ছিল। এখন ঝুপঝাপ বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টিতে মায়াময় পৃথিবীটা আরও মায়াময় হয়ে ওঠে। ইমা আর আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। “এ গাছটা আশেপাশের মধ্যে সবচাইতে উচু গাছ। এর ওপর থেকে মোটামুটি সবই দেখা যায়। এ জায়গাটা কেনার সময় বাবার সাথে সাথে আমিও এসেছিলাম। গাছটা দেখেই শখ হলো এমন কিছু একটা করার। এত সুন্দর..” ইমা শক্ত করে আমার হাত ধরল। আমাকে চুপ করতে বলার ইশারা। প্রায় একঘণ্টা যাবৎ বৃষ্টি চলল আর আমরা পৃথিবীর সমস্ত চিন্তাভুলে গিয়ে সেই বৃষ্টিতে স্নানিত অস্বাভাবিক সুন্দর পৃথিবীটা দেখলাম। বৃষ্টি থেমে যাবার পর ইমা আমার দিকে তাকায়। তার চোখে টলমল করতে থাকা অশ্রু। এ অশ্রু কোনও কষ্ট থেকে উদ্ভূত নয়, এ অশ্রু আনন্দের। আমিই কথা বললাম প্রথম।
“তোর মন ভালো হয়েছে?”
ইমা মাথা ঝাকায়। আবারও ঘুরে বারান্দা দিয়ে সে তাকাল বাইরে। বৃষ্টি শেষ হয়ে হাল্কা হাল্কা রোদের দেখা মিলল অনেকদিন পর। সোনালী সেই রোদে ভেজা গাছপাতা আর মাঠঘাট চিক চিক করে উঠল। প্রাণ ভরে যাওয়া সৌন্দর্য্য অবলোকন করতে থাকি আমরা দুজন।
আমি বলি, “দ্যাখ্, কি অপার মায়ার প্রকৃতি। এখান থেকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা কত বিশাল, কত বৈচিত্রময়। নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয় তখন, দু:খ কষ্টগুলোকে তখন মনে হয় আরও বেশি অর্থহীন।”
ইমা চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে শুনে যায়। আমি বলতে থাকি। “বাবা-মা কখনো তাদের নিজের সন্তানকে ত্যাগ করতে পারে না রে। তুই কল্পনাও করতে পারবি না তোর মা-বাবা তোকে কতটা ভালোবাসে। হয়তো রাগের মাথায় ওলট-পালট কিছু বলে ফেলেছে। হয়তো তাদের প্রকাশ করার ভঙ্গিটা অন্যরকম। তুই মেয়ে হয়ে তাদের ছেলের অভাব পূরণ করতে চেয়েছিস। তারা ছেলে চেয়েছিল। ছেলের মতো মেয়ে তো চায় নি। সেটা তো তোর স্বকীয়তা না।”
আমি থেমে যাই। ইমাকে চিন্তা করার সুযোগ দেই। ব্যাপারগুলো তার মাথায় ঢোকা খুবই জরুরী। সে যেন কিছু একটা মেলাবার চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ পর সে কথা বলল।
“তাহলে আমাকে ইমনের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলা, আমি অলক্ষ্ণী; এই কথাগুলোর মানে কি?”
আমি মুখ চাপা দিয়ে হাসলাম। “আরে বোকা, ইমন দুষ্টুর একশেষ। আর তুই ওকে আদর দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছিস। এই সুযোগে সেও পড়াশোনা চুলোয় তুলে দিয়ে দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে। এখন থেকে যেন ওকে একটু শাসনও করিস, সেইজন্য আঙ্কেল বলেছেন অমন কথা।” মাথা নেড়ে হাসতে লাগলাম আমি। “কোনও বাপ কখনো মেয়েকে অপয়া ভাবতে পারে?”
ইমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলে না। যেন নতুন করে আজ আমাকে আবিষ্কার করল সে। “তুই তোর বাবা-মা কে খুশি করার জন্য পড়াশোনা করিস, রেজাল্ট ভালো করার চেষ্টা করিস। অথচ পড়াশোনায় মন বসাতে পারিস না। শুধু শুধুই দুশ্চিন্তা করিস। তাই না?” ইমা মাথা ঝাকায়। আমি বলে চলি। “অথচ তুই জানিস না তোর খুশিতেই তাদের খুশি। তোর রেজাল্ট ভালো-খারাপ তারা দেখতে চায় না, তারা তোকে খুশি দেখতে চায়। তুই খুশি মনে থাকলে তারাও খুশি থাকবে।”
আমি আবারও চুপ করে গেলাম। ইমাকে ভাবার সুযোগ দেই। আরও একঘণ্টা থাকার পর আমরা আমাদের গাছবাড়ি থেকে নেমে আসলাম। আমার সামনেই আমি নতুন এক ইমাকে জন্ম নিতে দেখি।

[দীপ্তর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ এখানেই শেষ। কোনও একটা অজ্ঞাত কারণে তার রোমঞ্ছিত ঘটনাগুলো আর বাড়েনি।]

।।ছয়।।

ব্যবস্থাপনা বিভাগের কালো রঙের দালানটার পাশে ছোট একটা মাঠ আছে। মাঠটার ঘাস সবসময়ই খুব সুন্দর করে ছোট করে ছেটে রাখা হয়। আজ বিভাগটা বন্ধ থাকায় মাঠটা একেবারেই ফাঁকা। কোনও জনমানুষের চিহ্ন নেই। ইমা আস্তে আস্তে পিচঢালা রাস্তাটা ধরে হেটে আসে। হাতে একটা হলুদ রঙের কাগজ। কাগজটা একটা চিঠি। ইমাকে লেখে যাওয়া দীপ্তর শেষ চিঠি। ইমা চিঠিটা পড়েছে কিছুক্ষণ আগে। তার চেহারায় তাই বিষন্নতার ছাপ স্পষ্ট।

প্রিয় ইমা,
আছিস কেমন? আমাকে গরুখোঁজা খুজেছিস নিশ্চয়? আমি জানতাম একসময় না একসময় আমার বাসায় তুই আসবিই। তাই মা’র হাতে চিঠিটা রেখে উধাও হয়ে গেছি। তোর হাতে চিঠিটা কখন পৌছবে জানি না। জুলাই মাসের ৭ তারিখ আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি। ওখানেই একটা চাকরি করব। আমার মামা থাকেন সেখানে। তুই কষ্ট পাবি তাই তোকে জানাইনি। তোর কষ্ট পাওয়া চেহারাটা আর দেখতে চাই না। তোর হাসিটা এত্ত সুন্দর, অথচ না হেসে তুই শুধু মুখটা পেচার মতো বিষন্ন করে রাখিস। তোর ওই পেচা মার্কা মুখ দেখব না বলেই পালিয়ে আছি। তোকে বলব না কোথায় আছি। মাকেও নিষেধ করে দিয়েছি যেন না বলে।
আমরা দুজন একসাথে অনেক বছর ছিলাম। একজন আরেকজনের সুখ-দু:খে পাশে দাড়িয়েছি। তারপরও মুখ ফুটে কখনো বলতে পারিনি; ভালোবাসি তোকে। খুউব বেশি। অনেক আগে থেকে। প্রত্যাখ্যাত হবার ভয়ে কখনো জানাইনি- এমনটা নয় কিন্তু। ও কথা ভুলেও ভাবিস না আবার। তোকে কষ্ট জর্জরিত অবস্থায় দেখে এসেছি সবসময়। তোর কষ্টকর সময়ের সুযোগ নিতে চাইনি কখনো। তারপর সেদিন যখন তুই হাসিমুখে কাদতে কাদতে তোর মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরলি, সেদিন তোর সুখের সময়েরও সুযোগ নিতে চাইনি। তোর কোনও আবেগময় মুহূর্তেরই সুযোগ আমি নিতে চাইনি রে। শুধু চেয়েছি তুই যেন ভালো থাকিস।
আমার একপক্ষীয় ভালোবাসা নিয়ে কখনো বড়াই করতে ইচ্ছে হতো না। জানি, তুই আমাকে সবসময় শুধুমাত্র একজন বন্ধুর চোখেই দেখে এসেছিস। তোর স্বপ্নে বাধা দিতে চাই নি কখনো। আমার মতো উল্টোপাল্টা ধরণের উদাসীন ছেলেকে ভালোবাসার তেমন কোনও কারণও নেই অবশ্য। তোর পরবর্তী জীবনের জন্য শুভকামনা রইল। এটাও জানি, তুই তোর এই বন্ধুটিকে হারিয়ে ফেলার কষ্টে শোকাস্তব্ধ হয়ে যাবি। কিন্তু একবার আমার কথাটা চিন্তা করে দ্যাখ, তোর সামনে সারাটা জীবন কি করে অভিনয় করে যাব?
আর কখনো তোর সুখ-দু:খ-আনন্দ-কষ্টে ভাগ বসাতে পারব না ভেবে খুব খারাপ লাগছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তোর পাশে থাকতে। তোর পাশে থাকলে তোর এক ফোঁটা অশ্রুও কোলে পড়তে দিতাম না আমি।

শিরোনামহীনের মতো বলে যাই-
‘ইচ্ছে হলে ভালোবাসিস,
না হয় থাকিস, যেমন থাকে স্নিগ্ধ গাংচিল।’

ইতি-
তোর অনেক অনেক ভালোবাসার বন্ধুটি

ইমা চিঠিটা হাতে নিয়ে একটা পাথরের বেঞ্চের ওপর ধপ করে বসে পড়ে। এই বেঞ্চের ওপর বসে বসে অনেক সময় কাটিয়েছে ওরা দুজন। চিঠিটা হাতে নিয়ে শূণ্যে তাকিয়ে রয় ইমা। আগামীকাল দীপ্ত চলে যাবে দেশ ছেড়ে। ইমার ঠোটজোড়া নড়তে থাকে। বিড়বিড় করে কি যেন বলতে চায় সে।
“…করলে কি হতো? কেন একটা বারও জানতে চাইলি না রে পাগল? হয়তো তোকে শুধু বন্ধুই ভেবেছি সবসময়। হয়তো তোকে অন্য কোনওভাবে অনুভব করিনি কখনো। কিন্তু এখন যখন তুই চলে যাচ্ছিস…এখন যখন তুই চলে…যাচ্ছিস, তখন মনে হচ্ছে তোকে পাশে পেতে পৃথিবীর সব সীমা লঙ্ঘন করতে রাজি আছি আমি। তোকে ছাড়া যে আমার এক মুহূর্তও চলবে না। তুই এভাবে চলে যাবি কেন দীপ্ত?” ইমার চোখের কোণে অশ্রু জমাট বাধতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সে অশ্রু ভারী হয়ে এসে কান্নারুপে ঝরবে।

।।শেষকথা।।

আকাশে মেঘ গুড়গুড় করে ওঠে। বর্ষাকাল। মাঝে মাঝেই বৃষ্টি নামে এমন করে। ইমা একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার হাতের চিঠিটার দিকে তাকায়। দীপ্তর সাইকেলের পেছনে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্য দিযে যাওয়ার স্মৃতি মনে করে চোখের অশ্রু ভারী হয়ে আসে। আকাশের মতো চোখজোড়া দিয়েও যেন অঝর ধারায় বৃষ্টি নামবে এখন।
চোখ বেয়ে আসা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে যায়। কোলের ওপর রাখা হাতের ওপর আঘাত হানবে আবার, ঠিক যেমন বিলের ধারে পড়েছিল। সেদিন দীপ্ত ওর হাতটা ধরে রেখেছিল। দীপ্তর কথা মনে পড়তেই চোখ ফেটে জল এল ইমার। অবাধ কান্না ঝরে পড়তে থাকে সুন্দর দুটি চোখ দিয়ে। দীপ্ত সবসময় বলতো, তোর চোখ দুটি দেখলে হিংসে হয়। আকাশের মত নীল।
এত এত করে কাদে ইমা, কিন্তু আশ্চর্য। এক ফোঁটা অশ্রুও ইমার হাতের ওপর, কিংবা কোলের ওপর পড়ে না। ঝট করে নিচে তাকায় সে। কোলের ওপর শূণ্যে বাড়ানো একটা হাত ইমার অশ্রুজলের সবকটি কণা ধরে রেখেছে। বহুল পরিচিত সেই হাতটা ইমার কান্নার জলে ভিজে একাকার। ইমা পাশে তাকালেই দেখতে পায় দীপ্তকে। দীপ্তকে কখনো কাদতে দেখেনি সে। আজ তার চোখেও জল।
“খুব কষ্ট হচ্ছিল রে। থাকতে পারছিলাম না। তাই চলে এলাম পেছন পেছন।” অপরাধীর মতো একটা হাসি দেয় সে।
ছোটবাচ্চার মতো কাঁদতে থাকে ইমা। দীপ্ত তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে। বলে, “ওই দ্যাখ্। আকাশেরও মন খারাপ ছিল।” আজও মুষলধারে বৃষ্টি হতে থাকে। আর আর ইমা দীপ্তর মাথায় ছাতা ধরে না, রেইনকোট গায়ে জড়ায় না। কৃষ্ণবর্ণ বিলেতি আমলের দালানের পাশে সবুজ ঘাসের এক মাঠের ধারে ছোট এক বেঞ্চিতে চলতে থাকে ভালোবাসাময় বৃষ্টিবিলাস।




সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৪ সকাল ১১:৪৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×