১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি প্রকৌশল ডিগ্রির প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ৬২ বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৬ সালে এসে কৃষি প্রকৌশলীর প্রকৃত কর্ম্পরিধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কাজের ব্যাপ্তি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ভিত্তিতে দেশের চাকরির বাজারে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না—এই প্রশ্নটি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক। দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাড়ছে, কৃষিপ্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে; কিন্তু সেই প্রযুক্তি উন্নয়ন, মূল্যায়ন, বাস্তবায়ন ও উদ্ভাবনে কৃষি প্রকৌশলীদের ভূমিকা কেন প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয় ?
শিক্ষা আছে, ডিগ্রি আছে—কিন্তু পেশাগত যথাযথ পরিচিতি কোথায় ? বা কৃষি প্রকৌশলীদের বিস্তার কোথায় ?
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে কৃষি প্রকৌশল একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত পেশাগত কর্মক্ষেত্র। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৪ সালে কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের যাত্রা শুরু হয়ে বর্তমানে হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ নতুন প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি কৃষি প্রকৌশলী ডিগ্রি প্রদান করছে। কৃষি উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়নে কৃষি প্রকৌশলভিত্তিক জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই কৃষি প্রকৌশল শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। কৃষি প্রকৌশল শাখায় বিভিন্ন মৌলিক নীতি কৃষি উৎপাদন, যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি অবকাঠামো, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী প্রযুক্তি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করা হয়। একজন কৃষি প্রকৌশলী কেবল কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারেই দক্ষ হয়ে উঠেন না ; তাঁর শিক্ষার ক্ষেত্র অনুযায়ী তিনি যন্ত্রের ডিজাইন, নকশা ও ফিল্ড টেস্ট বা মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা, কার্যক্ষমতা বিশ্লেষণ, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উন্নয়ন, শক্তির সঠিক দক্ষ ব্যবহার, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও সমস্যা শনাক্তকরণ, সমাধান এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজেও অবদান রাখতে পারেন।
অথচ বাংলাদেশের পেশাগত চাকরির বাজারে এই কৃষি প্রকৌশলীদের পেশার পরিচয় এখনো অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট। সেটা সরকারি বা বেসরকারি উভয় ক্ষেত্ররে। একজন কৃষি প্রকৌশলী কী করতে পারেন, তাঁর প্রকৌশল জ্ঞান একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কীভাবে বাড়াতে পারে, কিংবা কোন ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত ধারণা গড়ে উঠেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এখানেই কৃষি প্রকৌশলীদের সংকটের মূল সূত্রটি নিহিত। সমস্যাটি শুধু চাকরির স্বল্পতা নয়; বরং প্রকৌশল শিক্ষা, পেশাগত দায়িত্ব এবং শিল্পের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা চালু থাকা সত্ত্বেও যদি সেই পেশার দক্ষতা ও কাজের পরিধি শ্রমবাজারে যথাযথভাবে পরিচিত না হয়, তাহলে শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি পেশাটির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিয়েও নতুন করে ভাবতে হয়।
সরকারি চাকরি: প্রকৌশলী পদ, কিন্তু কাজের বড় অংশ দাপ্তরিক?
কৃষি প্রকৌশলীদের একটি অংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান (ডিএই, বিএডিসি), গবেষণা সংস্থা (কৃষি গবেষণা, ধান গবেষণা, পাট গবেষণা, ভুট্টা গবেষণা, বারতান) ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ( বার্ড, আরডিএ, বার্তান) এবং উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত । এসব প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু পদবিতে প্রকৌশলী থাকলেই কর্মক্ষেত্রে প্রকৌশলবিদ্যা প্রয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ আছে এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক পদে প্রকল্পের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনা, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়া, নথিপত্র প্রস্তুত, প্রতিবেদন তৈরি, বাজেট-সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মতো দায়িত্ব কাজ করছেন।
এসব কাজের প্রয়োজন এবং গুরুত্ব আছে; সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দক্ষতাও অপরিহার্য। কিন্তু কোনো প্রকৌশলীর কর্মজীবনের বড় অংশ যদি এসব দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তাঁর বিশেষায়িত প্রকৌশল বিদ্যা ও জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়।
একজন কৃষি প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব সমূহের মধ্যে কৃষিযন্ত্রের মাঠ পর্যায়ে কর্মক্ষমতা যাচাই, প্রযুক্তিগত ডিজাইন-নকশা প্রনয়ন ও মূল্যায়ন, সেচব্যবস্থার নকশা ও দক্ষতা বিশ্লেষণ, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী প্রযুক্তির উন্নয়ন, যন্ত্রপাতির উপযোগিতা নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৌশলগত সমস্যার সমাধান। এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার, ওয়ার্কশপ, দক্ষ জনবল, সরকারি গবেষণা বাজেট ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ । কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা নেই; আর না থাকার ফলে কৃষি প্রকৌশলীর দক্ষতা কাগজে-কলমে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রশ্নটি তাই সরকারি চাকরিতে কতজন কৃষি প্রকৌশলী প্রকৌশল পদে নিয়োগ পেলেন, শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁদের কতজন নিয়মিতভাবে কৃষি প্রকৌশলভিত্তিক দায়িত্ব ও কার্য পালন করছেন, কতজন গবেষণা ও কৃষি প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছেন এবং কতজনের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে বাস্তব প্রকৌশলগত অবদানের ভিত্তিতে ? কৃষি প্রকৌশলীদের উন্নয়নে প্রয়োজন বাস্তবধর্মী কর্মপরিবেশ, যেখানে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি তাঁদের অর্জিত বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত ও প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্র বা প্রযুক্তি সমূহ বাস্তবায়নের সুযোগ, কৃষি প্রযুক্তি ভিত্তিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উদ্ভাবনী কাজে অবদান রাখার সুযোগ ।
বেসরকারি খাত: কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবসা বাড়ছে, প্রকৌশলীর কাজ কোথায় ?
বেসরকারি সেক্টরে কৃষি প্রকৌশলীদের সংকট আরও ভিন্ন ও প্রকটভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। কৃষিযন্ত্র আমদানিকারক ও সরবরাহকারী, কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী এবং বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে সেলস, মার্কেটিং, ডিলার ম্যানেজমেন্ট, সরকারি দপ্তরগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন, পণ্য বিপণন ও করপোরেট কার্যক্রমের সঙ্গে কৃষি প্রকৌশলীরা যুক্ত আছেন। বা এরুপ কার্যক্রমে যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে বা এছাড়া তেমন কোন সুযোগ তাদের হাতের কাছে পাচ্ছেন না । বেসরকারী চাকরির বাজারে কৃষি প্রকৌশলীদের জন্যে সেলস, মার্কেটিং, ডিলার ম্যানেজমেন্ট, করপোরেট কার্যক্রম ছাড়া তেমন কোন কাজের সুযোগ বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সৃষ্টি হয়নি । এসব কাজও গুরুত্বপূর্ণ এবং যাঁদের আগ্রহ আছে এসব পেশা আসতে পারেন, তাঁদের কর্মকে খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। সমস্যা তৈরি হয় যখন প্রকৌশলভিত্তিক কাজের বিকল্প সীমিত থাকায় প্রকৌশলীদের বড় অংশের সামনে বাণিজ্যিক দায়িত্বই প্রধান কর্মসংস্থানের পথ হয়ে ওঠে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কাঠামো হলো; অন্য দেশে প্রস্তুত কৃষিযন্ত্র আমদানি করা, বিপনণ বা মার্কেটিং , বাজারজাতকরণ, ডিলার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান। আর এসব কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজন বিপণনকর্মী, সেলসম্যান ও বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদানকারী কর্মীর । কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নকশা বা ডিজাইন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মডিফিকেশন বা উৎপাদনব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পূর্ণাঙ্গ কৃষি প্রকৌশলভিত্তিক পদ তৈরির প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে বাস্তবিক ভাবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বাজার সম্প্রসারিত ও বিকাশ লাভ করলেও সেই সম্প্রসারণের সঙ্গে কৃষি প্রকৌশলীদের জন্য প্রকৌশলভিত্তিক ডিজাইন, মডিফিকেশন, মেশিন ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন, মেশিন প্রস্তুতকরণ ও উদ্ভাবনভিত্তিক কর্মক্ষেত্র সম-অনুপাতে বাড়ছে না। তাই প্রশ্ন থেকেই যায় কৃষি প্রকৌশলীর প্রকৌশল ভিত্তিক কর্মক্ষেত্র দেশে কোথায় ?
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে কৃষি প্রকৌশলীর কাজ মূলত বিপনন বা মার্কেটিং , বাজারজাতকরণ, ডিলার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এসব বানিজ্যিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
উদাহরণ হিসেবে একটি কৃষিযন্ত্র আমদানিকারক ও বিপনণ প্রতিষ্ঠানের কথা ধরা যাক। এখানে মূল সমস্যাটি কৃষি প্রকৌশলীর অযোগ্যতা নয়; বরং তাঁর প্রকৃত দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের সীমিত ধারণা এবং সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো সাংগঠনিক ও কৃষি প্রকৌশল ভিত্তিক যন্ত্রপাতির ব্যবসায়িক ব্যবস্থার অভাব।
দেশের সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শুধু কৃষিযন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি ও বাজারজাতকরণ করে না । কিছু প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেলে কৃষি প্রকৌশলভিত্তিক কাজের সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই কম।
প্রকৌশল ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কেন সেলস ও মার্কেটিংয়ে কাজ করতে হচ্ছে কৃষি প্রকৌশলীদের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু চাকরির সংখ্যা নয়, বরং চাকরির ধরন, দায়িত্বের প্রকৃতি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদাও বিশ্লেষণ করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


