আব্দুল্লাহ (রাঃ) রাসূল (সঃ) এর চাচা আব্বাস (রাঃ) এর পুত্র। হিজরতের তিন বছর পূর্বে তাঁর জন্ম। রাসূলের ওফাতের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র তের বছর।
ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁর মা তাঁকে রাসূলের নিকট নিয়ে যান। রাসূল তাঁর পবিত্র মুখ নিঃসৃত লালা নিয়ে তাঁর মুখে দেন। তাঁর এবং রাসূলের নিবিড় ও প্রগাঢ় বন্ধনের এই ছিল সূচনা পর্ব যা ছিলুআমৃতু্য ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ।
যখন তিনি সাবালকে পরিণত হন, তিনি নিজেকে রাসূলের সেবায় নিবেদিত করেন, ওযুর সময় তাঁকে পানি সরবরাহ করতেন, সালাতে রাসূলের পিছনে ইকতেদা করতেন, ভ্রমণ কিংবা অভিযানে রাসূলের নিকট সারিতে থাকতেন। অর্থাৎ রাসূলকে ছায়ার মত অনুসরণ করতেন, সর্বণই তাঁর সাহচর্যে নিয়োজিত ছিলেন।
রাসূল (সাঃ) যা বলতেন এবং করতেনুযাবতীয় সকল েেত্র তিনি ছিলেন সজাগ, মনোযোগী। তার অন্তঃকরণ ছিল অনুসন্ধিৎসু, উদ্দীপ্ত, তরুণ মনন ছিল পবিত্র ও আবিলতামুক্ত। রাসূলের বাণী সংরণে রেকর্ডিং যন্ত্রপাতির ন্যায়-ই তাঁর স্মরণশক্তি ছিল নিভর্ুল, তুখোড়। এভাবেই কঠোর গবেষণা, অনুশীলন দ্বারা, যা পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাব, তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী সাহাবায় পরিণত হন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রাসূলের বহু মূল্যবান বাণী ধারণ করেন। বুখারী এবং মুসলিম গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত এক হাজার ছয় শত ষাটটি হাদীস উদ্ধৃত ও বিশুদ্ধ বলে স্বীকৃত হয়েছে।
রাসূল (সঃ) প্রায়ই তাঁকে নিকটে এনে পিঠে হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ্ তাঁকে দ্বীন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দান কর এবং তাঁকে অর্থ ও ব্যাখ্যা করার তওফিক দান কর।"
প্রায়শই রাহমাতুলি্লল আলামিন নবী (সঃ) উক্ত দুআর পুনরাবৃত্তি করতেন। ইবন আব্বাস ত্বরিত অনুধাবন করেন যে তাঁর জীবন জ্ঞান ও বিদ্যার অন্বেষায় উৎসর্গিত হবে।
নবী করিম (সঃ) তাঁর জন্য কেবল জ্ঞান ও অনুধাবন-ই নয় বরং প্রজ্ঞা ও অন্তদর্ৃষ্টি কামনা করে দু'আ করেন। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ নিজে বলেন :
"একদা রাসূল ওজু করতে উদ্যত হলে আমি দ্রুত পানির ব্যবস্থা করলাম, আমার কাজে রাসূল সন্তুষ্ট হলেন। সালাতের পূর্বে আমাকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে ইশারা করলেন। কিন্তু আমি পিছনেই দাঁড়ালাম। সালাত শেষে তিনি ঘুরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন কিসে আমাকে তার পাশে দাঁড়াতে বিরত রাখল। আমি বললাম আপনি আমার দৃষ্টিতে এত বিচণ ও মহান যে আপনার পাশে দণ্ডায়মান হওয়া অসমীচীন বোধ করলাম। রাসূল (সঃ) তখন আকাশ পানে হাত উত্তোলন করে দু'আ করলেন, হে আল্লাহ্ তাঁকে প্রজ্ঞা দান কর।"
রাসূলের (সঃ) দু'আ সন্দেহাতীতভাবে ফলেছিল, কালক্রমে স্পষ্ট প্রতিভাত হয়েছিল যে তার ন্যায় প্রজ্ঞাবান সে যুগে ছিল বিরল। কিন্তু এই প্রজ্ঞা লাভ করতে তাঁকে রাসূলের (সঃ) সময় এবং তাঁর ওফাতের পর নিবেদিত তীর্থের কাকের ন্যায় জ্ঞানের পিছনে ছুটতে হয়েছে।
রাসূলের (সঃ) জীবদ্দশায় তিনি কোন আলোচনা-সমাবেশ হাত ছাড়া হতে দিতেন না, তাঁর বাণী স্মৃতিফলকে ধরে রাখতেন। তাঁর তিরোধানের পর যেসব সাহাবা রাসূলের (সঃ) দীর্ঘ সানি্নধ্য লাভ করেন তাঁদের নিকট গমন পূর্বক জ্ঞান লাভ করতেনুযা রাসূল তাঁদের শিখিয়েছিলেন। যখন শুনতেন কেউ তাঁর থেকে একটি হাদীস বেশি জানে, দ্রুত তাঁর কাছে পৌঁছে তা মুখস্থ করে নিতেন। যা কিছু শুনতেন তার বিভিন্ন বর্ণনা ধারা ও পদ্ধতি যাচাই ও পরখ করে দেখতেন। একটা বিষয় খতিয়ে দেখতে তিনি এমনকি ত্রিশজন সাহাবার শরণাপন্ন হন।
আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) একবার জানতে পেলেন রাসূলের (সঃ) এক সাহাবা একটি হাদীস জানেন যা তাঁর নিকট ছিল অজ্ঞাত, এ ব্যাপারে তিনি বলেন,
"আমি বৈকালিক বিশ্রাম লগ্নে তাঁর বাড়ি উপস্থিত হলাম, বাড়ির দরজার সম্মুখে চাদর বিছালাম। বাতাস ধূলিবালি উড়িয়ে একাকার করে ফেলে আমি তার নিকট গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অবশ্যই অনুমতি দিতেন, কিন্তু আমি বাইরে অপো করাই শ্রেয় মনে করলাম যাতে তিনি বিশ্রাম নিতে পারেন। ঘর হতে বেরিয়ে ঐ অবস্থায় দেখে তিনি বললেন : হে রাসূলের (সঃ) চাচাতো ভাই কি ব্যাপার? খবর পাঠালে, আমি নিজে আপনার কাছে যেতাম। আমি বললাম আমার-ই আপনার নিকট আসা বিধেয় কারণ জ্ঞান না চাইতে আসে না বরং উপযাচক হয়ে আহরণ করতে হয়। আমি হাদীসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে তাঁর নিকট হতে তা শিখলাম।"
এভাবেই উৎসর্গিত প্রাণ আব্দুল্লাহ্ জিজ্ঞেস করে করে যাচাই করতেন। লব্ধ তথ্যের খুঁটিনাটি তী্ন ও নিভর্ুল মনে যত্নের সাথে বিশ্লেষণ করতেন।
শুধু হাদীস সংগ্রহ-ই নয় জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শিতা অর্জনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। ওহী লেখক, বিচার, ফিকাহ, কিরায়াত ও ফারায়েজ শাস্ত্রে মদীনাবাসী পণ্ডিতদের নেতা যায়িদ ইবন সাবিত (রাঃ) এর বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। একবার তিনি বাহনের পিঠে আরোহন করবেন এমন সময় যুবক আব্দুল্লাহ্ মনিবের সামনে দাসের দাঁড়াবার ভঙ্গিতে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বাহনের লাগাম ও জিন ধরে আরোহণে সাহায্য করলেন। যায়িদ (রাঃ) বললেন, "রাসূলের (সঃ) চাচাতো ভাই, আপনি কি করছেন?" ইবন আব্বাস (রাঃ) বললেন "জ্ঞানীদের সাথে এভাবেই আচরণ করতে আমরা আদিষ্ট হয়েছি।" যায়িদ (রাঃ) বললেন "আপনার হাতটা দেখি।" তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে, যায়িদ (রাঃ) তাতে চুমু খেয়ে বললেন, "নবী পরিবারের লোকদের সাথে এরূপ আচরণ করতে আমরা আদিষ্ট হয়েছি।"
জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি আঙ্গিক সৌষ্ঠবেও আব্দুল্লাহ্ ক্রমশ বর্ধিত হচ্ছিলেন। মাশরুক আল আজদা তার সম্পর্কে বলেন, "যখন তাকে দেখতাম মনে হত তিনি সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ, যখন কথা বলতেন মনে হত তিনি সবার চেয়ে প্রাঞ্জলভাষী, বাগ্মী, আলোচনা কালে মনে হত তিনি সবার চেয়ে জ্ঞানী।"
খলিফা উমর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিতেন এবং তাঁকে বলতেন "পরিণত বুদ্ধির যুবক।"
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের ভাষায়, "দ্রুত কোন বিষয় অনুধাবন, গভীর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জনের েেত্র ইবনে আব্বাসের চেয়ে অগ্রসর কাউকে দেখিনি। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুহাজির ও আনসার সাহাবাদের উপস্থিতিতে খলিফা উমর (রাঃ) তাঁকে তলব করে উদ্ভূত সমস্যা নিরসন কল্পে আলোচনা করতেন। খলিফা উমর (রাঃ) তাঁর কথা অগ্রাহ্য করতেন না।"
উপযর্ুক্ত গুণাবলী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)কে "এই উম্মাহর বিদ্বান ব্যক্তি" অভিধায় চিহ্নিত করেছে।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) কেবল জ্ঞান অর্জন করেই পরিতুষ্ট ছিলেন না। উম্মাহর সাধারণ মুসলিম এবং বিশেষ করে যারা জ্ঞান-পিপাসু তাদের শিা দান করার দায়িত্ব অনুধাবন করেন। তিনি তাদের শিা দানে ব্রতী হন এর ফলে তাঁর গৃহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ পরিগ্রহ করেুহঁ্যা অর্থগত দিক দিয়ে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে উঁচু মাপের শিা দেয়া হত। পার্থক্য কেবল এতটুকুই যে শিক মাত্র একজনুইবন আব্বাস (রাঃ)।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০০৭ দুপুর ২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



