আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর আলোচনা কাসে বিপুল সাড়া পাওয়া যেত। ইবন আব্বাসের (রাঃ) এক সঙ্গী বর্ণনা করেন,
"আমি দেখলাম ইবনে আব্বাসের (রাঃ) এমন বাড়ির সম্মুখের রাস্তা লোকে লোকারণ্য। আমি তাঁর কাছে মানুষের প্রচণ্ড ভীড়ের কথা বললাম। তিনি ওযুর জন্য পানি আনিয়ে ওযু করলেন তারপর বসে বললেন, তুমি বাইরে গিয়ে অপেমান লোকদের বল, 'যারা কুরআন ও কিরায়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাও, ভিতরে যাও।' আমি বাইরে গিয়ে তাদেরকে এ কথা বললাম। বলার পর এত বিপুল সংখ্যক লোক ভেতরে প্রবেশ করল যে সম্পূর্ণ বাড়ি পরিপূর্ণ হয়ে গেল। তারা যা কিছু জানতে চাইলো তিনি তাদেরকে অবহিত করলেন। তারপর বললেন, 'তোমাদের অপেমান ভাইদের জন্য পথ ছেড়ে দাও।' তারা চলে গেল। অতঃপর আমাকে বললেন, 'বাইরে গিয়ে বল, যারা কুরআনের তাফসীর ও তাবীল সম্পর্কে জানতে চাও, ভেতরে যাও।' আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদের একথা বললাম। বলার পর লোকে ঘর ঘরে গেল। তাদের সব জিজ্ঞাসারই তিনি জবাব দিলেন এবং অতিরিক্ত অনেক কিছুই অবহিত করলেন। তারপর বললেন, 'তোমাদের অপেমান ভাইদের জন্য পথ ছেড়ে দাও।' তারা বেরিয়ে গেল।"
এভাবে আগত বিভিন্ন দলের সাথে ফিকাহ, হালাল-হারাম, ফারায়েজ শাস্ত্র, আরবী ভাষা, কাব্য, প্রাচীন আরব্য ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতেন। এমন ভিড় এড়াতে পরবর্তীকালে সপ্তাহের একটি দিন একেক বিষয়ের উপর নির্ধারণ করেন। কুরআনের তাফসীর, ফিকাহ, মাগাযী বা রাসূলের (সঃ) সময় অভিযান, কবিতা, প্রাচীন আরবের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিনে আলোচনা করতেন।
শিাদান কর্মে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাসের (রাঃ) বিশেষ ভূষণ ছিল তার তী্ন-শাণিত স্মরণশক্তি এবং গভীর অন্তদর্ৃষ্টি। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল সবিস্তারিত, স্বচ্ছ এবং যৌক্তিক। তিনি যে যুক্তি তুলে ধরতেন তা যেমনই ছিল প্রভাব বিস্তারকারী হৃদয়গ্রাহী তেমনি বিদ্যমান তাত্তি্বক প্রমাণ এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
তাঁর এই অসাধারণ গুণের পরিচয় মেলে আলী (রাঃ) এর খিলাফত কালে সংঘটিত এক বিশেষ ঘটনায়। হযরত আলী ও মুআবিয়া (রাঃ) এর মধ্যে সংঘাতের সময় কিছু সঙ্গী যখন আলী (রাঃ) কে ছেড়ে চলে গেল, তখন ইবন আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ)কে বললেন আমাকে তাদের নিকট গিয়ে কথা বলার অনুমতি দিন। আলী (রাঃ) আশঙ্কা করলেন যে তিনি বিপদাপন্ন হতে পারেন তবে তাঁর দূরদর্শিতার কথা চিন্তা করে অনুমতি দিলেন।
আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিদ্রোহী দলের নিকটে গিয়ে দেখলেন তারা প্রার্থনায় মশগুল, তাদের ভেতরে কেউ তার কথা শুনতে গররাজি হলেও কেউ কেউ ছিল শুনতে আগ্রহী।
আব্দুল্লাহ বললেন, "রাসূল (সঃ) এর চাচাতো ভাই, তাঁর জামাই এবং তাঁর ওপর প্রথম পর্যায়ে ঈমান পোষণকারী অর্থাৎ আলী (রাঃ) এর প্রতি এমন চরম মনোভাব পোষণ করছেন কেন?" তারা আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ উত্থাপন করল।
প্রথমত; দ্বীনের ব্যাপারে তিনি মানুষকে বিচারক নিযুক্ত করেছেন। মুআবিয়া (রাঃ) এর সাথে দ্বন্দ্বে সালিশ হিসেবে আবু মুসা আশআরী ও আমর ইবনুল আসকে বিচারক নিযুক্ত করেন।
দ্বিতীয়ত; যুদ্ধত্রে হতে ধনসম্পদ গণিমত হিসেবে ও যুদ্ধবন্দিদের দাসদাসী হিসেবে গ্রহণ করেননি।
তৃতীয়ত; মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তাঁকে আমীর হিসেবে মেনে নেয়া সত্ত্বেও সালিশের েেত্র আমিরুল মুমিনুন' উপাধি পরিহারের দাবিতে কোন আপত্তি করেননি। তাদের মতে এটা দুর্বলতার, হীনমন্যতার পরিচায়ক, এবং আমীরের বৈধ সম্মানজনক পদকে করেছে কলুষিত।
জবাবে ইবন আব্বাস (রাঃ) বললেন,
"যদি আমি কুরআন ও রাসূলের (সঃ) বাণী হতে এমন কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করি যা আপনারা অস্বীকার করতে পারবেন না, তাহলে আপনারা যে অবস্থানে আছেন তা থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন?"
তারা সম্মতিসূচক জবাব দিলে তিনি বললেন,
"আপনাদের অভিযোগ, তিনি দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক নিযুক্ত করে অপরাধ করেছেন। অথচ আল্লাহ্ বলেন,
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোন কিছু শিকার করে, তাহলে তোমাদের মধ্যে দু'জন বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী অনুরূপ একটি পশু বিনিময় হিসেবে কাবায় উপস্থিত করবে।"
আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি, চার দিরহাম মূল্যের একটি নিহত খরগোশের ব্যাপারে বিচারক নিয়োগ করার থেকে মানুষের রক্ত ও জীবন রা এবং তাদের পারস্পরিক বিবাদ বিসম্বাদ মীমাংসার উদ্দেশ্যে মানুষকে বিচারক নিয়োগ করা অধিক যুক্তিযুক্ত নয় কি?"
ইবন আব্বাস (রাঃ) বললেন, "আমরা কি তাহলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?" তারা বলল, "হা"।
ইবন আব্বাস বললেন, "আপনারা বলেছেন আলী (রাঃ) যুদ্ধ করে যুদ্ধবন্দীদের দাসদাসী বানাননি। আপনারা কি চান আপনাদের মা আয়িশাকে (রাঃ) দাসী বানানো হোক এবং অন্যান্য দাসীদের সাথে যেমন আচরণ করা হয় তাঁর সাথেও তেমন করা হোক? উত্তরে যদি 'হাঁ' বলেন তাহলে আপনারা কাফির হয়ে যাবেন। আর যদি বলেন, 'আয়িশা (রাঃ) আমাদের মা নন', তাহলেও আপনারা কাফির হয়ে যাবেন।' কারণ আল্লাহ্ বলেছেন,
"নবী মুমিনদের ওপর তাদের নিজেদের অপো অধিকতর প্রিয়, নিকটবর্তী এবং তাঁর সহধর্মিণীগণ তাদের জননী/মা" (সূরা আহযাব : 36)
"এখন এ দুটি জবাবের যেকোন একটি বেছে নিন" তারপর তিনি বললেন, "আমরা তাহলে এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?" তারা বলল, "হাঁ"। আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলে চললেন,
"আলী (রাঃ) 'আমিরুল মুমিনিন' উপাধি পরিহার করেছেন আপনারা এ অভিযোগ তুলেছেন, অথচ হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় রাসূল (সঃ) ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাতে "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্" কথাটি-লেখা হলে কুরাঈশরা বলেছিল : আমরা যদি বিশ্বাসই করতাম আপনি আল্লাহ্র রাসূল (সঃ), তাহলে আমরা আপনার কাবা শরীফে পৌঁছার পথে প্রতিবন্ধক হতাম না, না কোন যুদ্ধে অবতীর্ণ হতাম। আপনি বরং এ বাক্যের পরিবর্তে 'মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ্' লিখুন। সেদিন রাসূল (সঃ) এ কথা বলতে বলতে তাদের দাবি মেনে নিয়েছিলেন : আল্লাহ্র কসম, আমি অবশ্যই আল্লাহ্র রাসূল যতই তোমরা অস্বীকার কর না কেন।" এমতাবস্থায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) দলত্যাগীদের বললেন 'তাহলে আমরা এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম'? তারা বলল 'হাঁ'।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বলিষ্ঠ যুক্তির সমন্বয়ে আব্বাস (রাঃ) এর উপরোক্ত জ্ঞানগর্ভ সম্মোহনী বক্তব্যের ফলে অধিকাংশ পত্যাগী মত পরিবর্তন করে। প্রায় বিশ হাজার লোক আবার হযরত আলী (রাঃ) এর দলে প্রত্যাবর্তন করে, অবশিষ্ট চার হাজার হঠকারী সিদ্ধান্তে থাকে। এদের থেকেই পরবর্তীতে খারিজীদের উদ্ভব ঘটে।
উপযর্ুক্ত সাহসিকতাপূর্ণ বলিষ্ঠ যুক্তির ঘটনা ছাড়াও আরও অনেক উপল্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) দ্বন্দ্বের চেয়ে শান্তি এবং বল প্রয়োগ হতে বুদ্ধি ও আকলের প্রাধান্য দিতেন। তিনি শুধু উদ্যম সাহসিকতাই নয় মননশীল অনুধাবন গুণ এবং অবাধ জ্ঞানের আধার হিসেবে ছিলেন সুবিদিত। সৌজন্যবোধ ও আতিথেয়তার েেত্রও তাঁর বেশ সুনাম ছিল। তাঁর সমসাময়িক লোকেরা তাঁর গৃহস্থালির ব্যাপারে বলেন :
"আমরা ইবন আব্বাসের ঘরের ন্যায় এত খাদ্য, পানীয়, ফল ও জ্ঞানের প্রাচুর্যময় ঘর কোথাও দেখিনি।"
মানুষের প্রতি তাঁর ছিল শ্রদ্ধাপূর্ণ অকৃত্রিম বন্ধন। তিনি ছিলেন চিন্তাশীল এবং অন্যের ব্যাপারে চিন্তিত, যত্নশীল। একবার তিনি বলেন,
"আল্লাহ্র কিতাবের বাণীর গুরুত্ব যখন আমি উপলব্ধি করি তখন ইচ্ছা হয় সকল মানুষই যদি জানত যা আমি জানি।"
"যখন শুনতে পাই কোন মুসলিম শাসক সাম্যের ভিত্তিতে ন্যায়পরায়ণতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে, আমি তাতে সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য দোয়া করি।"
"যখন শুনি কোন মুসলিম ভূখণ্ডে বারিপাত হয়েছে তাতে আমি আনন্দিত হই..."
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) তার আনুগত্যে বন্দেগীতে একাগ্রচিত্ত নিবিষ্ট থাকতেন। তিনি নিয়মিত নফল রোযা রাখতেন এবং প্রায়ই রাত জেগে ইবাদত করতেন, সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াতের সময় তিনি কাঁদতেন। যখন মৃতু্য, পুনরুত্থান ও মৃতু্য পরবর্তী জীবন সংক্রান্ত আয়াত তিলাওয়াত করতেন তখন ডুকরে কাঁদার ফলে তাঁর কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে যেত। পার্বত্য শহর তায়েফে একাত্তর বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। (সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০০৭ দুপুর ২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



