আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ)
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা
এটা সেই সময়ের কথা যখন তিনি একজন কিশোর মাত্র, যৌবনে পদার্পণ করেননি। কুরাঈশ গোত্রের এক সর্দার উকবা ইবনে আবু মু'ইতের এক পাল ছাগল নিয়ে তিনি মক্কার গিরিপথগুলোতে চরে বেড়াতেন। লোকে তাঁকে ইবনে উম্মু আবদ "দাসের মায়ের পুত্র" বলে ডাকতো। তবে তাঁর সুন্দর নাম আব্দুল্লাহ এবং তাঁর পিতার নাম মাসউদ।
তাঁর গোত্রে যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটেছে, সে সম্পর্কে নানাবিধ খবর এ কিশোর প্রায়ই শুনতেন। তবে অপরিণত বয়স এবং বেশিরভাগ সময় মক্কার ব্যস্ত সমাজ জীবন থেকে দূরে অবস্থানের কারণে সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে উঠে উকবার ছাগল পাল নিয়ে বের হয়ে যেতেন আর সন্ধ্যায় ফিরতেন। একদিন এ কিশোর দেখতে পেলেন, দু'জন বয়স্ক ব্যক্তি যাদের চেহারায় আত্মমর্যাদার ছাপ বিরাজমান, দূর থেকে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁরা ছিলেন পরিশ্রান্ত, পিপাসার্ত। লোকদ্বয় নিকটে এসে সালাম জানিয়ে বললেন, "বৎস! এ ছাগলগুলি থেকে কিছু দুধ দোহন করে আমাদেরকে দাও। আমরা তা পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করি।"
ছেলেটি বলল, "এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ছাগলগুলি তো আমার নয়। আমি এগুলোর রাখাল ও আমানতদার মাত্র।" লোকদ্বয় তার কথায় বিরাগভাজন হলেন না বরং তাদের মুখমণ্ডলে প্রফুল্লময় দীপ্তি ফুটে উঠল।
এ মহাপুণ্যবান ব্যক্তিদ্বয় আর কেউ নন, স্বয়ং রাসূল (সঃ) এবং তাঁর বিশ্বস্ত সহচর আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)। কুরাঈশদের অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য এ সময় তাঁরা মক্কার নির্জন গিরিপথসমূহে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
কিশোর বালক রাসূল (সঃ) এবং তাঁর সহচরের মহানুভবতায় মুগ্ধ হন। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেকে রাসূলের (সঃ) খাদিম হিসেবে উৎসর্গ করেন। রাসূল (সঃ) তাতে সম্মত হন। সেই দিন থেকে এ সৌভাগ্যবান বালক ছাগলের রাখালবৃত্তি ছেড়ে সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম মানুষের খাদেমে পরিণত হন।
ইবনে মাসউদ (রাঃ) ছায়ার মতো তাঁর মনিবকে অনুসরণ করতেন। গৃহাভ্যন্তরে বা বাইরে তাঁর প্রয়োজন আঞ্জাম দিতেন। সফর কিংবা অভিযানে তাঁর পাশে থাকতেন। রাসূল (সঃ) ঘুমালে তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন, গোসলের সময় পর্দার ব্যবস্থা করতেন, তাঁর মিসওয়াক ও অন্যান্য অনুষঙ্গ বহন করতেন, তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণে তিনি ছিলেন সজাগ ও আন্তরিক।
ইবন মাসউদ (রাঃ), রাসূল (সঃ) এর গৃহে প্রতিপালিত হয়ে বিশেষ প্রশিণ লাভ করেন। রাসূলের প্রত্য ও সযতন অভিভাবকত্বে তাঁরই মতো আচার-আচরণ ও চরিত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হন। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হয় থাকে, "চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনিই রাসূল (সঃ) এর নিকটতম সদৃশ ব্যক্তি।"
ইবন মাসউদ (রাঃ) খোদ রাসূল (সঃ) এর শিালয়ে শিা লাভ করেন। তাই সাহাবীদের মধ্যে তিনি ছিলেন কুরআনের সবচেয়ে ভাল ক্বারী, অর্থ ও ভাবের সবচেয়ে অধিক সমঝদার, আইন শাস্ত্র ও বিধি বিধানের অধিকতম পারদর্শী।
এতদ্প্রসঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল : একবার হযরত উমর (রাঃ) আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল : "আমীরুল মু'মিনীন! আমি কুফা থেকে এসেছি। সেখানে আমি দেখে এসেছি, এক ব্যক্তি নিজের স্মৃতি থেকে মানুষকে কুরআন বলে দিচ্ছেন।" একথা শুনে তিনি এত রাগান্বিত হলেন যে, তাঁকে সচরাচর এত রাগতে দেখা যায় না। তিনি উটের হাওদার অভ্যন্তরে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তারপর প্রশ্ন করেনু তোমার ধ্বংস হোক : কে সেই ব্যক্তি?
উত্তরে বললাম "আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ।"
উমর (রাঃ) এ কথা শুনে শান্ত হলেন, তাঁর রাগ মিইয়ে এলে এরপর বললেন, "রবের কসম, এ কাজের জন্য তাঁর চেয়ে অধিক যোগ্য ব্যক্তি আছে কিনা জানি না। এ ব্যাপারে তোমাকে একটি ঘটনা বলছিু একদিন রাতের বেলা রাসূল (সঃ) আবু বকরের (রাঃ) সাথে মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করছিলেন, আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। কিছু সময় পর রাসূল (সঃ) বের হলেন। এক ব্যক্তি মসজিদে নামাযে দাঁড়িয়ে, তাঁর কিরাআত শুনলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন : "যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করে আনন্দ পেতে চায়, যেন তা এইমাত্র অবতীর্ণ হয়েছে, সে যেন ইবনে উম্মু আবদের পাঠের অনুরূপ পাঠ করে।" এরপর ইবন মাসউদ (রাঃ) বসে দু'আ শুরু করলেন। রাসূল (সঃ) আস্তে আস্তে তাঁকে ল্য করে বলতে লাগলেন : "চাও, কবুল করা হবে। প্রার্থনা কর, মঞ্জুর করা হবে।"
উমর (রাঃ) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, "আমি আগামীকাল প্রতূ্যষেই ইবন মাসউদকে সুসংবাদটি দিব। সকাল সকাল আমি তাঁর কাছে গিয়ে দেখি আবু বকর (রাঃ) আমার আগেই পৌঁছে গেছেন। সত্যিই সৎকাজে আমি কখনই আবু বকর (রাঃ) কে অতিক্রম করতে পারিনি।"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




