বাংলাদেশী বিশেষ করে মুসলমানদের একটা স্বভাব আমি খুব খেয়াল করি, প্রায় তারা বলে-“ভাই এটা ধর্মীয় বিষয়, এটা নিয়ে কথা বলা ঠিক না” কিংবা বলে- “ভাই, সবকিছুর মধ্যে ধর্মকে টানা ঠিক নয়”।
তথাকথিত মডারেট সমাজ ও ডিজুস তরুণ প্রজন্মের জন্য ধর্ম বিষয়ক কথাবার্তা বলা আরো সংবেদনশীল। তাদের এক কথা, “ভাই ধর্ম বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না, প্লিজ এভোয়েট ইট”।
এটা প্রায় সবাই মেনে নিবেন, বর্তমানে সারা বিশ্বে মুসলিমদের অবস্থা সংকটকবলিত। তারা রাজনৈতিক ও পরিপার্শ্বিক দিক হতে অমুসলিমদের সাথে পেরে উঠছে না, ফলে অমুসলিমরা মুসলমানদের ঘাড়ে উঠে বসেছে। তাদের অর্থ-সম্পদ-দেশ লুট করে খাচ্ছে, পাখির মত গুলি করে মারছে, আবার যাওয়ার সময় উল্টো মুসলিমদের ‘জঙ্গী’ বলে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে।
বলাবাহুল্য, সারা বিশ্বে মুসলিমদের জনসংখ্যা কিন্তু কম নয়, অনেক। এটা প্রায় সবাই মানে, ‘ইসলাম ইজ দ্য ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং রিলিযিওন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। কিন্তু তারপরও কেন মুসলিমরা পারছে না, কেন তারা অমুসলিমদের হাতে মার খাচ্ছে ?
ঐ যে একটি কারণ, তারা তাদের ধর্মীয় বিষয় আলাপ করতে নারাজ, তারা সব কাজের ভেতর ধর্ম খুজতে নারাজ। ধর্মীয় বিষয়ে কথা উঠলেই তারা সোজা বলে দেয়- “প্লিজ, যাস্ট এভোয়েট ইট”।
এর অবশ্য কারণও আছে। যারা মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, বিশেষ করে জায়ানিস্টরা দীর্ঘদিন মিডিয়ায় এন্টি ইসলামীক প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। দিনের পর দিন অপপ্রচার করে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে সমর্থন হয়েছে যে, অমুসলিমরা নয়, খোদ মুসলিমরাই তাদের ধর্ম নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছে, প্রকাশ্যে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করছে, ধর্মীয় পোষাক পরলে অপর মুসলিমই তাকে জঙ্গী ট্যাগ দিচ্ছে, ‘আবার সন্ত্রাসী হয়ে যায় কি না’ এই ভয়ে ধর্ম বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, ফেসবুকে লাইক পেইজে যেন কোন ধর্মীয় পেইজ না থাকে কিংবা ভুলেও যেন কোন ধর্মীয় ইস্যুতে লাইক না পড়ে সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখছে।
অর্থাৎ বর্তমান মুসলিমরা সমাজ চাইছে, তারা এমন একটা মডারেট পলিসি অবলম্বণ করবে, যেখানে ধর্ম ও বাস্তব জীবন পৃথক হবে। সে সারাদিন বাইরে পড়ালেখা-ব্যবসা বাণিজ্য-বন্ধুবান্ধব করবে কিন্তু ধর্মের পরিচয় বা কাজ করবে না, তবে হ্যা ঘরে এসে দরজা আটকে ধর্ম-কর্ম করবে, কেউ তার ধর্ম দেখবে না, বুঝবে না। ধর্ম-কর্মটা হবে ব্যক্তিগত বিষয়। ধর্ম-কর্ম করলে আড়াল করে করতে হবে, কাউকে দেখানো যাবে না, বুঝানো যাবে না, এই ট্রেন্ডটা কিন্তু নতুন নতুন বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে প্রবেশে করেছে । এটা অবশ্য বাংলাদেশের এলিট শ্রেনী অনেক আগেই গ্রহণ করেছিলো।
আমি আজ থেকে অনেক দিন আগেই শুনেছি, কোরবানী ঈদ আসলে বাংলাদেশের এলিট শ্রেনীর অনেকেই বিদেশে চলে যায়, কারণ সে কোরবানী সময় পশু জবাই করছে, এটা তার কমিউনিটি বা বিদেশী বন্ধুদের জানাতে চায় না। তবে হ্যা, গ্রামে গরু কেনার টাকা পাঠিয়ে দেয়, সেখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে তার কোরবানী আদায় হয়। এলিট শ্রেনীর সেই কার্যকলাপগুলো এখন সাধারণ শিক্ষিত সমাজেও প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
তবে আমার লেখার যে উদ্দেশ্য, বর্তমান মুসলিম সমাজ যাদের সুদৃষ্টি পাওয়ার জন্য কিংবা যাদের সাথে তাল মিলানোর জন্য মডারেট সাজতেছে, সেই পশ্চিমারা কি তাদের ধর্ম-কর্ম গুরুত্ব দেয়, জনসম্মুখে পালন করে ?
এর সবচেয়ে সহজ উত্তর হচ্ছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দেখুন, যে যখন প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় শপথ নিয়েছিলো, তখন সে কিসের উপর হাত রেখে শপথ করেছিলো ? উত্তর হচ্ছে বাইবেলের উপর। তারমানে তাদের মূল ক্ষমতা নির্ভর করে ধর্ম ভিত্তিক বিশ্বাসের উপায়ে, যা প্রকাশ্য জনগণ স্বীকৃত, এখানে লজ্জার কিছু নেই।
আপনি ইউরোপের পতাকাগুলোর দিকে তাকান, প্রায় ৯০% পতাকায় ক্রুশ কিংবা খ্রিস্ট জাতীয়তাবাদের প্রতীক দেখতে পাবেন। তারা কিন্তু মডারেট সাজতে গিয়ে তাদের ধর্মকে পতাকা থেকে বাদ দেয়নি।
আবার লক্ষ্য করুন, পশ্চিমাদেশগুলোতে কিন্তু উগ্র খ্রিস্টান ডানপন্থী রাজনৈতিকগুলোর প্রচুর্য আছে, অনেকে আবার ক্ষমতায়ও আসছে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও উগ্র জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায়। কিন্তু একটু কল্পনা করুন তো, বাংলাদেশে কোন মুসলিম সংগঠন ক্ষমতায় এসেছে, তবে কি হবে ? তাকে কি জঙ্গী ট্যাগ দেওয়া হবে ? কিংবা পশ্চিমাদেশগুলো জঙ্গী দমনের নামে তার উপর হামলা চালাবে না তো?
আমি দেখেছি, অনেকেই বলে, “ভাই ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াবেন না, সভ্য সমাজ ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো পছন্দ করে না”।
আমি জানি না, সভ্য সমাজের সংজ্ঞা কি। কারণ ইউরোপ-আমেরিকায় প্রত্যেক দেশে নির্বাচন আসলে ধর্মীয় বিদ্বেষপূর্ণ কথার ফুলঝুরি শুরু হয়। ডানপন্থী দলগুলোর কথা বাদ দিলাম, বামপন্থী দলগুলোও প্রকাশ্যে মুসলিম বিরোধী বক্তব্য দেওয়া শুরু করে,
উগ্র খিষ্টানদের ভোট পাওয়ার জন্য বলে- “আমরা দল ক্ষমতা গেলে এই দেশ হতে মুসলিমদের তাড়িয়ে দেবো, হালাল খাবার, হিজাব নিষিদ্ধ করবো।মসজিদের মিনালগুলো ভেঙ্গে দিবো, গির্জার থেকে মিনার বড় হতে দিবো না।” একথাগুলো বলতে বা শুনতে কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকানরা লজ্জা পায় না।
আমি বলবো- এই ধর্মীয় আলোচনা প্রকাশ্যে তথা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করার কারণেই পশ্চিমারা আজ কর্তৃত্ব লাভ করেছে, মুসলিমদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। অপরদিকে মুসলিম সমাজ ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে পারেনি বলেই তারা মূল ট্র্যাক থেকে ছিটকে পড়েছে।
কারণ ধর্মের দ্বারা জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয়, একতাবোধ জাগ্রত হয়, অপর জাতি থেকে শ্রেষ্ট হওয়ার আকাঙ্খা তৈরী হয়। কিন্তু ধর্মকে যদি দূরে ঠেলে দেওয়া যায়, তবে ঐ জাতির জাতীয়তাবোধ ও একতা নষ্ট হয়, তারা পরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে, ঐ জাতির বড় হওয়ার ইচ্ছা-আকাঙ্খা নষ্ট হয়ে যায়।
তাই মুসলমানদের আবার মূল ট্র্যাকে ফিরে আসার একটাই পথ, ফের ধর্মীয় আলোচনা শুরু করতে হবে, সবকিছুর মধ্যে ধর্মকে টানতে হবে। যদি এটা মুসলিম সমাজ করতে পারে তবে অবশ্যই তারা কর্তৃত্ব লাভ করতে পারবে, ফিরে পাবে তাদের পুরাতন ঐতিহ্য...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


