আজ মেঘবালিকার মন ভালো নেই।দেখা হওয়ার পর থেকেই চুপ করে আছে।অর্ককে দেখলে যে চোখ হাসত সে চোখ আজ বিষাদময়।
কি হয়েছে তোমার?চুপ করে আছো কেন?
তোমার অস্তিত্ব আমায় যন্ত্রণা দেয়।মেঘবালিকার সোজাসাপটা উত্তরে চমকে উঠে অর্ক।
আজকাল দেখি ফিলসফি ভালোই শিখেছ।আমার অস্তিত্ব আছে নাকি তোমার কাছে?
আছে,তবে না থাকলেই ভালো হত।ফুটপাতে বসে থাকা এক শিশুর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল মেঘবালিকা।আজ ফুরফুরে মেজাজেই মেঘবালিকার সাথে দেখা করতে এসেছে অর্ক।কিন্তু মেঘবালিকার কথার গভীরতা অর্ককে কৌতুহলি করে তোলে।
আমার দুটি নির্লিপ্ত চোখ ছিল।যে চোখ দিয়ে আমি চারপাশের বেঁচে থাকা দেখতাম।সে বেঁচে থাকার সার্থকতা যাচাই করার ক্ষমতা আমার ছিল না।কিন্তু তুমি আমায় শিখিয়েছ কিভাবে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে বের করতে হয়।আমি শুধু বেঁচে থাকার জন্যই বাঁচতে শিখেছিলাম।বিষণ্ণ কণ্ঠে কথাগুলো বলে গেল মেঘবালিকা।
আমি তোমায় নবজন্ম দিয়েছি।সেই জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম সেদিন তুমি মৃত ছিলে।সমাজ,রাষ্ট্র তোমায় বাধ্য করেছিল মরে যেতে।তোমার স্বত্বাবিহীন দেহের বিনিময়ে ওরা তোমাকে বেঁচে থাকার মূল্য দিত।
অর্কের জবাবে হেসে ফেলে মেঘবালিকা।তুমি আমার ঈশ্বর হতে চেয়েছিলে।তাই আমাকে নতুন করে সৃষ্টি করা তোমার কাছে খেলামাত্র।আমার পূর্বের আমিতেও আমার কোন হাত ছিলনা,বর্তমানের আমিতেও আমার কোন হাত নেই।টাকার বিনিময়ে ওরা আমার দেহের আনাচে কানাচে কি খুঁজত তা কখনও বোঝার চেষ্টা করিনি।আমি শুধু বুঝতাম আমার একটি দেহ আছে যা বিক্রি করলে আমি তিনবেলা ভাতখেতে পারব।লোকে আমায় বেশ্যা বলত।আমার কাছে সেটাই স্বাভাবিক মনে হত।এছাড়া অন্য কোন অস্তিত্ব আমার ছিলনা।কিন্তু তারপর সেই রাতে যেদিন তুমি জ্যোৎস্না উৎসব করবে বলে রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছিলে সেদিন আমার অস্তিত্ব তোমাতে বিলীন হয়ে গেছে।তারপর তুমি যখন আমায় একটু একটু করে জীবনের মানে শিখাচ্ছিলে তখন অনেক কিছুর সাথে আমি এটাও বুঝতে পেরেছিলাম তুমি কখনও আমার কেউ হবে না।আমি তোমার মনের খোরাক ছাড়া আর কিছুই নই।তুমি সবকিছু থেকে আমায় মুক্ত করে আমাকে তোমার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছো।
লীলাকে নিয়ে তোমার জটিলতাটা আমি বুঝি।শান্তস্বরে বলল অর্ক।তুমি এবং লীলা দুজন দুজনকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছ।তোমরা ভালোবাসার নামে অধিকার আদায়ের এমন এক খেলায় মেতে উঠেছ যার কোনও অর্থ হয়না।যেদিন তোমায় প্রথম দেখলাম সেদিন আমার বাস ছিল কোন এক অপার্থিব জগতে।তুমি তখন কোন এক খদ্দেরের সাথে টাকা নিয়ে ঝগড়া করছিলে।তোমাকে দেখে এবং তোমার অশ্রাব্য গালি শুনে আমার ঘোর ভেঙ্গেছিল।লীলাকে মনে হয়েছিল অনেক দূরের কেউ যে কোন এক সাজানো বাগানে ঘুমিয়ে আছে।তোমাকে দেখে সেদিন মনে হয়েছিল এই রাষ্ট্র,সমাজ সব ভেঙে চূড়মার করে দেই।কিন্তু রাষ্ট্র এবং সমাজকে স্পর্শ করার ক্ষমতা আমার ছিলনা।কিন্তু তোমাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার ক্ষমতা আমার ছিল।তুমি বলেছিলে তোমার সাথে যেসব মেয়েরা থাকে তাদেরকেও মুক্তি দিতে হবে।আমি সামান্য এক মানুষ যে তোমাকে দিয়ে নিজের অক্ষমতা আড়াল করছি।আমি কখনই তার চেয়ে বেশী কিছু ছিলাম না।আমি তোমার ঈশ্বর হতে চাইনি বরং তুমি আমাকে মানুষ থেকে দেবতা বানিয়েছ।তুমি এবং লীলা দুজনেই আমার একমাত্র পূজারি হওয়ার হাস্যকর লড়াইয়ে মত্ত।
তুমি যখন লীলার শরীরে ভালবাসা খুঁজে ফির তখন আমি কোন এক শূন্যতায় হারিয়ে যাই।আমায় ভালোবেসে কখনও কেউ স্পর্শ করেনি।যখন ভালোবাসার স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে তখন তোমার কথা মনে পরে।তখন লীলাকে খুব হিংসা হয়।মনে হয় লীলাকে খুন করে ফেলি।এক সময় আমার চাওয়া পাওয়ার কোন মূল্য ছিলনা।কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার খুব চাইতে ইচ্ছে করে।তোমাদের এই চাওয়া পাওয়ার জগত আমার জন্য নয়।এবার আমার মুক্তির পথ আমি নিজেই খুঁজে বের করেছি।
সিগারেট ধরিয়ে পরপর কয়েকটা টান দিল অর্ক।তারপর মেঘবালিকার দিকে তাকিয়ে বলল,মানুষের চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারটি আপেক্ষিক।মানুষ যা পায় তা নিয়ে কখনও তৃপ্ত হয় না।লীলার সাথে আমার শারীরিক সম্পর্ক তোমার মধ্যে বঞ্ছনার জন্ম দেয়।কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে লীলাও নিজেকে বঞ্ছিত ভাবে।সে ভাবে আমি তার মাঝে তোমাকে খুঁজে ফিরি।তুমি এবং লীলা দুজন দুই জগতের বাসিন্দা।তুমি বড় হয়েছ এক যন্ত্রণাময় নিষ্ঠুর পৃথিবীতে।লীলার পৃথিবীতে ছিল স্নেহের স্পর্শ।কিন্তু তোমরা যখন নিজেদের চাওয়া পাওয়া নিয়ে চিন্তা কর তখন তোমাদের ভাবনায় আমি কোন পার্থক্য খুঁজে পাইনা।তোমরা দুজনেই ভালোবাসার সাথে বন্ধন তৈরি করতে চাও,কিন্তু ভালোবাসতে চাওনা।তোমাদের জন্যই হয়তোবা আমার প্রিয় কবি কাহ্লিল গিব্রান তার কবিতায় বলেছেন “ভালোবাসো,কিন্তু ভালোবাসার সাথে বন্ধন তৈরি করিও না”।
এখানে আসার আগে আমি লীলার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম,বলা ভালো আমি লীলাকে খুন করব ভেবেছিলাম।মেঘবালিকার কথায় চমকে উঠে অর্ক।যখন বেশ্যাপল্লীতে ছিলাম তখন মানুষের দৃষ্টিতে ঘৃণার অস্তিত্ব বুঝতে শিখেছিলাম।আজ লীলার চোখে আমি সেই ঘৃণা দেখেছি।আমি যখন আমার ব্যাগ থেকে ছুড়ি বের করি তখন লীলার দৃষ্টিতে ঘৃণার পরিবর্তে ভয় দেখে আমি শিহরিত হই।একটু একটু করে লীলার দিকে এগুতে থাকি।লীলা হাতজোড় করে আমার কাছে ক্ষমা চায়।তারপর আমি লীলার মুখে শুনি তুমি বাবা হতে যাচ্ছ।লীলার গর্ভে তোমার সন্তান।লীলা ভেবেছিল সন্তানের কথা জেনে আমি হয়তোবা তাকে আঘাত করব না।কিন্তু আমার কেন যেন খুব ভাল লাগছিল।আমি অবশ্য খুব বেশী সময় অপেক্ষা করিনি।তোমার স্পর্শে লীলা আর কখনই জাগবে না।
মেঘবালিকা কথা শেষ না করতেই তার গলায় হাতের স্পর্শ পায়।অর্কের হাত সাঁড়াশির মত চেপে বসে মেঘবালিকার গলায়।অর্কের চোখে খুনের নেশা।যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে মেঘবালিকা।মনে হয় অনন্তকাল ধরে সে একটু দম নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।তারপর সময়ের আবর্তে সব অপেক্ষার অবশান হয়।মেঘবালিকার নিথর দেহ লুটিয়ে পড়ে অর্কের কোলে।
মেঘবালিকার নিথর দেহ কোলে নিয়ে বসে আছে অর্ক।আত্মিক শূন্যতায় উঠে দাঁড়াবার মত কোন শক্তি তার নেই।এমন সময় পরিচিত রিংটোনে হুঁশ ফেরে অর্কের।মোবাইলে ভেসে উঠে লীলার নাম।লীলার পরিচিত মিষ্টি স্বরে গা গুলিয়ে উঠে অর্কের।লীলা অপরপ্রান্ত থেকে বলে যায় তোমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করছি।তাড়াতাড়ি বাসায় আসো।আজ রাতে ভাবছি তোমার মেঘবালিকাকে দাওয়াত দিব।কি ব্যাপার!তুমি কথা বলছ না কেন?
আর কিছু শুনতে পায় না অর্ক।মোবাইল ছুড়ে ফেলে দেয় সে।তারপর পাগলের মত মেঘবালিকার চোখে নাকে ঠোঁটে চুমু দিতে থাকে।কিন্তু অর্কের স্পর্শে জেগে উঠে না মেঘবালিকার নিথর দেহ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



