
পাচশ টাকার ১৬ টা নোট। মোটে আট হাজার টাকা। ম্যানেজার সাহেব হাসি মুখে বললেন “জীবনের প্রথম ইনকাম, বিসমিল্লাহ বইলা হাতে নেন”। ম্যানেজার সাহেবের রুমে জ্বলতে থাকা একশ ওয়াট ফিলিপস বাতিটার মিটমিটে আলোর এক সন্ধ্যায় আমি মহান আল্লহর নাম স্মরণ করে টাকাগুলো হাতে নিলাম। অফিসের কোল ঘেষে বয়ে চলা শীতলক্ষ্যা নদীর উপরে তখন দু-একটি তারা কেবল ফুটছে। সে ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে রইলেন বেতনের জন্য অপেক্ষমাণ আমার অন্যান্য সহকর্মীরা। আমার বেতন পাওয়া দেখে তারাও খুব খুশি। অনর্থক, অকারণ, ব্যাখ্যাহীন এক নির্ভেজাল আনন্দ।
অবশ্য এটা আমার জীবনের প্রথম ইনকাম ছিলোনা। এটা ছিলো চাকরীর প্রথম বেতন। অভাবের তাড়নায়, বেচে থাকার লোভে বহু আগেই আমি উর্পাজনের পথে নেমেছিলাম। আই হেইট মাই ন্যাস্টি লাইফ।
টাকাটা নিতে আমার কেন যেন একটু লজ্জা লজ্জা লাগছিলে, মনে হচ্ছিল অন্যের টাকা আমি নিচ্ছি এবং আমি আমার অনুভুতি প্রাণপণে চেপে রাখতে চাইছিলাম। অবশেষে আমি ব্যাপক অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে কিছুটা নির্বিকার ভাবে কাজটা সারলাম। ফলশ্রুতিতে আমার যথেষ্ট বিনয়ের অভাব এবং আবেগশুন্য ভাব দেখে ম্যানেজার সাহেব যেন একটু বিরক্ত হলেন। নিতান্ত পক্ষে আমার একটু হাসা উচিত ছিলো। কাষ্ঠ, ভদ্রতামূলক হাসি। ম্যানেজার সাহেব আমাকে বললেন আমি যাতে ফোন করে আমার মা কে বেতন পাওয়ার কথাটি জানাই। তার ধারণা আমার বেতন পাওয়ার কথা শুনে মা খুশি হবেন। দুনিয়ার সবাই হয়তো তার প্রথম বেতন পাবার কথাটি মাকেই জানায়।
আমাদের বেতন হতো প্রতি মাসের ২৭-২৮ তারিখের দিকে। সবসময় ম্যানেজার সাহেবের মন-মেজাজ খারাপ থাকলেও বেতনের দিন সকাল থেকেই তার মন খুব ভালো থাকতো। তিনি নিজ হাতে তার বাহিনির সবাইকে বেতন দিতে ভালোবাসতেন। আমরাও সারামাস একজন আরেকজনের পেছনে লেগে থাকতাম, যে যখন সুযোগ পেতাম আরেকজনকে নাকানী চুবানী খাওয়ানোর ধান্দায় থাকতাম। প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহটি যেন আমাদের জন্য আর্শীবাদ হয়ে আসতো। টাকা হাতে পেয়ে আমরা সব ভুলে যেতাম। বেতন পাবার প্রথম সপ্তাহটি আমরা খুব ধুমধাম করে কাটাতাম। সবার মধ্যে কেমন জানি একটা বড়লোকি ভাব চলে আসতো। সবচেয়ে বেশি ভাব আসতো ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের মধ্যে। বেতন পেলেই ওনার মিসকল দেবার স্বভাবটা কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যেত। কারণে অকারণে সবাইকে ফোন করে জ্বালিয়ে মারতেন। আমরা একসাথে চা-বিড়ি খেতে বের হলে বিল দিতেন ওয়ালিউল্লাহ ভাই। মাসের ১৫ তারিখের পর সবার মধ্যে আবার সেই ঝিমমারা অবস্থা। ওয়ালিউল্লাহ ভাই আবার সবাইকে মিসকল দিতে শুরু করেছেন। আহ কবে আসবে ২৭-২৮ তারিখ।
তারপর পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় বহুজল গড়িয়েছে, কালের ঘড়ি সহস্রবার অতিক্রম করেছে তার নির্ধারিত দাগগুলো তবু এখনো বেতন পাবার অনুভুতিগুলো পুরনো হয়ে যায়নি। এখনো প্রতি মাসশেষে বেতন পাবার সময় হলে আনন্দে মনটা ভরে উঠে; আবারো চোখে ঝিলিক দিয়ে যায় অধরা স্বপ্নগুলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




