somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ওয়াকা ওয়াকা, কে পাঠিয়েছে তোমাকে?

৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গানটা আমি গেয়েছি বহুবার। ২০১০ সালে গেয়েছি, তারপরও বহু বছর। কী গাইছি, জানতাম না। কেউ জানত বলেও মনে হয় না। 'সামিনা মিনা এ এ, ওয়াকা ওয়াকা এ এ'- এই এক লাইন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ মুখস্ত করে ফেলেছিল, অথচ লাইনের মানে জানার তাগিদ কারো হয়নি। আমারও হয়নি।

গানের পেছনের গল্প জানার পর, একে আর আগের মতো করে শোনা যায় না।

ফাং ভাষায় 'সামিনা মিনা' মানে, এসো। 'ওয়াকা ওয়াকা' মানে, করো, কাজটা করে ফেলো। আর 'সাঙ্গালেওয়া' মানে, তোমাকে কে ডেকেছে? কে পাঠিয়েছে তোমাকে এখানে?

উত্তরও গানের ভেতরেই আছে। 'আনাওয়াম'। আমি। আমিই নিজেকে পাঠিয়েছি।

তারমানে ফুটবলের ঐ ভরা গ্যালারি, ঐ কোটি কোটি টেলিভিশন, ঐ গোটা এক মাস- সবাই মিলে গলা ফাটিয়ে যা গাইছিল, ওটা আসলে উৎসবের গান না। ওটা একজন পাহারাদারের প্রশ্ন। রাতের গেটে দাঁড়ানো সেন্ট্রি অন্ধকার থেকে আসা কাউকে থামিয়ে জানতে চাইছে, কে পাঠিয়েছে তোমাকে? পুরো পৃথিবী এক মাস ধরে চেকপোস্টের প্রশ্ন গেয়েছে। কেউ থামেনি উত্তর দিতে।

গানের জন্ম ১৯৮৬ সালে, ক্যামেরুনে, ম্যারাডোনার বিশ্বজয়ের বছর। ব্যান্ডের নাম গোল্ডেন সাউন্ডস। এই ব্যান্ডের লোকজন পেশাদার শিল্পী ছিলেন না। তারা ছিলেন ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের কর্মরত সদস্য। প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষী। রিপাবলিকান গার্ডের অর্কেস্ট্রা থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকজন সৈনিক। জঁ পল জে বেলা, দু বেলে, লুক এয়েবে, এমিল কজিদি।

অর্থাৎ, 'কে পাঠিয়েছে তোমাকে' প্রশ্ন যাদের চাকরি, তারাই প্রশ্ন দিয়ে গান বানিয়েছে। আর প্রশ্ন ছুঁড়েছে নিজেদের ইউনিফর্মের দিকে।

গানের কথাগুলো সাধারণ রিক্রুটের নালিশ। বাজে খাবার, নামমাত্র বেতন, অমানুষিক ট্রেনিং। আর ঐ ভুঁড়িওয়ালা অফিসার, যে বেনিয়ে চিবোতে চিবোতে হুমকি দেয়, মাথা কামিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেব। বেনিয়ে হলো পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় জনপ্রিয় ভাজা মিষ্টি পিঠা, ফরাসিদের ফেলে যাওয়া খাবার।

কিন্তু আসল খোঁচা কথায় নয়, পোশাকে।

১৯৮৬ সালে 'সাঙ্গালেওয়া'র নিজস্ব একটা মিউজিক ভিডিও হয়েছিল, আফ্রিকায় তখন সবে মিউজিক ভিডিও ছড়াতে শুরু করেছে। ঐ ভিডিওতে গোল্ডেন সাউন্ডসের সদস্যরা জামার ভেতর বালিশ ঢুকিয়ে ভুঁড়ি আর পাছা ফুলিয়ে রেখেছেন। মাথায় পিথ হেলমেট। হাতে সোয়াগার স্টিক। আর মুখের অর্ধেক সাদা রঙ করা। ভিডিও বানানোই হয়েছে ক্যামেরুনের আসল সামরিক প্যারেডের ফুটেজের উপর ব্লু-স্ক্রিনে ব্যান্ডকে বসিয়ে।

পিথ হেলমেট, সোয়াগার স্টিক, সাদা রঙ। এই তিনটার একটাও ক্যামেরুনের সেনাবাহিনীর নিজের নয়।

পিথ হেলমেট হলো ঐ শক্ত সাদাটে টুপি, যেটা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের সৈন্যদের 'গরম দেশে' পাঠানোর সময় মাথায় চাপিয়ে দিত। নিখাদ উপনিবেশের প্রতীক। সোয়াগার স্টিক হলো ঐ ছোট্ট লাঠি, নেপোলিয়ন যেটাকে অপরিহার্য ভাবতেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় উঠেই গিয়েছিল, টিকে ছিল শুধু কিছু জেনারেলের হাতে।

আর অর্ধেক সাদা করা মুখ হলো সবচেয়ে নির্মম রসিকতা। এরমানে এই লোক আফ্রিকান, তবে অর্ধেক। বাকি অর্ধেক যার হয়ে সে বন্দুক ধরে।

ইওরুবা মিথলজিতে এশু নামে একজন দেবতা আছেন। চৌমাথার দেবতা, বার্তাবাহক, এবং ভয়ানক রকমের ত্রিকস্টার। তাকে নিয়ে সবচেয়ে চেনা গল্প হলো, এশু একদিন টুপি পরে দুই বন্ধুর মাঝখান দিয়ে হেঁটে যান। টুপির একদিক সাদা, অন্যদিক কালো। ঐদিনের পর দুই বন্ধু আজীবনের শত্রু হয়ে যায়, কারণ দু'জনই নিশ্চিত, সে ঠিক দেখেছে।

গোল্ডেন সাউন্ডস ঐ টুপিই মুখে এঁকে নিয়েছিল।

প্রভুর পোশাক পরে প্রভুকে নকল করা অবশ্য তাদের আবিষ্কার নয়। ১৯৫৫ সালে ফরাসি নৃতাত্ত্বিক জঁ রুশ 'লে মেত্র ফু' নামে একটা তথ্যচিত্র বানান, যেখানে দেখা যায় নাইজারের হাউকা সম্প্রদায়ের মানুষ এক আচারে ঔপনিবেশিক অফিসারদের নিজেদের শরীরে ভর করাচ্ছে, তাদের হাঁটা নকল করছে, তাদের হুকুম নকল করছে। মাথায় কী ছিল ওদের? পিথ হেলমেট।

প্রভুকে হুবহু নকল করা আফ্রিকার পুরনো প্রতিরোধ। যাকে তুমি নিখুঁত নকল করতে পারো, সে আর তোমার ঈশ্বর থাকে না।

সুর নিয়ে এইবার বলি, কারণ ওখানেও গল্প জমে আছে।

'সাঙ্গালেওয়া' একটা মাকোসা গান। মাকোসা ক্যামেরুনের দুয়ালা শহরের সঙ্গীত, নামটা এসেছে 'কোসা' নামের এক নাচ থেকে। বেজলাইনই ওখানে ইঞ্জিন, উপরে হর্ন, নিচে অবিরাম চার মাত্রার ধাক্কা। পুরোপুরি নাচের জন্য বানানো সঙ্গীত।

মাকোসার সবচেয়ে বিখ্যাত গানের নাম 'সোল মাকোসা'। ১৯৭২ সালে বানিয়েছিলেন ক্যামেরুনের স্যাক্সোফোনিস্ট মানু দিবাঙ্গো। এই গান তিনি বানিয়েছিলেন ঐ বছরের আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সের জন্য। ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য।

ক্যামেরুন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল। গান রয়ে গেল।

গানের ভেতর দুয়ালা ভাষায় মন্ত্রের মতো এক লাইন ছিল, 'মামাকো মামাসা মাকো মাকোসা'। নিউ ইয়র্কের এক ডিজে ব্রুকলিনের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান রেকর্ডের দোকানে গানটা খুঁজে পান, আর ওখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীতে।

তারপর ১৯৮৩ সালে মাইকেল জ্যাকসন ঐ লাইন তুলে নিলেন থ্রিলার অ্যালবামের 'ওয়ানা বি স্টার্টিন সামথিন' গানে। দিবাঙ্গো মামলা করেন, আদালতের বাইরে মীমাংসা হয়। এরপর ২০০৭ সালে রিহানা আবার ঐ লাইন ব্যবহার করতে চাইলেন, অনুমতি চাইলেন জ্যাকসনের কাছে। জ্যাকসন অনুমতি দিয়ে দিলেন। দিবাঙ্গোকে কেউ জিজ্ঞেসও করল না।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, পঁচাত্তর পেরোনো বয়সে, দিবাঙ্গো প্যারিসের আদালতে দ্বিতীয়বার দাঁড়ালেন। নিজের দশটা সিলেবল ফেরত চাইতে। আদালত তার দাবি গ্রহণযোগ্যই মানেনি।

ঠিক এক বছর পর, ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, নিউ ইয়র্কের এক স্টুডিওতে আরেকটা ক্যামেরুনিয়ান কোরাস রেকর্ড হচ্ছিল।

এরপর গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশ, গান সমুদ্র পেরিয়ে গেল।

আশির দশকে কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলে, কার্তাহেনা আর বারানকিয়ার গরিব পাড়াগুলোতে রাস্তা জুড়ে বসত পিকো। বিশাল, রঙচঙে, হাতে বানানো সাউন্ড সিস্টেম। সারারাত বাজানো হতো। আর ওখানে যা বাজত তার বেশীরভাগই আফ্রিকান রেকর্ড। কঙ্গোর, ক্যামেরুনের, নাইজেরিয়ার, দক্ষিণ আফ্রিকার। যে ভাষার একটা শব্দও ঐ শ্রোতারা বুঝত না।

পিকোওয়ালাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল সাংঘাতিক। কার কাছে সবচেয়ে দুর্লভ গান আছে। ফলে তারা রেকর্ডের গায়ের লেবেল চেঁছে তুলে ফেলত, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী গানের নাম বা শিল্পীর নাম জানতে না পারে। তারপর গানের নতুন নাম নিজেরাই দিয়ে দিত।

কলম্বিয়ায় 'সাঙ্গালেওয়া' পরিচিত হলো 'দ্য মিলিটারি' নামে। নাম নেই, শিল্পী নেই, দেশ নেই। যেন গানের পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

তারপর স্থানীয়রা গানের নিজস্ব ভার্সন বানাল, নাম 'এল নেগ্রো নো পুয়েদে'। এক কৃষ্ণাঙ্গ লোককে নিয়ে গান, যার ঘুম আসে না। ভিডিওতে কোনো সৈনিক নেই। কোনো পিথ হেলমেট নেই। শুধু অন্তর্বাস পরা কিছু নারী নাচছে। উপনিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কয়েক বছরের মধ্যেই হয়ে দাঁড়াল নিছক নাচের গান। কেউ টেরও পেল না।

পশ্চিম আফ্রিকার আকান লোককথায় আনানসি নামে এক মাকড়সা আছে, যে পৃথিবীর সমস্ত গল্পের মালিক। দাসজাহাজে চড়ে আনানসিও আটলান্টিক পেরিয়েছিল, ক্যারিবিয়ানে গিয়ে তার নাম পাল্টে হয়েছে অ্যানান্সি। দেবতারা টিকে থাকে, নাম খুইয়ে। গানও তাই।

শাকিরার জন্ম বারানকিয়ায়। ঐ শহরে, যেখানে পিকো বাজে। তিনি ছোটবেলায় ঐ গান শুনেছিলেন কিনা, কেউ জানে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, উরুগুয়ের এক খামারে হাঁটতে হাঁটতে গানের প্রথম অন্তরাটা তার মাথায় এসেছিল। কোরাস কোথা থেকে এসেছে, ঐদিন তিনি বলেননি।

আকান জাতির প্রতীক হলো সানকোফা। একটা পাখি সামনের দিকে উড়ছে, অথচ ঘাড় সম্পূর্ণ পেছনে ঘুরিয়ে নিজের পিঠ থেকে ডিম তুলে নিচ্ছে। এরমানে হলো, ফেলে আসা জিনিস ফিরে গিয়ে কুড়িয়ে আনা লজ্জার কিছু নয়।

এই গান চব্বিশ বছর পর আফ্রিকায় ফিরল। ফিরল এক কলম্বিয়ান নারীর গলায়, যার পরিবার লেবানিজ, যার নামের অর্থ আরবিতে 'কৃতজ্ঞ'। সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যান্ড ফ্রেশলিগ্রাউন্ড, যারা কোসা ভাষায় গাইল, এবং যাদের পাওয়া গিয়েছিল নিতান্তই কাকতালীয়ভাবে, নিউ ইয়র্কের ঐ একই স্টুডিও বিল্ডিংয়ে তারা তখন নিজেদের অ্যালবাম রেকর্ড করছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকা খুশি হয়নি। সেখানকার প্রায় পাঁচশো শিল্পীদের এক ইউনিয়ন, শাকিরার পারফরম্যান্স বয়কটের ডাক দিয়েছিল। আফ্রিকার বিশ্বকাপে আফ্রিকার গান কেন একজন বিদেশি গাইবে, এই ছিল প্রশ্ন।

গানটা এত সহজে দখল হলো কেন, ঐ উত্তরও সুরের ভেতরেই রাখা আছে।

'সাঙ্গালেওয়া' আসলে গান না। ওটা কল অ্যান্ড রেসপন্স। মূল ভার্সনে একজন এক লাইন গায়, আর গোটা দল প্রতি লাইনের শেষে জবাব দেয়, 'এওয়া'। এক ডাক, বহু উত্তর। এই কাঠামোর নাম মার্চিং ক্যাডেন্স। পৃথিবীর প্রতিটা সেনাবাহিনী এভাবেই সৈনিকের পা মেলায়।

আর ক্যাডেন্সের ধর্মই আলাদা। ক্যাডেন্স বোঝার সুর না, পা মেলানোর সুর। 'এ এ' কোনো শব্দ না, ওটা একটা ফাঁকা জায়গা, যেখানে বুট এসে পড়ে। ঐজন্যই গানটা অর্থ ছাড়াই গাওয়া যায়। ঐজন্যই কোটি কোটি মানুষ ফাং ভাষার প্রশ্ন এক মাস ধরে গেয়েছে, একবারও না বুঝে।

স্টেডিয়ামও তো ফরমেশনই। আশি হাজার মানুষ সুর শিখতে পারে না, কিন্তু জবাব দিতে পারে। যে গান ব্যারাকে সৈনিকের পা মেলাতে পারে, গ্যালারিতে আশি হাজার গলা মেলাতে পারবে না কেন?

এই গান বিশ্বকাপের জন্য বানানো হয়নি, কিন্তু চব্বিশ বছর আগে থেকে বিশ্বকাপের জন্যই তৈরী ছিল।

ফ্রেশলিগ্রাউন্ডের গায়িকা জোলানি মাহোলা এক সাক্ষাৎকারে ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। গানটা আসলে একটা চ্যালেঞ্জ, তিনি বলেছিলেন, মার্চিং ব্যান্ডের চ্যালেঞ্জের মতোন, দেখিয়ে দেব ধরনের। ঐ গোটা প্রকল্পের একমাত্র মানুষ যিনি গানটাকে ঠিকভাবে চিনতে পেরেছিলেন। এবং কথাটা তিনি বলেছিলেন এমন এক সাক্ষাৎকারে, যেটা কেউ পড়েনি।

২০১০ সালের অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে এখন যা বলব, ওটা সম্পূর্ণ আমার ধারণা। মিলতে পারে, নাও পারে। মূল গানের তাল ছিল বুটের। ভারী, মাটিতে আছড়ে পড়া। জন হিলের প্রোডাকশনে ঐ বুট হাততালি হয়ে গেছে। সোকার হালকা দুলুনি, হর্নের ঝিলিক, আর সবার উপরে শাকিরার আরবি স্কেলের মোচড়। কুচকাওয়াজের তাল সুরের ভেতর রয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু শোনার সময় আর পায়ে নামে না। তিন মিনিট বাইশ সেকেন্ডে চারটা ভাষা। ফাং, কোসা, স্প্যানিশ, ইংরেজি। ক্যামেরুন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে কলম্বিয়া।

শিল্পীর জাতীয়তা নিয়ে সবাই ঝগড়া করল। আর সবার অগোচরে গানের আসল বদল ঘটে গেল লিরিক্সে।

মূল গান ছিল সৈনিকের নালিশ। সিপাহির কান্না। খাবার খারাপ, বেতন নেই, অফিসার জানোয়ার।

আর ২০১০ সালের গান শুরু হয় এই লাইন দিয়ে: ইউ আর অ্যা গুড সোলজার। তুমি একজন ভালো সৈনিক। তারপর: ইউ আর অন দ্য ফ্রন্ট লাইন। তুমি সামনের সারিতে আছ। পড়ে গেলে উঠে দাঁড়াও, ধুলো ঝাড়ো, আবার লড়ো।

যে গান একদিন জিজ্ঞেস করেছিল 'কে পাঠিয়েছে তোমাকে', সেই গানই ফিরে এল উত্তরকে অপ্রয়োজনীয় বানিয়ে দিয়ে। প্রশ্ন রয়েই গেল, কিন্তু ফাং ভাষায়, যেটা কেউ বোঝে না। আর যে ভাষা পৃথিবী বোঝে, ঐ ইংরেজিতে রইল শুধু হুকুম।

নালিশ থেকে আদেশ। কান্না থেকে মার্চিং অর্ডার।

এখান থেকেই আমি গানটাকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখি। এবং আমার ধারণা, শাকিরা কিংবা তার প্রযোজক জন হিল কেউই এভাবে ভাবেননি।

২০১০ সালে ফিফা আফ্রিকায় গিয়েছিল। স্টেডিয়াম উঠেছিল, বস্তি সরেছিল, টাকা এসেছিল, টাকা চলেও গিয়েছিল। ঐ পুরো সময় জুড়ে প্রতিটা স্টেডিয়ামে, প্রতিটা টিভিতে, প্রতিটা গাড়ির স্পিকারে একই প্রশ্ন বাজছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশীবার গাওয়া প্রশ্নগুলোর একটা।

কে পাঠিয়েছে তোমাকে?

প্রশ্ন ঘরের ভেতরেই ছিল। ঠিক জায়গায়, ঠিক সময়ে, ঠিক সুরে, ঠিক মহাদেশে। শুধু কেউ ওটাকে আর প্রশ্ন হিসেবে চিনতে পারেনি। কারণ ততদিনে ওটা ফুটবল উন্মাদনার গান হয়ে গেছে।

আর গানটা উত্তরও দিয়ে রেখেছিল। আনাওয়াম। আমিই। আমি নিজেই ডেকে এনেছি।

জে বেলা জানতেই পারেননি তার গান পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মঞ্চে বাজছে। ফ্রান্স থেকে এক পরিচিত ফোন করে তাকে খবর দিয়েছিলেন। পরে একটা সমঝোতা হয়, গীতিকারের তালিকায় গোল্ডেন সাউন্ডসের নাম ওঠে। এরপরও ক্ষতিপূরণ নিয়ে অভিযোগ ছিল, বিতর্ক ছিল, কে কতটা পেয়েছে তার হিসাব আজও পরিষ্কার না। ওটা নিয়ে লেখার লোক অনেক আছে। আমার আগ্রহ অন্য জায়গায়।

আমি ভাবি, একটা রসিকতা কীভাবে টিকে যায়।

প্রতিবাদ যদি যথেষ্ট সুন্দর হয়, একদিন গান হয়ে যায়। আর গান যদি যথেষ্ট সুন্দর হয়, একদিন নিজের অর্থই খুইয়ে ফেলে। এটাই বেঁচে থাকার দাম। যা কিছু সবার কণ্ঠে ওঠে, তার আর নিজের কিছু বলার থাকে না।

সাঙ্গালেওয়ার অর্থ হারানো দুর্ঘটনা ছিল না। গানটা প্রথম দিন থেকেই এমনভাবে বানানো, যাতে অর্থ ছাড়াও চলে। কারণ পা মেলানোর গান বোঝার দরকার হয় না। ঐটাই গানের শক্তি, ঐটাই অভিশাপ।

চার দেহরক্ষী ক্যামেরুনের ব্যারাকে বসে নিজেদের ইউনিফর্ম নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন। ঐ ঠাট্টা তাদের চেয়ে বেশীদিন বাঁচবে। তিনশো বছর পরও কোনো এক শিশু গুনগুন করবে। শুধু ঐ শিশু জানবে না, সে আসলে অভিযোগপত্র গাইছে।

আমি আজকাল গানটা অন্য কারণে শুনি। কোরাস এলে একটু থামি। নিজেকেই প্রশ্ন করি। আমাকে এখানে কে পাঠিয়েছে?

উত্তরও গানের ভেতরেই আছে। আনাওয়াম।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



"ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস"

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেটে "কোচ" শব্দটা মানেই ছিল ঝড়!

রাসেল ডোমিঙ্গো, হাথুরুসিংহে-
Phil Simmons (2024–present)
Chandika Hathurusingha (2014–2017, 2023–2024)
Russell Domingo (2019–2022)
Steve Rhodes... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মদিনে তাহাদের জন্য শুভকামনা। আমার জন্মদিনের স্মৃতি...

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×