
উনিশশো আটানব্বই সাল। প্যারিসে ফোনের অন্য প্রান্তে এক নারী তার প্রেমিককে নিয়ে অভিযোগ করে যাচ্ছেন। বহুবার শোনা অভিযোগ। শুনছিলেন তার বন্ধু পিয়ের বিসম্যুথ, পেশায় কনসেপচুয়াল আর্টিস্ট। শোনার একপর্যায়ে বিসম্যুথ ঠাট্টা করে বললেন, মাথা থেকে মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলার কোনো উপায় থাকলে তো ঝামেলাই শেষ হয়ে যেত।
কথাটা বলে বিসম্যুথ ভুলে গেলেন না। ওখান থেকেই তার মাথায় নতুন আর্ট প্রজেক্টের পরিকল্পনা এলো। তিনি অচেনা মানুষদের ডাকযোগে কার্ড পাঠাবেন। কার্ডে লেখা থাকবে, আপনার পরিচিত একজন আপনাকে তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেছেন। দয়া করে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবেন না।
পরিকল্পনার কথা বিসম্যুথ বললেন তার পুরোনো বন্ধু মিশেল গঁদ্রিকে। আশির দশকে যখন দুজনের পরিচয়, গঁদ্রি তখন উই উই নামের ফরাসি পপ ব্যান্ডে ড্রাম বাজান। গঁদ্রি বুঝতে পারলেন, এখান থেকেই একটা সিনেমা শুরু হতে পারে এবং প্রস্তাব নিয়ে গেলেন চার্লি কফম্যানের কাছে। তার আগেই কফম্যানের স্ক্রিপ্টে গঁদ্রি বানিয়েছেন হিউম্যান নেচার। স্ক্রিপ্ট তখনো লেখা হয়নি, শুধু ছোট পিচ নিয়ে দুজন স্টুডিওতে গেলেন। ভেবেছিলেন এই গল্প কেউ কিনবে না। উল্টো বিডিং যুদ্ধ লেগে গেল। তারপর কফম্যানকে বসে স্ক্রিপ্ট আসলেই লিখতে হলো।
বিসম্যুথের ওই কার্ড কিন্তু সিনেমায় আছে। ক্লেমেন্টাইন যখন জোয়েলকে মুছে ফেলে, তার চেনা মানুষদের ঠিকানায় পোস্টকার্ড পৌঁছে যায়। ২০০৫ সালের অস্কারে সেরা অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লের পুরস্কার হাতে উঠলো তিনজনের। কফম্যান, গঁদ্রি এবং বিসম্যুথ। ফোনের ওপাশে বিরক্ত হয়ে বলা এক লাইনের ঠাট্টা শেষমেশ অস্কার পর্যন্ত পৌঁছে গেল!
সিনেমার নাম নেওয়া হয়েছে আলেকজান্ডার পোপের ১৭১৭ সালের কবিতা 'এলোইসা টু আবেলার্ড' থেকে। কবিতার দুই চরিত্র বাস্তব মানুষ। পিয়ের আবেলার্দ প্যারিসের নামকরা দার্শনিক, এলোইজ তার ছাত্রী। দুজনের প্রেম, গোপন বিয়ে ও সন্তান জন্মের পর এলোইজের অভিভাবক লোক লাগিয়ে আবেলার্দকে খোজা করান। এরপর দুজনেই ঢুকে পড়েন আলাদা মঠে এবং বাকি জীবন চিঠি লিখে যান একে অপরকে।
পোপের কবিতায় এলোইজ মঠের দেয়ালের ভেতর বসে আছেন। তার পাশে আরও যেসব সন্ন্যাসিনী আছেন, তারা পৃথিবীকে ভুলে গেছেন এবং পৃথিবীও তাদের ভুলে গেছে। পোপ লিখছেন, নির্মল মনে অনন্ত সূর্যালোক জ্বলে থাকে। এলোইজ তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন হিংসা নিয়ে। কারণ তিনি ভুলতে পারছেন না।
সিনেমার নাম তাই শান্তির কথা বলে না। বলে ঈর্ষার কথা। যে ভুলতে পারে না, সে বাইরে থেকে তাকিয়ে আছে যে পেরেছে তার দিকে।
সিনেমায় এই লাইনগুলো আবৃত্তি করে মেরি সেভেভো, লাকুনার রিসেপশনিস্ট। আবৃত্তি করার সময় সে কবির নাম উল্টে বলে ফেলে, পোপ আলেকজান্ডার। নিটশের বিখ্যাত লাইনও সে বলে, যারা ভুলে যেতে পারে তারা সৌভাগ্যবান, কারণ নিজের বোকামিগুলোকেও তারা হারিয়ে দেয়। সঙ্গে সে নিজেই স্বীকার করে, লাইনটা সে পেয়েছে বার্টলেটের উদ্ধৃতির বইতে। মানে তার পাণ্ডিত্য ধার করা।
সিনেমার শেষে জানা যায়, মেরির সঙ্গে ডাক্তার হাওয়ার্ড মিয়ারজিয়াকের সম্পর্ক ছিল এবং সেই স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছে। কফম্যানের স্ক্রিপ্টে আরও আছে, ওই সম্পর্ক থেকে মেরি সন্তানসম্ভবা হয়েছিলেন এবং হাওয়ার্ড তাকে গর্ভপাত করান। সেটাও মুছে দেওয়া হয়। কফম্যান ইচ্ছে করেই এমনটা করেছিলেন কি না জানি না, তবে ফিরে তাকালে মনে হয়, সিনেমার নাম যার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়, সেই মানুষটাই সিনেমায় সবচেয়ে সম্পূর্ণভাবে মুছে যাওয়া মানুষ। আর যে লাইনটা সে আওড়ায়, সেটাই যেন তার নিজের গল্প। ভুলে যাওয়া মানুষকে বাইরে থেকে সুখী দেখায়।
এই সিনেমা নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, ভালোবাসা সফটওয়ার প্রোগ্রামকে হারিয়ে দিয়েছে। প্রোগ্রাম সব মুছে দিতে চেয়েছিল, ভালোবাসা কোথাও লুকিয়ে থেকে গিয়েছিল, তাই দুজন আবার এক হলো।
আমি ব্যাপারটা এভাবে দেখি না।
লাকুনার প্রোগ্রাম ব্যর্থ হয়নি। প্রোগ্রাম যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ঠিক তা-ই করেছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর জোয়েলের মাথায় ক্লেমেন্টাইনের একটা স্মৃতিও নেই। ক্লেমেন্টাইনেরও নেই। ট্রেনে দুজন যখন কথা বলে, তারা সত্যিই অপরিচিত। মেশিন নিখুঁতভাবে কাজ করেছে।
তবু দুজনেই ওই সকালে অফিসে না গিয়ে ট্রেন ধরে চলে যায় মন্টকে। ফেব্রুয়ারির জমাট শীতে, খালি সৈকতে।
প্রশ্নটা তাই ভালোবাসা টিকলো কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, স্মৃতি যদি মুছেই যায়, তাহলে ট্রেনে তোলার কাজটা করলো কে?
এখানেই সিনেমার অন্য আরেক বক্তব্য সামনে আসে। সেই বক্তব্য প্রেমের গল্পের চেয়েও বেশি চমকপ্রদ। লাকুনা স্মৃতি মুছে দিতে পারে। কিন্তু ক্ষুধা মুছতে পারে না। একজন মানুষ কাকে চায়, কী ধরনের অস্থিরতা তাকে টানে, শীতের সমুদ্র দেখলে তার বুকের ভেতর কী নড়ে ওঠে, এসব স্মৃতিতে থাকে না। ওগুলো থাকে আরও গভীরে। যেখানে ডাক্তার মিয়ারজিয়াকের ল্যাপটপ পৌঁছাতে পারে না।
ভালোবাসা টিকে থাকেনি। টিকে গেছে অভ্যাস। আর অভ্যাস স্মৃতির চেয়ে বয়সে বড়।
গ্রিক পুরাণে পাতালের পাঁচটা নদীর একটার নাম লেথি। বিস্মৃতির নদী। মৃত আত্মারা পুনর্জন্মের আগে ওই জল খেয়ে আগের জীবনের সব ভুলে যেত। উল্টো দিকে আছেন নেমোসিনি, স্মৃতির দেবী, যিনি নয় মিউজের মা। গ্রিকরা শিল্পের জন্মও স্মৃতি থেকেই দেখতো।
লেথি শব্দ থেকেই এসেছে গ্রিক আরেকটা শব্দ, আলেথেইয়া। যার অর্থ সত্য। আক্ষরিক অর্থে দাঁড়ায়, যা ভোলা যায়নি। গ্রিকদের কাছে সত্যের বিপরীত মিথ্যা ছিল না। সত্যের বিপরীত ছিল বিস্মৃতি। যা লেথির জল পার হয়ে টিকে থাকে, তা-ই সত্য।
প্লেটোর রিপাবলিকের শেষ বইয়ে আছে এরের গল্প। যুদ্ধে মরে যাওয়া এক সৈনিক বারো দিন পর জেগে উঠে পরকালের বর্ণনা দেয়। সেখানে আত্মারা পরের জন্মের জীবন বেছে নেয়। বেছে নেওয়ার পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় লেথির মাঠে, আর প্রত্যেককে মাপমতো জল খেতে হয়। প্লেটো লিখেছেন, যাদের জ্ঞান কম, তারা মাপের চেয়ে বেশী খেয়ে ফেলে এবং সব ভুলে যায়।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো। বাছাই আগে, ভুলে যাওয়া পরে। আর এরকে জল খেতে দেওয়া হয়নি, কারণ তাকে ফিরে গিয়ে সবাইকে বলতে হবে।
জোয়েল আর ক্লেমেন্টাইনও আগে বেছে নিয়েছিল, তারপর ভুলেছে। আর এরের ভূমিকায় আছে মেরি। সে জল খেয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সত্য জানার পর সে লাকুনার সব ফাইল, ক্যাসেট ও চিঠি রোগীদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। খবরটা বয়ে আনার দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নেয়।
অর্ফিক ধর্মমতের দীক্ষিতদের কবরে সোনার পাত দিয়ে দেওয়া হতো। ওই পাতে লেখা থাকত নির্দেশনা, লেথির জল খেয়ো না, নেমোসিনির ঝরনা থেকে খেয়ো। মৃত মানুষ পাতাল পার হওয়ার সময় নির্দেশনা পড়ে নেবে, এটাই ছিল ভরসা।
মাথার ভেতর সব যখন নিভে আসছে, ক্লেমেন্টাইন জোয়েলের কানে যে কথাটা বলে, সেটা ওই সোনার পাত। মন্টকে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। জোয়েলের কিছুই মনে থাকবে না। নির্দেশনাটা তবু কাজ করবে।
আর মন্টকের ডাকনামই দ্য এন্ড। লং আইল্যান্ডের সবচেয়ে পূর্বের বিন্দু, রেললাইনের একদম শেষ স্টেশন। এর পরে আর কিছু নেই। সিনেমার প্রথম দৃশ্য ঘটে ওখানে, যেটা আসলে গল্পের শেষ।
স্মৃতি মোছার রাতে জোয়েল ক্লেমেন্টাইনকে নিয়ে নিজের মাথার ভেতর ছুটে বেড়ায়। এক স্মৃতি থেকে আরেক স্মৃতিতে লুকায়। শৈশবের রান্নাঘরে, লজ্জার স্মৃতিতে, যেসব জায়গায় ক্লেমেন্টাইন কোনোদিন ছিল না। পেছনে দেয়াল ভাঙছে, বইয়ের নাম মুছে যাচ্ছে, মানুষের মুখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
অর্ফিয়ুস তার স্ত্রী ইউরিডিসিকে ফেরাতে পাতালে নেমেছিলেন। হেডিস শর্ত দিয়েছিলেন, উপরে ওঠা পর্যন্ত একবারও পেছনে তাকানো যাবে না। আলোর মুখ দেখার ঠিক আগে অর্ফিয়ুস তাকিয়ে ফেললেন। ইউরিডিসি চিরতরে হারিয়ে গেলেন।
জোয়েলের শর্তটা উল্টো। তাকে পেছনে তাকাতেই হবে। লাকুনার পদ্ধতিই এমন, প্রতিটি স্মৃতি মুছতে হলে আগে ওই স্মৃতিতে ঢুকতে হবে। যা মনে করা হচ্ছে, শুধু তা-ই মোছা যায়। অর্ফিয়ুস হেরেছিলেন তাকানোর অপরাধে। জোয়েল হারছে তাকানোর বাধ্যবাধকতায়।
আর সবচেয়ে নিষ্ঠুর হলো, অর্ফিয়ুস না তাকালে স্ত্রীকে ফিরে পেতেন। জোয়েল ক্লেমেন্টাইনকে ফিরে পায় সম্পূর্ণ হারানোর পর। পাতাল থেকে কাউকে ফেরাতে হলে তাকে পাতালে রেখে আসতে হয়, এই সিনেমা এমন শর্ত বসিয়েছে।
ভারতীয় দর্শনে সংস্কার বলতে বোঝানো হয় মনের গায়ে জমে থাকা ছাপ। প্রতিটি কাজ, প্রতিটি ইচ্ছা মনের উপর দাগ রেখে যায়। জন্মান্তরে আগের জীবনের ঘটনা মনে থাকে না, কিন্তু ওই দাগ থেকে যায়। ফলে মানুষ নতুন জীবনে ঘটনা মনে না রেখেও আগের মতোই ঝুঁকে পড়ে, একই ধরনের ভুল করে, একই ধরনের মানুষের দিকে হাত বাড়ায়।
লাকুনা ঘটনা মুছেছে। সংস্কার মোছেনি।
জোয়েল ভালোবাসে না বলে সমস্যা হয়নি কখনো। তার সমস্যা ছিল সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রথম রাতে মন্টকের সৈকতের বাড়িতে ক্লেমেন্টাইন তাকে থাকতে বলেছিল, জোয়েল চলে গিয়েছিল। এই একটাই দাগ। আর ক্লেমেন্টাইনের দাগ হলো, সে অস্থির হয়ে গেলে কাউকে না বলে সব শেষ করে দেয়।
স্মৃতি মুছে দিলে দাগ দুটো মোছে না। ফলে সিনেমার শেষে দুজন আবার একই বিন্দু থেকে শুরু করে। আর দর্শক জানে, আবার একই জায়গায় গিয়ে ভাঙবে।
সিনেমার যে অংশ সবচেয়ে সায়েন্স ফিকশন মনে হয়, সেটাই বাস্তবের সবচেয়ে কাছাকাছি। দুই হাজার সালে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে জোসেফ লেডুর ল্যাবে কাজ করার সময় করিম নাদের একটা পরীক্ষা করেন। ইঁদুরের মাথায় বহু আগে বসানো ভয়ের স্মৃতি তিনি ফিরিয়ে আনেন, আর ঠিক ওই মুহূর্তে প্রোটিন তৈরী বন্ধ করে দেওয়ার ওষুধ দেন। স্মৃতি মুছে যায়। নেচার সাময়িকীতে ছাপা হওয়া এই কাজের নাম হলো রিকনসলিডেশন।
মানে দাঁড়ায়, স্মৃতি পাথরে খোদাই করা নয়। প্রতিবার মনে করার সময় স্মৃতি একই থাকে না। নতুন করে গড়ে ওঠে। তখন তাকে বদলে দেওয়াও সম্ভব।
লাকুনার পদ্ধতি হুবহু এটাই। জোয়েলকে স্মৃতির ভেতর ঢোকানো হয়, স্মৃতি জেগে ওঠে, আর জেগে ওঠামাত্র মেশিন মুছে দেয়। ধারণাটা জন্মেছিল ১৯৯৮ সালে, নাদেরের কাজ ছাপা হয় ২০০০ সালে, সিনেমা এসেছে ২০০৪ সালে। নাদের নিজে বলেছেন, তার কাজ থেকেই সিনেমার প্লট এসেছে এমন প্রমাণ তার হাতে নেই। মিলটা তবু রয়ে যায়।
আর এই বিজ্ঞান আমাদের নিয়ে যা বলে, তা প্রেমিক-প্রেমিকার চেয়ে বিবাহিত মানুষের জন্য বেশী অস্বস্তিকর। বিয়ের দশ বছর পর আপনি স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম দেখার দিনটা মনে করছেন না। আপনি মনে করছেন গতবার যেভাবে মনে করেছিলেন, সেটা। কপির কপির কপি। প্রতিবার একটু করে রঙ বদলেছে, একটু করে কথা যোগ হয়েছে, একটু করে খারাপ অংশ ধুয়ে গেছে। মানুষ যাকে নিয়ে ঘর করে, আর মানুষ যাকে মনে রাখে, দুজন এক নয়।
এই সিনেমায় প্রায় প্রতিটি চরিত্র অন্য কারো ভেতরের জীবনে অস্ত্রোপচার চালিয়েছে, কারো অনুমতি না নিয়েই।
হাওয়ার্ড নিজের প্রেমিকার মাথা থেকে নিজেকে মুছে দিয়েছেন, তারপর তাকে অফিসে চাকরি করতে দিয়েছেন। প্যাট্রিক জোয়েলের ফাইল থেকে তার কথা, তার উপহার, এমনকি তার অন্তর্বাস চুরি করে ক্লেমেন্টাইনের সামনে হাজির হয়। মেয়েটা জানে না যে তার নতুন প্রেমিক তারই পুরোনো প্রেমিকের স্ক্রিপ্ট পড়ে যাচ্ছে।
আর জোয়েল ও ক্লেমেন্টাইন একে অপরকে মুছেছে।
এখানেই আসল অপরাধ। স্মৃতি দুইজন মানুষের যৌথ সম্পত্তি। একই বিকেল দুজন আলাদাভাবে মনে রাখে, দুটো মিলে সম্পূর্ণ হয়। নিজের অর্ধেক মুছে ফেললে অন্যজনের অর্ধেকটা পঙ্গু হয়ে থাকে। যার সঙ্গে কথা বলার কেউ নেই, তেমন একটা বিকেল নিয়ে অন্য মানুষটা বাকি জীবন বসে থাকে।
মেরির ডাকে ক্যাসেট পাঠানোই তাই সিনেমার একমাত্র নৈতিক কাজ। সে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিচ্ছে না, ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। মানুষকে তার নিজের জীবন ফেরত দিচ্ছে।
গঁদ্রি ঠিক করেছিলেন, এই সিনেমায় সিজিআই থাকবে না। স্মৃতি ভাঙার প্রায় প্রতিটি দৃশ্য ক্যামেরার সামনেই বানানো হয়েছে।
শৈশবের রান্নাঘরের দৃশ্যে প্রোডাকশন ডিজাইনার ড্যান লে অস্বাভাবিক বড় আসবাব বানিয়ে মেঝে কাত করে দিয়েছিলেন, ফলে পূর্ণবয়স্ক জিম ক্যারিকে টেবিলের নিচে লুকানো বাচ্চা মনে হয়। গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের যে দৃশ্যে ক্লেমেন্টাইন পিছলে অন্ধকারে চলে যায়, ওখানে কেইট উইন্সলেটকে তার দিয়ে টেনে নেওয়া হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ক্লেমেন্টাইনের বেরিয়ে যাওয়ার লম্বা দৃশ্য এক টেকে নেওয়া, কোনো কাট নেই, সেটের ভেতর লুকানো দরজা দিয়ে অভিনেত্রী এক ঘর থেকে আরেক ঘরে সরে গেছেন।
সিনেমাটোগ্রাফার এলেন কুরাস বলেছেন, শুটিং শুরুর প্রথম দিন গঁদ্রি তাকে কোনো সিনেমার আলো ব্যবহার করতে দেননি, চোখে যা দেখা যায় সেটুকু দিয়েই আলো সাজাতে বলেছিলেন। রাতের বাইরের দৃশ্যে তিনি রাস্তার বাতির সঙ্গে বাড়তি সোডিয়াম বাতি ঝুলিয়ে কাজ চালিয়েছেন। জোয়েলের অ্যাপার্টমেন্টের সেট বানানোর পর তাকে জানানো হলো, ছাদ পেরেক মেরে আটকে দেওয়া হয়েছে, উপর থেকে আলো ফেলার সুযোগ নেই। সিনেমায় ডলি ব্যবহার হয়নি একটাও, ক্যামেরা কখনো হাতে, কখনো হুইলচেয়ারে। কুরাস ক্যামেরা স্থির রাখলে গঁদ্রি পেছন থেকে তাকে ধাক্কা দিতেন, যাতে ছবি আরও এলোমেলো হয়।
গঁদ্রি বলেছেন, প্রতিটি ইফেক্ট দর্শকের শরীরে অনুভূত হতে হবে। কারণটা শুধু বাজেট নয়। এর পেছনে গঁদ্রির নিজস্ব ভাবনাও ছিল। কম্পিউটারে ফাইল ডিলিট হয় নিঃশব্দে, চোখের পলকে। মানুষের স্মৃতি ওভাবে যায় না। বাতি একটা একটা করে নেভে, দেয়াল খসে পড়ে, চেনা মুখ থেকে নাক চোখ মুছে যায়, ঘরের ভেতর থেকে মানুষ চুপচাপ বেরিয়ে যেতে থাকে। গঁদ্রি সেটই ভেঙেছেন, কারণ স্মৃতি ভাঙাও ভাঙাই।
কফম্যান আরেক জায়গায় জেদ ধরেছিলেন। লাকুনা যেন যতটা সম্ভব সাদামাটা হয়। ফলে ২০০৪ সালের সিনেমায় স্মৃতি মুছে দেওয়ার কোম্পানির ঘরে দেখা যায় কাগজের ফাইলের স্তুপ, ক্যাসেট টেপ আর মোটা চৌকো মনিটর, যা ওই সময়ের হিসাবেও পুরোনো। মানুষের মাথার ভেতর ঢুকে যাওয়া প্রযুক্তি দেখতে যেন বীমা অফিসের মতো।
আর ট্রেনের দৃশ্যে সাউন্ড নিয়ে একটা ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার প্রভাব অনেক বড়। প্রথমে ঠিক ছিল, যেখানে জোয়েল আর ক্লেমেন্টাইন চুপ থাকবে, সেখানে মিউজিক বাজবে। কফম্যান উল্টোটা করতে বললেন। ফলে দুজন কথা বললে মিউজিক বাজে, আর দুজন চুপ করলে মিউজিকও থেমে যায়। সেই অস্বস্তিকর নীরবতাকে ঢাকার কেউ থাকে না। দর্শককে কী অনুভব করতে হবে, সেটা সিনেমা মিউজিক দিয়ে বলে দেয় না।
গল্প সামনে-পেছনে ছুটে বেড়ায়। কোন সময় চলছে, সেটা বোঝা যায় ক্লেমেন্টাইনের চুলের রঙ দেখে। সবুজ থেকে লাল, লাল থেকে কমলা, কমলা থেকে নীল।
রঙগুলোর নাম সিনেমাতেই বলা আছে। গ্রিন রেভল্যুশন, রেড মিনেস, ইয়েলো ফিভার, এজেন্ট অরেঞ্জ, ব্লু রুইন। ট্রেনের দৃশ্যে ক্লেমেন্টাইন নিজেই দাবি করে, এজেন্ট অরেঞ্জ নাম তার দেওয়া।
নামগুলো একসঙ্গে সাজালে দেখা যায়, এগুলো কোনোটাই নিরীহ নয়। রেড মিনেস ছিল আমেরিকায় কমিউনিস্ট আতঙ্কের নাম। ইয়েলো ফিভার মশাবাহিত রোগ। আর এজেন্ট অরেঞ্জ ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার ছিটানো রাসায়নিক, যার বিষ কয়েক প্রজন্ম ধরে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম দিয়েছে।
যে মেয়েটি নিজের মেজাজের নাম রাখে মহামারি আর রাসায়নিক অস্ত্রের নামে, তার সম্পর্কে একটা কথা এমনিতেই জানা হয়ে যায়। সে জানে সে কী। ক্লেমেন্টাইন জোয়েলকে বলে, তুমি আমাকে তোমার মনের মতো মানুষ ভেবো না। আমি কারো জীবন পূর্ণ করতে আসিনি, আমি নিজের শান্তি খুঁজতে থাকা এক এলোমেলো মেয়ে। রঙের নামগুলো ওই সতর্কবার্তারই আরেক রূপ। জোয়েল সতর্কবার্তা পড়েনি। মাথার রঙ দেখে সে ভেবেছিল, এই মেয়ে তাকে জ্বালিয়ে তুলবে।
পিটার ওয়েনের বানানো পরচুলাগুলো এখনো কেইট উইন্সলেটের কাছেই আছে। তিনি বলেছেন, রঙটা চুলের রঙ নয়, সুতার রঙ, আর প্রতিটি পরচুলার গোড়া স্বাভাবিক রাখা হয়েছিল বলেই ওগুলো এত আসল দেখায়।
কফম্যানের প্রথম খসড়ায় সিনেমার সমাপ্তি অন্যরকম ছিল। এক সংস্করণে গল্প শুরু হচ্ছিল ২০৫৬ সালে, বুড়ো ও অসুখী ক্লেমেন্টাইনকে দিয়ে। শেষে দেখা যেত, তিনি আবার ডাক্তারের ঘরে ঢুকছেন স্মৃতি মোছাতে। ওটা তার ষোলো নম্বরবার। মানে দুজন মানুষ সারাজীবন ধরে একই ভুল করে যাবে, ভুলে যাবে, আবার করবে।
স্টুডিও ওই সমাপ্তি মানেনি। গঁদ্রিও চাননি। উইন্সলেট নাকি গঁদ্রিকে বলেছিলেন আবেগকে ভয় না পেতে। শেষ পর্যন্ত সিনেমা থামে সৈকতে, দুজনের দৌড়ে যাওয়ার ছোট ছোট পুনরাবৃত্তিতে।
সাধারণত এই বদলকে বলা হয়, স্টুডিয়োর চাপে শেষে তিক্ততা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে উল্টো মনে হয়। মুক্তি পাওয়া সমাপ্তি বেশী কঠিন। এই সমাপ্তি দর্শককে কোনো সহজ উত্তর দেয় না।
কারণ ২০৫৬ সালের সংস্করণে দুজন কিছুই জানে না। তারা নিয়তির চাকায় ঘুরছে, ফলে দায় তাদের নয়। আর সিনেমায় যা আছে, সেখানে মেরির পাঠানো ক্যাসেট বাজানোর পর তারা সব জেনে ফেলে। জোয়েল নিজের গলায় শুনতে পায় ক্লেমেন্টাইনকে নিয়ে তার সবচেয়ে বাজে কথাগুলো। ক্লেমেন্টাইন শোনে জোয়েল তাকে মাতাল আর মূর্খ বলছে। দুজনেই জানে সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কোন কথায় ভাঙবে, কে কাকে কী বলবে।
জেনে যাওয়ার পর ক্লেমেন্টাইন দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। জোয়েল তাকে থামায়। ক্লেমেন্টাইন ফিরে বলে, একটা সময় তুমি আমাকে চিনে ফেলবে, তারপর তোমার আর ভালো লাগবে না। জোয়েল বলে, ওকে।
ক্লেমেন্টাইন কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর সে-ও বলে, ওকে।
নিটশের 'দ্য গে সায়েন্স' বইয়ের ৩৪১ নম্বর অনুচ্ছেদের নাম, সবচেয়ে ভারী বোঝা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ধরো কোনো এক রাতে তোমার সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মুহূর্তে এক দানব এসে বললো, এই জীবনটা তোমাকে আবার বাঁচতে হবে, অসংখ্যবার, হুবহু একইভাবে। প্রতিটি সুখ, প্রতিটি যন্ত্রণা, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস একই ক্রমে ফিরে আসবে, নতুন কিছু থাকবে না। তুমি কি দাঁতে দাঁত চেপে ওই দানবকে অভিশাপ দেবে? নাকি বলবে, তুমি ঈশ্বর, আমি এর চেয়ে সুন্দর কথা কখনো শুনিনি?
নিটশে প্রশ্নটা করেছিলেন পরীক্ষা হিসেবে। জীবনকে কেউ সত্যিই মেনে নিয়েছে কি না, তা মাপার পরীক্ষা।
মেরির পাঠানো ওই ক্যাসেটগুলোই দানব। ক্যাসেট এসে জোয়েল আর ক্লেমেন্টাইনকে বলে দেয়, তোমাদের সম্পর্ক কেমন হবে, কোথায় গিয়ে বিষাক্ত হবে, শেষে তোমরা একে অপরকে কী বলবে। সব শোনার পর দুজন যে শব্দটা উচ্চারণ করে, ওটা প্রেমের প্রতিশ্রুতি নয়। ওটা নিটশের প্রশ্নের উত্তর।
সিনেমার মধ্যে মেরি সেভেভো নিটশের এক লাইন আওড়ায়, যারা ভুলে যেতে পারে তারা সৌভাগ্যবান। আর কাজে দাঁড় করায় নিটশের অন্য লাইন, ফিরে আসা জীবনকে আবার হ্যাঁ বলতে পারা। মেরি বার্টলেটের বই থেকে ভুল নিটশে তুলে এনেছিল।
তিন বছর, দশ বছর কিংবা তিরিশ বছর পার করা যেকোনো সম্পর্কের ভেতর এই একই দৃশ্য বহুবার ঘটে। কোনো ক্যাসেট আসে না, ডাকপিয়ন কিছু দিয়ে যায় না। তবু একটা সময়ের পর মানুষ অন্য মানুষকে জেনে ফেলে। কোথায় সে ছোট হয়ে যায়, কোন কথায় সে অন্যায্য হয়, রাগলে সে কী বলে, ভয় পেলে সে কোথায় লুকায়। সব জানা হয়ে যাওয়ার পরও সকালে উঠে একই ঘরে থাকতে রাজি হওয়াই ওই ওকে।
জোয়েল আর ক্লেমেন্টাইন হয়ত আবার ভাঙবে। মন্টকের শীতল সৈকতে দৌড়ে যাওয়ার ওই ছোট্ট ফুটেজটা বারবার ঘুরে ঘুরে আসে, দেখে মনে হয় গল্পটা লুপে পড়ে গেছে। কিন্তু লুপে পড়া মানুষ আর লুপ জেনে ঢুকে পড়া মানুষ এক নয়।
লাকুনা মাথা পরিষ্কার করে দিতে পারে। ভুলে যাওয়া মন বানিয়ে দিতে পারে। ওই মনের উপর অনন্ত রোদও ফেলে দিতে পারে। শুধু একটা জায়গায় গিয়ে থেমে যায়। বেরিয়ে যাওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে সব জেনেও থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো মেশিন কারো হয়ে নিতে পারে না।
আলেকজান্ডার পোপের এলোইজ ওই মঠে বসে ভুলতে না পারার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তিনশো বছর পর গঁদ্রি ও কফম্যান একই দৃশ্যের উল্টো পিঠ দেখালেন। ভুলে যাওয়ার পরও পুরোনো অভ্যাস মানুষকে একই দরজার সামনে এনে দাঁড় করায়। আর সেই দরজায় দাঁড়িয়ে যে শব্দটা বলা হয়, সেটাই হয়তো একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি।
OKAY!
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৪:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



