হলুদ পাঞ্জাবির গল্প।
ফটিকের নিজেকে বড্ড অপাংক্তেয় মনে হয়। ওর একটা হলুদ পাঞ্জাবি নাই। কিভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হবে!
গেল বসন্তে তার সংস্কৃতিমান মামা বিশ্বম্ভরবাবু একটি সাদা পাঞ্জাবি উপহার দিয়েছিল, কিন্তু সেটি তো অকালতত্বজ্ঞানী মাখনলালের বিয়েতে তরকারীর ঝোল লেগে ছ্যড়াব্যড়া অবস্থা! কাল বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় একটা হলুদ পাঞ্জাবি ছাড়া সামনের কাতারে অংশগ্রহণ করা মোটেও সম্ভব নয়।
এই খড় উত্তাপের মাসে বিদঘুটে হলুদ পাঞ্জাবির শোকে যুবকগণের সর্দার কেন এতোটা পাথর হলো তা ক্লাবের কারো মাথায় আসে না। বৈশাখে হলুদ পাঞ্জাবিই বা কেন প্রয়োজন? তা ওর বন্ধুমহলে ঠাওর করে উঠা মুস্কিল! বন্ধুমহল কয়েকজন কয়েকটি রঙিন পাঞ্জাবি একটি দিনের জন্য ধার দিতে চাইল কিন্তু ওগুলোর মধ্যে হলুদের বিন্দুমাত্র ছিটা ফোঁটাও নাই। তাই এসব ধার করার মানেহয় না।
বর্ষবরণের সমস্ত আয়োজন যুবকগণের সর্দার ফটিক চক্রবর্তী নিজহাতে করেও শেষ সময় এমন বেঁকে বসায় সকলেই বিস্মিত ও বিরক্ত হলো। দু 'একজন জানার ইচ্ছাকে দমন না করে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
: দাদা, আপনি ক্লাবে কখন উপস্থিত হবেন?
: আমি আসব না রে। তোরাই বাকিটা করতে পারবি!
: বলেন কি দাদা! কেন আসবেন না?
: সেটা কি তোকে বলা লাগবে নাকি?
: না! না! থুক্কু সেকি! ঠিকাছে দাদা, বলা লাগবে না।
প্রশ্নের এমন জবাব পাওয়াতে চৈত্রের শেষ বিকেলে আর কেউ নিজেদের অপদস্থ করতে চাইল না। কিন্তু ফটিক ছাড়া কি আর চলে! রাতের অন্ধকার যতই গাঢ় হয় যুবকদের মনে ফটিকহীনতা গ্রাস করতে থাকে.....।
এই প্রজন্মের বালক ফটিকেরা যুবক হলে হিমু হতে চায়। যুবক পাঠকের কি পঠন ক্ষমতা দুর্বল, নিজের ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তা কি নাই! প্রশ্ন হচ্ছে কেন যুবক ফটিকেরা হিমু জ্বরে ভুগবে? শার্লোকহোম পড়ে কেন ডিডেকটিভের মত আচরণ করবে? ফেলুদা পড়েই গোয়েন্দাগিরী দেখাবে? সালমান রুশদি পড়ে নাস্তিকতায় আকৃষ্ট হবে? না জেনেই ধর্মরক্ষ্যার নামে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে! একটু পড়েই যদি ব্রেন ওয়াস হয়ে যায়! তবে বাকিটুকু পড়বে কে! যে বইপড়বে সে বইয়ের প্রভাবে যদি নিজের স্বকীয়তাই নষ্ট হয়ে যায় তবে, হে যুবক তুমি কিসের পাঠক! এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে, অনুপ্রাণিত হওয়ারমত কিছু পড়ে ভোতা অনুভুতির নির্বোধের মত অনুপ্রাণিত না হয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকবে!
হয়তো অনেকের মধ্যে এরা বিচার-বিশ্লেষণ করার বুদ্ধি-বিবেক হারিয়ে সবসময় প্রেমে পড়ি, প্রেমে পড়ি এমন একটাভাবে থাকে! নয়তো মৌলবাদীতার নামে মৌলিকতা বিবর্জিত যুবক সমাজ আদর্শ রক্ষ্যার তাগিদে অস্ত্রে শান দেয়। এই দুইশ্রেনী ছাড়াও মধ্যে আরো কয়েক শ্রেনী যুবক সমজে অন্তঃস্থ আছে। তারা আবার তেলাপোকারমত খোলস পাল্টায়! যে পাত্রেই রাখা যায় সেই পাত্রের আকার ধারণ করে!
সেদিন এক ছেলে একটা বই ধার নিল, তার কিছুদিন পরে দেখা হলে অনেক কথা হলো...
: ভাই, আমার মধ্যে আদর্শ তৈরী হচ্ছে।
: আদর্শ তৈরী হয় না। এটি একটি প্রমান বিষয়। আদর্শবান হয়ে উঠতে হয়।
দুমকরে কথাটা বলে ফেলে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। কি বললাম আসলে কি তাই? তাহলে কি নতুন আদর্শ তৈরী হবে না? কি আশ্চর্য...কিতা কইতাম!
যাক, ফটিকের হলুদ পাঞ্জাবি গল্পটার ফিনিসিং দেয়া দরকার। পৃথিবী নামের ঘূর্ণনরত গ্রহটার এই অংশে অন্ধকার চিরকাল থাকে না। এখানে প্রতিদিন সাতসকালে সূর্য উদিত হয়। এতোসকালে ফটিকের ঘুম ভাঙেনা বড়ং ঘুম চিপেধরে...! এই সকালেই নিবারণ চক্রবর্তী এসে ফটিকে ডেকে দেয়।
: কি রে ফটিক? উঠস না ক্য রে?
: হুম
: কি রে? ওঠ
: কিতা করতাম?
: ল চল
: না যামু না।
: আইচ্ছা না যাইচ। দেখতো আমারে কেমুন লাগতাছে?
: হ দারুণ।
: ধুর ব্যটা, চোখ খুইলা ক
: ওরে সত্যি সেরাম লাগিচ্ছে! মাইয়া হইলে তো একক্ষনে তর প্রেমে পড়ে গেইলছিলাম! "আ্যকের ক"লাগতাছে
: ধর, প্যকেটটা খোল
: কি এটা?
: খুলে দেখ
: আরে এ তো হলুদ পাঞ্জাবি! কে দিল?
......................
কে আর দিবে হয়তো রুপা পাঠিয়েছে নয়তো হেমানলিনী। যেই পাঠাক...!!! ফটিক পাঞ্জাবি গায়েদিচ্ছে। আজ তার অনেক কাজ, মঙ্গলশোভাযাত্রায় তার ভুমিকা মূখ্য! ইলিশের টুকরা বিতরণেও তাকে নজর রাখতে হবে! সময় কোথায়, রুপার সাথে দেখা করার? এটাতো ভালবাসা দিবস না, এটা পহেলা বৈশাখ।
রুপা আজ সাদা জমিনের উপর লাল পাড় আর হলুদ আঁচলের শাড়ি পড়বে। খোঁপায় থাকবে বেলি ফুল। ফটিকের বেলিফুল খুব পছন্দ। খুবযত্ন করে রাখা বকুলফুলের মালাটাও হাতে বেচলেটেরমত দিয়ে বারান্দায় দ্বাড়াবে। যখন চায়ের কাপে চুমুক দেবে তখন বকুল ও বেলিফুলের ঘ্রান আসবে! আর ফটিকের অপেক্ষায় থাকবে। ও জানে সবাই জানে, ফটিক আসবে না। ফটিকরা হলুদ পাঞ্জাবি পড়লে হিমু হয়ে যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


