বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করার খাতিরে ধরেই নিলাম, হাদিস কি, কতপ্রকার, মতন কি, সনদ কি, কোন সনদ দূর্বল, কোনটা জাল, কোনটা জইফ, কোনগুলো মিথ্য, বানোয়াট, আর কোন হাসিসটা হাসান এ বিষয়গুলো আমরা জানি। যেহুতু মোটামুটি ধারনা আছে তাই মনযোগ দিয়ে শবে বরাত প্রসঙ্গে হাদিসগুলো ও এর আগে পিছের সনদ ও সনদের সত্যতা সম্পর্কে পড়ে ফেলি।
ক। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: এক রাতে আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে খুঁজে না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাকে বাকী গোরস্তানে পেলাম। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন: ‘তুমি কি মনে কর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন?’ আমি বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অপর কোন স্ত্রীর নিকট চলে গিয়েছেন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ‘মহান আল্লাহ তা’লা শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশী লোকদের ক্ষমা করেন।
হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেন (৬/২৩৮), তিরমিযি তার সুনানে (২/১২১,১২২) বর্ণনা করে বলেন, এ হাদীসটিকে ইমাম বুখারী দুর্বল বলতে শুনেছি। অনুরূপভাবে হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৯) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ দুর্বল বলে সমস্ত মুহাদ্দিসগণ একমত। এই হাদিসের সুত্র যে বিচ্ছিন্ন তা স্পষ্ট করে বুঝতে হলে এই লিংকে যেতে হবে।https://www.youtube.com/watch?v=fuuxnx_uvkk
খ। আবু মূসা আল আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাত্রিতে আগমণ করে, মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যতীত, তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন।
হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৫৫, হাদীস নং ১৩৯০),এবং তাবরানী তার মু’জামুল কাবীর (২০/১০৭,১০৮) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা বূছীরি বলেন: ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাবরানী বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে আল্লামা হাইসামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) মাজমা‘ আয যাওয়ায়েদ (৮/৬৫) গ্রন্থে বলেনঃ ত্বাবরানী বর্ণিত হাদীসটির সনদের সমস্ত বর্ণনাকারী শক্তিশালী। হাদীসটি ইবনে হিব্বানও তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে দেখুন, মাওয়ারেদুজ জাম‘আন, হাদীস নং (১৯৮০), পৃঃ (৪৮৬)।
গ। আলী ইবনে আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যখন শা‘বানের মধ্যরাত্রি আসবে তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম তথা রাতভর নামায পড়বে, আর সে দিনের রোযা রাখবে; কেননা সে দিন সুর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন: ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি ক্ষমা করব। রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি রিযিক দেব। সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে যে আমার কাছে পরিত্রাণ কামনা করবে আর আমি তাকে উদ্ধার করব। এমন এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত তিনি এভাবে বলতে থাকেন”।
হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৮) বর্ণনা করেছেন। আল্লামা বূছীরি (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ (২/১০) গ্রন্থে বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে ইবনে আবি সুবরাহ রয়েছেন যিনি হাদীস বানাতেন। তাই হাদীসটি বানোয়াট।
এ বিষয়ে আরো বলা যেতে পারে, কিন্তু তাতে বক্তব্য বড় হবে। অনেক হাদিস থাকলেই হবে না তার বর্ণনাকারী রাবী শক্তিশালী হতে হয়। আবার শুধু রাবী শক্তিশালী হলেই তো হয় না বক্তব্যও সঠিক হতে হবে। কেননা ইসলাম সত্য ধর এর মধ্যে কোন সন্দেহ নাই। তো বুঝা যাচ্ছে যে, সাবানের মধ্যরাত্রির ফযীলত বিষয়ে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সবগুলোই দুর্বল অথবা বানোয়াট।
সুরা আনআমের এই আয়াতটি নিশ্চয় মনে আছে তবুও বলি - অাল্লাহ বলেছেন, হে নবী যারা নিজের দ্বীন কে খণ্ড বিখণ্ড করেছে, তার সাথে অাপনার কোন সম্পর্ক নেই। (সুরা:অানঅাম, অায়াত :১৫৯) বিশ্লেষণে না যাই, আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুক।
ইবাদত করা তো খারাপ কিছু না, বরঞ্চ খুব ভাল ব্যপার। তাহলে এই রাতে করলে ক্ষতি কী? কোন কাজটি ইবাদত আর কোনটি নয় সেটি নির্ধারণ করবার এখতিয়ার একমাত্র নবী সাঃ এর। তিনি যা করেছেন এবং যা করতে বলেছেন তাই ইবাদত। যা করেন নাই সেটি যত ভাল কাজই হোক না কেন কশ্চিনকালেও সেটা ইবাদত বলে গণ্য হবার সুযোগ নেই। যে যার ইচ্ছা মতন যে কোন কাজকে ইবাদত হিসেবে পালন করলে ভ্রান্ত বিশ্বাস জন্ম নেবে আমাদের উত্তরসূরিদের। সুরা অালে ইমরান, অায়াত:১০৩ তে আল্লাহ বলেন "তোমরা সবাই অাল্লাহর রুজ্জু শক্ত করে ধর,পরস্পরের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড় না"। আজকের ছোট একটা ভুল সময় গেলে আরো বড় হবে তেমনি ধর্ম বিশ্বাসে ক্ষতির পরিমানও বেশি হবে। হুজুরে যা বলেন তাই বিশ্বাস করি, কেননা ধর্ম হলো বিশ্বাসের বিষয়। এরকম করে ভাববার সুযোগ নেই। ফলত মসজিদে গিয়া বালাগুল উলাবে কামালিহি কাসাফাদ্দু যা বে জামালিহি পড়া কিংবা ইয়া নবী সালামু আলাইকা পড়তে পড়তে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ভিত্তি কতটুকুন তা ভাবতে হবে। আর আল্লাহ কোরয়ানে বলেন "তোমরা অাল্লাহর অনুসরন কর, রাসুলের অনুসরন কর, নিজেদের #অামল #নষ্ট কর না। [সুরা:মুহাম্মদ, অায়াত :৩৩]
লাভ লস হিসাব করে অনেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, শবে বরাত না থাকলে নাই, কিন্তু যদি থাকে তাহলে যেন মিস হয়ে না যায়। সেজন্য রাত্রি উদযাপন করে থাকেন। কিন্তু সুরা আন নাজমের আল্লাহ্ বলেছেন "তারা অনুমান এবং প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে। অথচ তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে পথ নির্দেশ এসেছে। (- সুরা আন নাজম ২৩) "অথচ এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমানের উপর চলে। অথচ সত্যের ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়" ( সুরা আন নাজম ২৭)। শবে বরাত পালনে একটা সহি দলীলসহ সহি হাদিস না পাওয়া সত্ত্বেও কেন পালন করব? তা বোধগম্য নয়। আল্লাহ তায়ালা প্রথম যে আয়াতটি নাজিল করেছিলেন সেটি হলো "পড়, পড় তোমার প্রভুর নামে"। শবে বরাতেরমত বিদয়াত থেকে মুক্তির জন্য আমাদের সকলেরই পড়া শুরু করা ভীষণ জরুরী। কোরয়ান হাদিস তো পড়ার জন্য, শুধু হুজুরের থেকে শোনার জন্য নয়। যদি আমরা সত্যি পড়া শুরু করি তবে 'সত্য'ই আমাদের মুক্ত করবে।
সহি দলীলসহ বুখারী মুসলিমের এই হাদিসটির আমল থেকে আমরা কেন বঞ্চিত হবো? আল্লাহ্ মহান, আল্লাহ্ দয়ালু। সেই হাদিসটি হলো - “আল্লাহ তা‘আলা #প্রতি #রাতের #শেষাংশে – শেষ তৃতীয়াংশে- নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে আহবান জানাতে থাকেন ‘এমন কেউ কি আছে যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? এমন কেউ কি আছে যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে দেব? আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?” [বুখারী, হাদীস নং ১১৪৫, মুসলিম হাদীস নং ৭৫৮]
আরো সতর্কতার সাথে খেয়াল করুন বুখারী মুসলিমের হাদিস “আল্লাহ তা‘আলা #প্রতি #রাতের শেষাংশে – শেষ তৃতীয়াংশে- নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে আহবান জানাতে থাকেন …। প্রতিটি রাতই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশেষ একটি রাতে ঘটা করে এভাবে ইবাদত করা বেদআত। সাবধান! আল্লাহ্, সবার অন্তরের খবর জানেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



