somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

বিদ্রহীসূত
পাঠকের মুগ্ধতাই আমার লেখার প্রেরণা, সত্য প্রচার আমার লেখার উদ্দেশ্য আর মিথ্যাকে বিনাশ করে দিকেদিগন্তে সত্যের আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণই আমার লেখার চূড়ান্ত লক্ষ্য।

কোন প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদের উত্থান ঘটছে?

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হবার পর জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে মুসলিমদের মেনে নিতে হলো ব্রিটিশদের হুকুম। এই যে ঘটনাটি ঘটল, এটা মুসলিমদের ক্ষেত্রে যতটা প্রবল সঙ্কট হয়ে দাঁড়াল তা কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে হয় নি। অন্যান্য ধর্মগুলো হাজার হাজার বছরে এমনিতেই এতখানি বিকৃত হয়ে গেছে যে, তা দিয়ে কোনো জাতির সমষ্টিগত জীবন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অনেক ধর্মে তো জাতীয় জীবন পরিচালনার কোনো বিধানই নেই।

কাজেই ঐসব ধর্মাবলম্বীদের জাতীয় জীবনে কার হুকুম চলছে বা না চলছে তা নিয়ে তাদের কোনো ঈমানী বাধ্যবাধকতাও নেই। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই”। অর্থাৎ জীবনের সর্ব-অঙ্গনে হুকুম চলবে একমাত্র আল্লাহর, ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড হবে আল্লাহর হুকুম। তাছাড়া একটা জীবন্ত ইতিহাস রয়েছে ইসলামের। কিছুদিন আগেও মুসলিমরা দুনিয়া শাসন করেছে। একটি সুমহান সভ্যতার জন্মদাতা তারা। আবু বকর (রা.), ওমরের (রা.) শাসনামল নিয়ে মুসলমানরা আজও গর্ব করে। তারা এমন একজন মহামানবের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত যিনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ইতিহাসের জন্মদাতা, যিনি ছিলেন একাধারে নবী, সেনাপ্রধান, সমাজ সংস্কারক, বিচারক। এই জাতির প্রাণশক্তি যে কোর’আন, তা হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেটা ‘অপরিবর্তনীয়’ ও ‘অবিকৃত’ আছে। সেখানে হাজার হাজার আয়াত রয়েছে মুসলিমদের জাতীয় জীবনের সাথে জড়িত। সেই আয়াতগুলোর বাস্তবায়ন করা মুসলিমদের ঈমানী বাধ্যবাধকতার অংশ।

কিন্তু জাতীয় জীবনে হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা যখন তারা হারাল তখন স্বভাবতই প্রশ্নের জন্ম হলো- এখন তারা কী করবে? তারা না পারল আল্লাহর হুকুম সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে ব্রিটিশের হুকুম গ্রহণ করে নিতে, আবার না পারল ব্রিটিশের হুকুম প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করতে। শুরু হলো মুসলিমদের জাতীয় জীবনের সাথে ব্যক্তি জীবনের সংঘাত!

এরপর একটি সময় এলো যখন পৃথিবীময় স্বাধীনতার দাবিতে একটার পর একটা আন্দোলন সৃষ্টি হতে লাগল। তুরস্ক, মিশর, ইরাক, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিস্তিন ইত্যাদি দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঢেউ খেলে গেল। ভারতবর্ষেও তাই, বাংলাদেশের জন্ম হলো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও তার ভিত্তিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতারা কিন্তু ইসলামের চেতনার উপর নির্ভর করতে পারলেন না। কারণ তারা দেখলেন যে ইসলামের সঠিক কোনো রূপরেখা কোথাও নেই। হাজারো দল-উপদল, ফেরকা-মাজহাব, তরিকায় বিভক্ত হয়ে গেছে মুসলিম জাতি। তাদের একেক ভাগের আকীদা একেক রকম। লক্ষ্যের ঐক্য নেই, কর্মসূচির ঐক্য নেই। আর বৃহত্তর ধর্মবিশ্বাসী মানুষ ধর্মের প্রশ্নে স্থবির, অন্তর্মুখী মনোভাব লালন করে। সুতরাং কোথাও ভাষাকে ব্যবহার করে, কোথাও বর্ণকে ব্যবহার করে একটার পর একটা দেশ স্বাধীন হতে লাগল। দেশগুলোতে স্বাধীন সার্বভৌম সরকার গঠিত হলো, নতুন সংবিধান প্রণিত হলো, বিচারালয় গড়ে উঠল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সামরিক বাহিনী গঠিত হলো; জাতীয় আদর্শ হিসেবে কোথাও বেছে নেওয়া হলো ধর্মহীন সমাজতন্ত্র, কোথাও ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ইত্যাদি। আর ধর্ম যে অপাংক্তেয় ছিল, তাই রয়ে গেল।

কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী মানুষের ঘরে ঘরে রইল কোর’আন, হাদীস, ফিকাহ ও ইতিহাসের বই। কোর’আনের সেই আয়াতগুলোর কী হবে যেগুলো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত? তাছাড়া হাদীসে-সিরাতে বিশ্বনবীর রাষ্ট্রশাসনের যে দৃষ্টান্তগুলো রয়েছে যেগুলো মুসলিম জাতির জন্য পালনীয়- সেসবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে সে প্রশ্নের কোনো সমাধান হলো না। আবার ইউরোপীয়রা আসার পূর্বে মুসলিমরা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে যে রাষ্ট্রকাঠামো অনুযায়ী শাসিত হয়েছে, যে হুকুমগুলোকে আল্লাহর হুকুম বলে মান্য করাকে ঈমানী কর্তব্য মনে করেছে, কাজীরা আদালতে যে রায় দিয়েছেন, ফকিহরা কোর’আন-হাদীসের বিশ্লেষণ করে যে আইন তৈরি করেছেন, মুফতিরা যে ফতোয়া দিয়েছেন- সেই সবকিছুই কিন্তু গ্রন্থাকারে সংরক্ষিত রয়েছে। আজও মাদ্রাসাগুলোতে লক্ষ লক্ষ ছাত্রকে সেগুলো পড়ানো হচ্ছে, পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে ও সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো পড়েই মাদ্রাসা থেকে বের হচ্ছেন আলেম, মুফতি, ফকিহরা যাদেরকে মানুষ ইসলামের কর্তৃপক্ষ মনে করে। এই ফকিহ-মুফতিদের কাছে যখন মানুষ ইসলাম শিখতে যাচ্ছে তখন তারা অতীতের ঐ ফতোয়ার কিতাবগুলো থেকেই ফতোয়া দিচ্ছেন। অথচ তারা ভুলে গেছেন যে, ইতোমধ্যেই তারা শাসনক্ষমতা হারিয়ে বসে আছেন, সেই সাথে হারিয়েছেন ফতোয়া (রায়) দেওয়ার অধিকারও।

এখন সমস্যা দাঁড়াচ্ছে মানদণ্ডে। এমন একটি কাজ যা হয়ত শরীয়াহর দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়, কিন্তু প্রচলিত আইনে তাকে অন্যায় মনে করা হচ্ছে না, কিংবা শরীয়াহ আইনে সেই অপরাধের শাস্তি একরকম, প্রচলিত আইনে ভিন্নরকম- সে ক্ষেত্রে ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কার কথা শুনবে? মানদণ্ডের প্রশ্নে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মবিশ্বাসী মানুষের এই দূরত্বকেই কাজে লাগাচ্ছে উগ্র মতাদর্শীরা। তারা সরকারকে, রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাগুত, মুরতাদ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে উত্তেজিত করে তুলছে। ইসলামের জিহাদ ও কিতালের সাথে সন্ত্রাসকে গুলিয়ে ফেলছে। অথচ জিহাদ-কিতাল ও সন্ত্রাস সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

(লেখাটি এখানেই শেষ করলাম, কারণ সামনে আগাতে গেলে লেখাটি অনেক বড় হয়ে যাবে। এখানে কেবল উগ্রবাদের উত্থান কেন হচ্ছে সেটা তুলে ধরেছি, যদিও বিস্তারিত বলতে গেলে আরও অনেক কারণ আছে, আমি কেবল মূল প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি।)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:৫৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড় কাউকে জয়ী হতে দেয় না

লিখেছেন মুনতাসির, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১১




আমরা প্রায়ই বলি, অমুক এভারেস্ট জয় করেছেন, তমুক কে-টু জয় করেছেন, অমুক অন্নপূর্ণা জয় করেছেন। শব্দটি এতটাই প্রচলিত যে আমরা আর ভাবিই না—আসলে কি পাহাড়কে জয় করা যায়?

আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগে ৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা ফেরতের প্রলোভন!

লিখেছেন শাহাবুিদ্দন শুভ, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৩৯

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ওয়েবসাইটের প্রচার দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রথম আলোর আদলে তৈরি একটি ডিজাইন ব্যবহার করে উচ্চ মুনাফার বিনিয়োগের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এমনকি তৃতীয় মাত্রা অনুষ্ঠানের ফটোকার্ড... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক: অদৃশ্য প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের খাবার ও শরীরে ঢুকছে?

লিখেছেন কাবিল, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৪


মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastic) হলো খুব ছোট প্লাস্টিকের কণা। সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর থেকেও অনেক ক্ষুদ্র কণা আছে—সেগুলোকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এত ছোট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এনসিপিকে মারছে কেন? (অথবা) এনসিপি মার খাচ্ছে কেন?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০


(ইহা নাকি এনসিপিকে পিষিয়ে মারবে!)

এনসিপিকে মারছে কেন (?) অথবা এনসিপি মার খাচ্ছে কেন? প্রশ্ন দুটো হলেও আদতে প্রশ্ন একটাই উত্তরও একটাই। বিগত ১৫/১৬ বছর অর্থাৎ খুনি হাসিনার আমলে যাহারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আন্দোলনের সম্ভাবনাময়, রৌদ্রোজ্জ্বল মুখগুলো ডানপন্থার অনুরাগী হচ্ছে! দায় কার?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩



জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সেই আইকনিক ফটো--যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটা ভার্সিটির ফাস্ট কি সেকেন্ড ইয়ারের মেয়ে পুলিশের গাড়ি আটকাচ্ছে, ওর ভার্সিটির এক বড় ভাইকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×