
ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হবার পর জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে মুসলিমদের মেনে নিতে হলো ব্রিটিশদের হুকুম। এই যে ঘটনাটি ঘটল, এটা মুসলিমদের ক্ষেত্রে যতটা প্রবল সঙ্কট হয়ে দাঁড়াল তা কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে হয় নি। অন্যান্য ধর্মগুলো হাজার হাজার বছরে এমনিতেই এতখানি বিকৃত হয়ে গেছে যে, তা দিয়ে কোনো জাতির সমষ্টিগত জীবন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অনেক ধর্মে তো জাতীয় জীবন পরিচালনার কোনো বিধানই নেই।
কাজেই ঐসব ধর্মাবলম্বীদের জাতীয় জীবনে কার হুকুম চলছে বা না চলছে তা নিয়ে তাদের কোনো ঈমানী বাধ্যবাধকতাও নেই। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই”। অর্থাৎ জীবনের সর্ব-অঙ্গনে হুকুম চলবে একমাত্র আল্লাহর, ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড হবে আল্লাহর হুকুম। তাছাড়া একটা জীবন্ত ইতিহাস রয়েছে ইসলামের। কিছুদিন আগেও মুসলিমরা দুনিয়া শাসন করেছে। একটি সুমহান সভ্যতার জন্মদাতা তারা। আবু বকর (রা.), ওমরের (রা.) শাসনামল নিয়ে মুসলমানরা আজও গর্ব করে। তারা এমন একজন মহামানবের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত যিনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ইতিহাসের জন্মদাতা, যিনি ছিলেন একাধারে নবী, সেনাপ্রধান, সমাজ সংস্কারক, বিচারক। এই জাতির প্রাণশক্তি যে কোর’আন, তা হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেটা ‘অপরিবর্তনীয়’ ও ‘অবিকৃত’ আছে। সেখানে হাজার হাজার আয়াত রয়েছে মুসলিমদের জাতীয় জীবনের সাথে জড়িত। সেই আয়াতগুলোর বাস্তবায়ন করা মুসলিমদের ঈমানী বাধ্যবাধকতার অংশ।
কিন্তু জাতীয় জীবনে হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা যখন তারা হারাল তখন স্বভাবতই প্রশ্নের জন্ম হলো- এখন তারা কী করবে? তারা না পারল আল্লাহর হুকুম সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে ব্রিটিশের হুকুম গ্রহণ করে নিতে, আবার না পারল ব্রিটিশের হুকুম প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করতে। শুরু হলো মুসলিমদের জাতীয় জীবনের সাথে ব্যক্তি জীবনের সংঘাত!
এরপর একটি সময় এলো যখন পৃথিবীময় স্বাধীনতার দাবিতে একটার পর একটা আন্দোলন সৃষ্টি হতে লাগল। তুরস্ক, মিশর, ইরাক, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিস্তিন ইত্যাদি দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঢেউ খেলে গেল। ভারতবর্ষেও তাই, বাংলাদেশের জন্ম হলো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও তার ভিত্তিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতারা কিন্তু ইসলামের চেতনার উপর নির্ভর করতে পারলেন না। কারণ তারা দেখলেন যে ইসলামের সঠিক কোনো রূপরেখা কোথাও নেই। হাজারো দল-উপদল, ফেরকা-মাজহাব, তরিকায় বিভক্ত হয়ে গেছে মুসলিম জাতি। তাদের একেক ভাগের আকীদা একেক রকম। লক্ষ্যের ঐক্য নেই, কর্মসূচির ঐক্য নেই। আর বৃহত্তর ধর্মবিশ্বাসী মানুষ ধর্মের প্রশ্নে স্থবির, অন্তর্মুখী মনোভাব লালন করে। সুতরাং কোথাও ভাষাকে ব্যবহার করে, কোথাও বর্ণকে ব্যবহার করে একটার পর একটা দেশ স্বাধীন হতে লাগল। দেশগুলোতে স্বাধীন সার্বভৌম সরকার গঠিত হলো, নতুন সংবিধান প্রণিত হলো, বিচারালয় গড়ে উঠল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সামরিক বাহিনী গঠিত হলো; জাতীয় আদর্শ হিসেবে কোথাও বেছে নেওয়া হলো ধর্মহীন সমাজতন্ত্র, কোথাও ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ইত্যাদি। আর ধর্ম যে অপাংক্তেয় ছিল, তাই রয়ে গেল।
কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী মানুষের ঘরে ঘরে রইল কোর’আন, হাদীস, ফিকাহ ও ইতিহাসের বই। কোর’আনের সেই আয়াতগুলোর কী হবে যেগুলো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত? তাছাড়া হাদীসে-সিরাতে বিশ্বনবীর রাষ্ট্রশাসনের যে দৃষ্টান্তগুলো রয়েছে যেগুলো মুসলিম জাতির জন্য পালনীয়- সেসবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে সে প্রশ্নের কোনো সমাধান হলো না। আবার ইউরোপীয়রা আসার পূর্বে মুসলিমরা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে যে রাষ্ট্রকাঠামো অনুযায়ী শাসিত হয়েছে, যে হুকুমগুলোকে আল্লাহর হুকুম বলে মান্য করাকে ঈমানী কর্তব্য মনে করেছে, কাজীরা আদালতে যে রায় দিয়েছেন, ফকিহরা কোর’আন-হাদীসের বিশ্লেষণ করে যে আইন তৈরি করেছেন, মুফতিরা যে ফতোয়া দিয়েছেন- সেই সবকিছুই কিন্তু গ্রন্থাকারে সংরক্ষিত রয়েছে। আজও মাদ্রাসাগুলোতে লক্ষ লক্ষ ছাত্রকে সেগুলো পড়ানো হচ্ছে, পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে ও সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো পড়েই মাদ্রাসা থেকে বের হচ্ছেন আলেম, মুফতি, ফকিহরা যাদেরকে মানুষ ইসলামের কর্তৃপক্ষ মনে করে। এই ফকিহ-মুফতিদের কাছে যখন মানুষ ইসলাম শিখতে যাচ্ছে তখন তারা অতীতের ঐ ফতোয়ার কিতাবগুলো থেকেই ফতোয়া দিচ্ছেন। অথচ তারা ভুলে গেছেন যে, ইতোমধ্যেই তারা শাসনক্ষমতা হারিয়ে বসে আছেন, সেই সাথে হারিয়েছেন ফতোয়া (রায়) দেওয়ার অধিকারও।
এখন সমস্যা দাঁড়াচ্ছে মানদণ্ডে। এমন একটি কাজ যা হয়ত শরীয়াহর দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়, কিন্তু প্রচলিত আইনে তাকে অন্যায় মনে করা হচ্ছে না, কিংবা শরীয়াহ আইনে সেই অপরাধের শাস্তি একরকম, প্রচলিত আইনে ভিন্নরকম- সে ক্ষেত্রে ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কার কথা শুনবে? মানদণ্ডের প্রশ্নে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মবিশ্বাসী মানুষের এই দূরত্বকেই কাজে লাগাচ্ছে উগ্র মতাদর্শীরা। তারা সরকারকে, রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাগুত, মুরতাদ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে উত্তেজিত করে তুলছে। ইসলামের জিহাদ ও কিতালের সাথে সন্ত্রাসকে গুলিয়ে ফেলছে। অথচ জিহাদ-কিতাল ও সন্ত্রাস সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
(লেখাটি এখানেই শেষ করলাম, কারণ সামনে আগাতে গেলে লেখাটি অনেক বড় হয়ে যাবে। এখানে কেবল উগ্রবাদের উত্থান কেন হচ্ছে সেটা তুলে ধরেছি, যদিও বিস্তারিত বলতে গেলে আরও অনেক কারণ আছে, আমি কেবল মূল প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি।)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




