সে যাক। যে কারণে আস্তমেয়ে আমার আজকের লেখায় চলে এল সেটা বলি। আজকে ব্লগে ঢুকে ক্রিকেটের উপর লেখা আস্তমেয়ের সুন্দর ছোট্র লেখাটা পড়ে যখন কমেন্টস গুলোর উপর চোখ বুলাচ্ছিলাম, তখন একটা লেখার উপর আমার চোখ আটকে গেল। জনৈক পাঠক লিখলেন, আস্তরা না কি পাকিস্তানের চেয়ে ভারতকে হারালে রেশী খুশি হয়। এটা যদি ওই জনৈক পাঠক ফান করে বলে থাকেন তো আমার কোন কিছু বলার নেই। কিন্তু যদি সিরিয়াসলি বলে থাকেন, তবে তার প্রতিবাদ না করে থাকতে পারলাম না।
বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের আলোচিত-সমালোচিত অন্তরভূক্তির আগের কথা। বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রিয় মানুষ দুটি দলের যে কোন একটি কে সাপোর্ট করত। হয় ভারত না হয় পাকিস্তান। স্কুল-কলেজে পড়ার সেই সময়টাতে যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করত, তাদের কাছে ওই দেশটি নয় বরয় তখনকার ক্রিকেট সেনসাশান ওয়াসিম দা গ্রেট, ইমরান খান, সাঈদ আনোয়ার, আমির সোহেল, এই নাম গুলোই প্রিয় ছিল। দেশের জন্য নয় বরং এই নাম গুলোর জন্য পাকিস্তান নামের দেশটার কথা আমাদের হাজারো ক্রিকেট প্রিয় মানুষের মনে একটু হলেও স্থান পেয়েছিল। কিন্তু সে স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেনি।
আমাদের দেশের শহর বন্দর কিংরা গ্রামের একটা ছেলে বা মেয়ে যখন খেলাধুলার সাথে পরিচিত হয়, তখন তার মাঝে যে সচেতনতা থাকে, তা দিয়ে আর যা-ই হউক রাজনীতির মার প্যাঁচ বুঝা সম্ভব না। তারপর গ্রাম ছেড়ে শহর, শহর ছেড়ে দেশ এবং আন্তজর্াতিক অংগনের বিখ্যাত খেলোয়ারদের নাম খুব দ্রুত তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই খেলোয়ারদের নাম ধরেই কিন্তু মনের অজান্তেকোন একটা দেশের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই সাপোর্ট করা।
আমি স্কুলে থাকতেই ফুটবলের প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট ছিলাম। শেষের দিকে এমন হয়ে গিয়েছিল যে বিকালে ফুটবল খেলতে না পারলে সন্ধায় পড়তে বসতে পারতাম না। সেই আমি করে কি ভাবে ক্রিকেটকে ভালবেসে ফেলেছি জানা নেই। ছোট বেলায় ওয়াসিম আকরাম, ইমরান খান আর সাঈদ আনোয়ারের খেলার প্রতি আগ্রহ থেকে পাকিস্তানের সাপোর্টার হয়ে গেলাম।
তখন বাংলাদেশ আন্তজর্াতিক ক্রিকেট অংগনের নতুন সদস্য। সবার সাথেই শুধু হারে। তবু আমার পিয়্র দেশকে সাপোর্ট করাতেই যেন সমস্ত আনন্দ খুঁজে পেতাম। পরাক্রমশালী অষ্ট্রেলিয়ার সাথে খেল্লে ও দোয়া করতাম কোন ভাবে যদি বাংলাদেশ জিতে যেত। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র। ক্রিকেট ম্যাচ গুলোর কোনটিই দেখতে মিছ করতাম না। খেলা দেখে কত যে ক্লাশ ফাঁকি দিয়েছি। সব বন্ধুরা মিলে কমন রুমে হৈ চৈ করে খেলা দেখার মাঝে মজাই আলাদা। সব চেয়ে মজা হত যেদিন ভারত - পাকিস্তানের খেলা হত। খেলা শেষে মিছিল পর্যন্ত করতাম। তখন পাকিস্তান জিতলে পাকিস্তানের পক্ষ্যে মিছিল করলে ও কিন্তু কেউ কোন মন্তব্য করত না। কারণ, সেই স্লোগানে কোন রাজনীতি থাকত না। যা থাকত, সেটা ছিল খেলার জন্য, খেলোয়ারের জন্য আবেগের ছোট্র একটু বহিঃপ্রকাশ।
এক দিনের ছোট্র একটা ঘটনা বলি। আমি ছিলাম পাকিস্তানের অন্ধ সাপোর্টার। আমার রুমমেট (আমি তাকে রাম ছাগল ডাকতাম আর সে আমাকে কি বলে ডাকত সেটা না-ই বা বল্লাম), আমার জীবনে দেখা একজন আদর্শ মানুষ, যে বড় হয়েছে শুধু মাত্র নিজের প্রচেষ্ঠায় টিউশানির টাকা দিয়ে। এখন সে বেশ ভাল বেতনের ভাল একটা চাকরি করে। সে ছিল ভারতের সাপোটর্ার। কি নিয়ে যেন খেলা বিষয়ে আমার এবং তার মধ্যে তর্ক হচ্ছিল। আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার বলে এক পযর্ায়ে আমার রন্ধু আমাকে রাজাকার বলে ফেলে। কিন্তু সে যে আমাকে ক্ষেপাবার জন্যে বলেছে সেটা আমি একদমই বুঝতে পারিনি। আমি ভীষণ সেন্টিম্যান্টাল হয়ে গেলাম। এই একটি কথায় আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনা। আমি হাতের কাছে ওর প্রিয় গিটার টা পেয়ে টান দিয়ে সবগুলো তার ছিড়ে ফেল্লাম। আমার কান্ড দেখে আমার বন্ধু তো একদম থ হয়ে গেল। এ আমি কি করে ফেল্লাম। আমার বন্ধুটি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল তাতে। সে রাগ করে আমার সাথে পুরো ছয় মাস কথা বলেনি। গতকাল যখন বাংলাদেশ-ভারতের খেলা দেখছিলাম একা একা, আমার বন্ধুটির কথা বারবার মনে পড়ছিল। আজ আমার বন্ধুটি থাকলে হয়তো আর ভারত-পাকিস্তান নিয়ে তর্ক করতে হত না। কারণ, ভারত পাকিস্তান নয়, আমার প্রিয় বাংলাদেশই এখন গৌরবের শীর্ষে আসীন। এক অনন্য উচ্চতায়। আমার প্রিয় বাংলাদেশই এখন যে কোন দেশকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। এখন ভারত পাকিস্তান নয়, হৃদয়ে এখন কেবলই বাংলাদেশ। আমার বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




