এখানকার বসন্তটা সত্যিই দেখার মত। উপভোগ করার মত। শীতের আবহটা তখনো পুরোপুরি কাটে না। শীতের শুরুতে সবুজ গাছগুলো সেই যে পাতা ঝড়িয়ে ছিল, সেই মৃতবৎ গাছগুলোতে তখনো পাতা ফোটে না। তবে সব গাছেই ছোট ছোট কুঁড়ি দেখা যায়। যেন শীতের দীর্ঘ প্রায় চার-পাঁচটি মাস ঘুমিয়ে থেকে চোখ দু'টো একটু খুলে দেখে নিচ্ছে জেগে উঠার সময় হয়েছে কি না। যে গাছগুলোতে বসন্তে ফুল ফোটে, সে গুলোতে এত ফুল আসে যে ফুলের ভারে গাছের ডাল গুলো নুয়ে পড়ে। দূরের পাহাড়ে ফুল ফোটানোর মত তেমন কোন গাছ নেই। হয়তো ফুল ফোটে। কিন্তু সে গুলো চোখে পড়ার মত নয়। তাছাড়া উপত্যকার লোকালয় গুলোতে বসন্ত এলেও দূরের পাহাড়গুলো তখনো বরফে ঢাকা থাকে। পাহাড়ের বরফ গলতে প্রায় পুরোটা বসন্ত লেগে যাবে। পাহাড়ের গাছে তখন ছোট্র কুঁড়ি থেকে সবুজ পাতা গজাবে। ধীরে ধীরে এতদিনের সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়গুলো সবুজ হয়ে যাবে। কি যে সুন্দর লাগে তখন। চোখ ফেরানো যায় না।
সাকুরা। জাপান নামটার সাথে যারা কম বেশেী পরিচিত, তারা হয়তো এই শব্দটাও শুনে থাকবে। সেই বিখ্যাত জাপানী গান "সাকুরা ..." কে না শুনেছে। "সাকুরা" প্রতিটি জাপানীর অহংকার। তাদের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, সব সব কিছুর সাথে এই শব্দটা জড়িয়ে আছে। জাপানীরা জাপানকে যেমন ভালবাসে, তেমনই ভালবাসে এই শব্দটাকে। সাকুরা ছাড়া তাদের কোন আনন্দই যেন পূর্ণতা পায়না। তাদের সমৃদ্ধি ও যেন এই "সাকুরা" ছাড়া বেমানান থেকে যায়। কিন্তু আপনারা কি জানেন কি এই "সাকুরা"?
সত্যি কথা বলতে কি, আমি জাপানে আসার আগে যদিও শব্দটার সাথে পরিচিত ছিলাম, তবুও এর সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। জাপানে এসেও প্রথম দিকে এই শব্দটা সম্পর্কে জানার তেমন আগ্রহ জাগেনি। এই শব্দটা সম্পর্কে প্রথম কৌতুহল জাগে গেল বসন্তে। জানার ও সুযোগ হয় তখনই। আমার এপার্টমেন্ট থেকে মাত্র শ'দুয়েক গজ দূর দিয়ে বয়ে গেছে একটা নদী। জাপানীরা নদীকে "গাওয়া" বলে। এই শব্দটার প্রথমে বিভিন্ন শব্দ জুড়ে দিয়ে নদীগুলোর নাম রাখা হয়। সেই অনুসারে কানাজাওয়া শহরের ঠিক মাঝ খান দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটার নাম "আসানোগাওয়া"। এই নামের কি মানে আমার জানা নেই। হয়তো কোন সুন্দর পটভূমি আছে এই নামের পেছনে। যদি কখনো জানার সুযোগ হয়, সবাইকে শুনাব একদিন সময় করে।
আসানোগাওয়া নদীটা একটা ছোট্র পাহাড়ী নদী। দূরের পাহাড়ের বরফ গলা পানি বয়ে নিয়ে যায় সাগরে। ভীষণ স্রোত থাকে নদীতে। দশ থেকে বিশ ফুট চওড়া নদীটাতে পানির গভীরতা কখনোই তিন থেকে চার ফুটের বেশী হয়না। বসন্তে যখন পাহাড়ের বরফ গুলো বেশী করে গলতে থাকে, তখন নদীতে স্রোত এবং পানি দুটোই সবচেয়ে বেশী থাকে। নদীর দুই ধার পাথর দিয়ে বাঁধানো। কোথাও কোথাও বড় বড় পাথর কেঁটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে। সে সিঁড়ি নদীর দুই ধারের রাস্তা থেকে নেমে নদীর পানি ছুঁয়েছে। নদীতে প্রচুর পাথর। কোন কাঁদা নেই। তাই পানিও অবিস্বাশ্য রকম পরিস্কার। সেই স্বচ্ছ জল বয়ে চলার পথে পাথরের গায়ে বাঁধা পেয়ে ছোট ছোট ঢেউ তোলে। এত সুন্দর জল দেখলে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু একবার ছুঁলে আর কখনো ছুঁতে ইচ্ছে হবে না। পানিতে স্পর্শ করা হাতের ওই অংশের রক্ত মুহুর্তের মধ্যে জমে যাবে। পানি এত ঠান্ডা। নদীর দুই ধারের রাস্তা প্রায় চার থেকে ছয় ফুট প্রসস্ত। রঙ বে রঙের ছোট ছোট নুড়ি পাথর দিয়ে বাঁধানো। একটু দূরে দূরে কাঠের বেনি্ঞ। বুড়ো বয়সের দু'চারজন মানুষ সকাল বিকেল হেঁটে বেড়ায় ওই রাস্তা দিয়ে। এক হাতে একটা পলিথিন ব্যাগ আর অন্য হাতে রশি। রশির মাথায় ছোট বড় হাজার রঙের, হাজার রকমের কুকুর। হেঁটে বেড়ানোর সময় কুকুরটা কোথাও হাগু করলে সাথে সাথে ওই পলিথিন বেগে তুলে নেবে। এত পরিচ্ছন্ন জাতি এরা। আমি অবাক হয়ে যাই।
উইক-এন্ড গুলোতে আমার করার কিছুই থাকে না। পুরো দুই দিন ছুটি। তাই রোদ থাকলে দুপুরের খাবার সেরে আমি আমার প্রিয় সাইকেলটা নিয়ে বেড়িয়ে পরি। নদীর পাড় ধরে ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়াই। কখনো কখনো সাইকেল রেখে সিঁড়ি বেয়ে একদম নেমে যাই জলের কাছে। তারপর নদীর ঢেউ দেখে দেখে অনেকটা সময় কাঁটিয়ে দেই। কিন্তু আবাক করা ব্যাপার হল, এত সুন্দর নদী আর নদীর পাড়ে আমার চোখে কখনোই কোন জুটি চোখে পড়েনি। অথচ আমি হলফ করে বলতে পারি, আমাদের দেশে এমন কোন স্পট থাকলে কপোত কপোতিদের মহাসমাবেশ বসত। তাতে আমার মত অর্ধ ব্যাচেলর কিংবা স্বাস্থ্য সচেতন কোন সাধারণ নাগরিক, যারা রক্তে সুগারের পরিমান কমাতে সকাল বিকাল কিছুটা সময় হাটেন, তাদের জন্য ওই পথে চলা দুষ্কর হত।
নদীর দুই ধারের রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ। বসন্তে সেই গাছে সাদা কিংবা গোলাপী ফুল ফোটে। এত ফুল যে গাছের ধুসর ছাঁই রঙ্গের ডালগুলো নুয়ে প্রায় মাটি ছুঁই ছুঁই করে। গাছে শুধু ফুল আর ফুল। কোন পাতা নেই। দিন যতই যেতে থাকে গাছে ফুলের সংখ্যা বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। এত ফুল কোথা থেকে ফুটে এই এতটুকুন গাছে, ভেবে পাই না। তারপর বয়স্ক ফুল গুলো ঝড়ে পরতে থাকে গাছের নীচে। সাদা, গোলাপী ফুলে ফুলেল হয়ে যায় পায়ে হাটা রাস্তাটা। একটা হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ বাতাসে বেসে বেড়ায়। কি যে আকুল করা সেই পরিবেশ। সূর্যের সোনালী আলোতে ফুলগুলো যেমন হাসতে থাকে, শান্তি প্রিয় জাপানীদের মুখেও তেমনই প্রফুল্ল হাসি। ছুটির দিন গুলোতে সবাই ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে নদীর ধারে। গাছ ভর্তি এই সাকুরা ফুলগুলো দীর্ঘ শীতের শেষে সমস্ত জাপান বাসীদের যেন ডেকে বলে, বেরিয়ে এসো শীত চলে গেছে। আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই। এবার যাত্রা হবে নতুন দিনের সমৃদ্ধির পথে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




