somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রামকিংকর বাইজ- এ পারসোনালিটি স্ট্যাডি বাই ঋত্বিক কুমার ঘটক !!!

০৮ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১১:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মৃত্যুর মাত্র সাত মাস আগে ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে ঋত্বিক কুমার ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) শান্তি নিকেতনে চারদিনের এক শুটিং যজ্ঞ করলেন। ইচ্ছে ছিল বিখ্যাত ভাস্কর ও পেইন্টার রামকিংকর বাইজ (১৯০৬-১৯৮০) -এর উপর একটি ডকুমেন্টারি বানাবেন। কিন্তু ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই ডকুমেন্টারি অসমাপ্ত রেখেই ঋত্বিক মারা যায়। ঋত্বিকের সেই অসমাপ্ত ডকুমেন্টারির ফুটেজগুলো পরবর্তী সময়ে জোড়া দিয়ে 'রামকিংকর বাইজ- এ পারসোনালিটি স্ট্যাডি' নামে ৩০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়। ঋত্বিক যেভাবে চিত্রনাট্য করেছিলেন এই ডকুমেন্টারিটি সেভাবে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমে একটা বড় হোয়াইট স্ক্রিন। তার উপর হঠাৎ চারপারশ থেকে নানান রঙের এক বর্ণালী এসে তাক লাগিয়ে দেয়। কারো হয়তো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ঋত্বিক কেন সাদা স্ক্রিনে এভারে মগ ভর্তি বিভিন্ন রঙ ছুড়ে ছুড়ে পর্দা রঙিন করলেন?
দর্শক যদি একটু ধৈর্য ধরেন তাহলে পরের মিনিটেই আপনি জবাবটা পেয়ে যাবেন। যেখানে বিভিন্ন এঙ্গেলে রামকিংকনের করা ভাস্কর্যংগুলোকে দেখা যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন তানপুরার সঙ্গে মাদল বাজতে থাকে। ঋত্বিক কি বৃষ্টি নামাতে চাইছিলেন?
নইলে এক একটি ভাস্কর্যের মুখমণ্ডলের ক্লোজ ছাপিয়ে ক্যামেরা যখন অন্য একটি ভাস্কর্যকে তাড়া করছিল, তখন হঠাৎ সেতার কেন মিউজিক লিড করতে থাকবে?
রামকিংকনের ভাস্কর্য রমনীর মুখ, পরিবার, শিশুর মুখ, প্রিয় কুকুর, গান্ধীজি, একটার পর একটা ভাস্কর্য যেতে থাকে। আবার সেই রঙ লাগানো স্ক্রিন। ঋত্বিক সেখানে লিখে রেখেছেন, দ্য রিভার, দ্য আনডুলেটিং ল্যান্ডস্কেপস, দ্য ভিলেজ ইটিস। তারপর আমরা দেখতে পাই পাখির কলকাকলির সাথে বাঁশি বাজছে আর নদীর এপার থেকে ওপারের দূরের গ্রাম দেখা যাচ্ছে। সেখানের মাটির ঘরের পেছনে গরুর গাড়ি, দুষ্টু পঞ্চ বালকের ভো দৌড়, যাদের পেছন পেছন সেই প্রিয় কালো কুকুর ভোলাও যাচ্ছে। ওরা কি দেখার মত তাজ্জব কিছুর সন্ধান পেতেই এভাবে ছুটছে? নইলে ভোলাকেও অত উৎসাহী লাগল কেন? নাকি ঋত্বিক এখানে রামকিংকনের ছেলেবেলাকে নির্দেশ করেছেন?
দুষ্টু বালকদের ছত্রভঙ্গ হবার সাথে সাথে ভোলা একটু কিংকর্তব্যবিমুঢ়! ভোলা আবার পেছন ফিরে ক্যামেরায় লুক দেয়। তারপর ভোলা আবার সামনে দৌড়াতে থাকে। এরপর আমরা দেখি সুবিশাল কাশবন। এখানে ঋত্বিক লিখেছেন যে, ছেলেমেয়রা কলা ভবন থেকে বের হয়ে আসছিল। তাদের আলোচনার বিষয় ছিল আর্ট। এরা ক্যমেরা থেকে ফ্রেমআউট হলে আমরা কলা ভবনের দিকে অগ্রসর হই। আর তারপর ক্যামেরা প‌্যান করে ম্যুরাল ধরতে শুরু করি।
এই ম্যুরালটি অনেক শিল্পীর একসঙ্গে করা একটি কাজ। রামকিংকর মূলত যাদের নির্দেশনায় ছিলেন। শিল্পী নন্দলাল বসু'র কিছু কাজ এরমধ্যে ছিল। তারপর আমরা ক্যামেরায় ম্যুরালগুলোর ডিটেইল ধরা শুরু করলাম। এর কোনোটা আর্যযুগের, কোনোটা দ্রাবিঢ়যুগের। কোনোটা আবার ঐশ্বরিয়ান, মিশরীয়, পারশ্য বা মহেঞ্জদাড়োযুগের কাজ। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে তা স্পষ্ট করে বোঝানো হবে। গান্ধীজির ভাস্কর্যটির নানা অ্যাঙ্গেলে শুট করলাম। এরপর গান্ধীজির ভাস্কর্যের সামনেই ঋত্বিক রামকিংকরের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন।
ঋত্বিক: কিংকরদা গান্ধীজির পায়ে এই যে নরকংকালের মুন্ডুগুলো, এর মানেটা কি?
রামকিংকর: ওটার মানে সহজেই যুগযুগান্তর ধরে ওই লোকগুলা পায়ের তলায় পড়ে আছে। আজকে সেই বুড়োর পায়ের তলায় সেই স্কালপচার দেখানো হয়েছে।
ঋত্বিক: কারেক্ট।
এরপর সেই মুণ্ডুগুলোর ক্লোজ শট থেকে আমরা আসি একযুগল কৃষক দম্পতির কাছে।
ঋত্বিক: আচ্ছা কিংকরদা এই ছবিটা, এই মুর্তিটা কিসের?
রামকিংকর: ওরা কুলি। ওরা রাইসমিলে কাজ করে। ওরা খাবারের হুইসেল শুনে দৌড়াতে থাকে। কিন্তু ওদের কাপড় শুকানোর মত অত সময় কোথায়? তাই অনেকে কাপড়টা শুকায় না, কাপড় শুকাতে শুকাতে এভাবে দৌড়ে তারা খাবার খেতে যায়। এই হচ্ছে ব্যাপারটা...হা হা হা.....
রামকিংকরের বামহাতে একটা মাতাইল আর ডানে হাতে গামছা। ঋত্বিকের দিকে ঘুরে কথা শেষ করে তিনি প্রাণখুলে হাসতে থাকেন।
ঋত্বিক: এটা হচ্ছে এর আর্ট?
রামকিংকর: হ্যা হ্যা এটাই...হা হা হা....
ঋত্বিক: এই হল ঘটনা?
রামকিংকর: এই ঘটনা হা হা হা...

ঋত্বিকের সেই ডকুমেন্টারি দেখা যাবে এই লিংক-এ

https://www.youtube.com/watch?v=mtErm-QeEMM


.........................................
ঢাকা
৮ এপ্রিল ২০১৫


সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০১৫ ভোর ৬:৪০
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×